গগনবিদারী কান্না আর রাজনীতির কানাগলি

সড়ক দুর্ঘটনা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মামুনুর রশীদ

গত কয়েকদিন ধরে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সড়ক-মহাসড়কে হতাহতের যে ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শুধু অত্যন্ত মর্মন্তুদই নয়, ভয়াবহ বার্তাও বটে। ১৯ আগস্ট সমকাল শীর্ষ প্রতিবেদন করেছে 'ভয়ঙ্কর ঈদযাত্রা' শিরোনামে। ওই প্রতিবেদনে যে তথ্যচিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্নেষণের ক্ষেত্রে ভাষা হারিয়ে যায়। গত বছর ঢাকায় দু'জন শিক্ষার্থী দুটি বাসের পাল্লাপাল্লিতে চাপা পড়ে প্রাণহানির পর ঢাকাসহ দেশজুড়ে কিশোর-তরুণ-যুবকরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে যে অভাবনীয় আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তাতে আশা জেগেছিল, দায়িত্বশীল সব পক্ষের টনক নড়বে এবং একটা বিহিত হবে। কিন্তু না, কার্যত দায়িত্বশীল মহল 'মেঘডম্বর' ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। তখন এই কলামেই এ ব্যাপারে লিখেছিলাম।

কিছুতেই থামছে না মৃত্যুর মিছিল। এত লেখালেখি, এত বক্তৃতা, সেমিনার, গোলটেবিল কোনো কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। সর্বশেষ মৃত্যুর মিছিলটি গত ঈদের আগে এবং পরে বৃদ্ধি পেয়ে একটা চূড়ান্ত জায়গায় এসে পৌঁছে। হাতে মেহেদি নিয়ে বর-কনে দু'জনই মৃত্যুবরণ করল। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, তিন বছরের শিশু নাহিদ বাবা, মা, ভাইবোন, মামাসহ সবাইকে হারিয়ে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসারত। নাহিদের বয়স এখন তিন। নাহিদ যখন আরেকটু বড় হবে, তখন সে পিতৃ-মাতৃ, ভ্রাতৃস্নেহবঞ্চিত একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে জানবে। কেউ হয়তো মনেই রাখবে না, অত্যন্ত নির্মম একটি দুর্ঘটনা সবাইকে কেড়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে। সে অনাগত দিনে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা আজকের চেয়ে কমবে কি-না, আমরা জানি না। তবে এভাবেই যদি চলতে থাকে, তাহলে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।

রাস্তাঘাটের সংখ্যা বাড়ছে, কোথাও কোথাও রাস্তাঘাট প্রশস্ত হচ্ছে, এক লেনের জায়গায় আট লেন হচ্ছে; কিন্তু তারপরও পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এখন ভালো রাস্তা দেখলেই ভয় হয়। চালকের দ্রুতগতি আমার জীবনটাও কেড়ে নেয় কি-না? বাস মালিক কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার; কিন্তু ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি সত্যিই আপসহীন। মানুষ মরুক-বাঁচুক তাতে তার কোনো দুশ্চিন্তা নেই, ব্যবসাটা হলেই হলো। ব্যবসা, ব্যবসা এবং ব্যবসাটাই তার কাছে মুখ্য। ঈদের সময় কোনো কোনো ব্যবসাদারের চেহারাটা একটা দানবে পরিণত হয়। সেই দানব ভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ-চতুর্গুণ করে দেয়। সড়ক পরিবহন মন্ত্রী অনুরোধ জানালেও তারা মোটেও ভ্রূক্ষেপ করে না। তার মানে এই শক্তির কাছে কোথাও না কোথাও সরকার বাঁধা পড়ে আছে। পরিবহন শ্রমিকরা এখন মানুষের কাছে এক ধরনের ত্রাস। পত্রপত্রিকায় যেসব লেখা ছাপা হয়, সেগুলো নিতান্তই অর্থহীন। কারণ গাড়ির চালকরা পত্রিকা পড়েন না। টেলিভিশনের টক শো দেখেন না। মালিকরা হয়তো কেউ কেউ পড়েন; কিন্তু বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না। চালকদের মধ্যে শিক্ষার অভাব আছে, নূ্যনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ নয় এবং এসব নিরক্ষর চালক শুধু গাড়ি চালাতে পারেন; কিন্তু গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। আর এই নিরক্ষর স্বর্গের দেবতা হচ্ছেন কিছু ডাকসাইটে রাজনৈতিক নেতা। এই নেতারা বিপুল অর্থের মালিক।

রাস্তার নিয়ন্ত্রণ যারা করেন, সেই পুলিশ প্রশাসন এই বিশৃঙ্খলা নানাভাবে রক্ষা করে চলেছে। পরিবহন শ্রমিকদের সাংগঠনিক শক্তি এতই প্রবল যে, তারা কোনো শাস্তিমূলক আইনও তৈরি করতে দেন না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি অথবা লাইসেন্স ছাড়া চালক এসব রাজপথের নিত্যদিনের উপাদান। সরকার বা পুলিশ প্রশাসন কেন যেন জনগণকে নিয়ে বিশৃঙ্খলা রোধ করার কথা ভাবতেই পারে না। গত বছর এই আগস্ট মাসেই দুই স্কুলছাত্রের বাস দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটা বড় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। যার নেতৃত্বে ছিল শিশু-কিশোর ও তরুণ ছাত্রছাত্রীরা। তারা রাজপথকে একটা শৃঙ্খলায় ফিরে আনতে সক্ষম হয়েছিল। ভয় পেয়েছিলেন চালক-মালিকরা। যদিও এ কথা ঠিক নয় যে, স্কুল-কলেজের ছাত্ররা দিনের পর দিন রাজপথে ট্রাফিকের কাজ করবে। কিন্তু এই আন্দোলন থেকে রাস্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ প্রশাসন শিক্ষা নিতে পারত, অনেক সাবধান হতে পারত। আন্দোলনটি একটি বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। রাস্তার বিশৃঙ্খলা সমাধানে আইনের কঠোর প্রয়োগ, আধুনিক ট্রাফিক সিস্টেম, যুগোপযোগী ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাই যথেষ্ট। কিন্তু এর মধ্যে ঢুকে গেছে দুর্নীতি এবং রাজনীতির কানাগলি।

চাঁদাবাজির একটা বিশাল জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন ব্যবস্থা। তাই বিষয়টি গভীরভাবে একটি রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এই যে প্রতিদিন প্রাণ যাচ্ছে, তার জন্য কেউ না কেউ নিশ্চয়ই দায়ী। কিন্তু কোনো দায়ী ব্যক্তির যথার্থ বিচার হয়েছে কি-না, তা বহুদিন ধরেই প্রশ্ন করে আসছে জনগণ। হাইওয়ে পুলিশ নামে পুলিশের একটি বাহিনী কাজ করে থাকে বলে আমরা জেনেছি; কিন্তু তার অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পাইনি। কদাচিৎ হাইওয়ে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান একশ' কিলোমিটারে কখনও দেখা যায়, কখনও দেখা যায় না। গত দুই ঈদে আমি প্রায় পাঁচশ' কিলোমিটার ভ্রমণ করেছি, কোথাও হাইওয়ে পুলিশের একটি গাড়িও দেখিনি। বরং কিছু কিছু জায়গায় প্রবল যানজট নিরসনের জন্য কোনো পুলিশকেও দেখতে পাইনি। দুয়েক জায়গায় দৃশ্যমান হলেও দেখা যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে পান-সিগারেট খাচ্ছেন। এই যে পুলিশ-চালক সম্পর্ক বহুদিন ধরে গড়ে উঠেছে, তাতে পথের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন। একবার ঢাকার পুলিশ কমিশনার হতাশ হয়ে বলেছিলেন, আমরা ব্যর্থ হলাম। একটি রাজপথে কতগুলো গাড়ি চলাচল সম্ভব তার কোনো হিসাব বিআরটিএর কাছে আছে? বিআরটিএ শুধু গাড়ির নম্বর-প্লেট বসিয়ে দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করে থাকে। পয়সা খরচ করলে ফিটনেস বা অন্যকিছুর জন্য কোনো বেগ পেতে হয় না। উন্নত দেশে দেখা গেছে, একটি গাড়ি কেনার পর রুট পারমিট পেতে দশ-পনের বছর সময় লেগে যায়।

রাস্তা সীমিত কিন্তু গাড়ি কিনলেই তো পথে নামানো যায়। ফলে ওই সীমিত পথে গাড়ির সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যেমনটি হয়েছে আমাদের বড় শহরগুলোতে। একসময় অনেক বাসের ফিটনেস বাতিল হয়েছিল; কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো রাস্তায় চলতে শুরু করে। শ্রীহীন, ভাঙাচোরা, দুর্দশাগ্রস্ত বসার জায়গা নিয়ে বল্কগ্দাহীন বেগে ছুটছে বাস। আর দূরপাল্লার বাসের গতি কে থামাবে? কারণ ড্রাইভারের তো ট্রিপ দিলেই টাকা। সেখানে যাত্রীর নিরাপত্তা, পথচারীদের নিরাপত্তার কথা ভাবার কোনো প্রয়োজনই নেই। কোনো এক নেতা বিআরটিএকে রীতিমতো চিঠি লিখেছিলেন, বিনা পরীক্ষায় এসব হাজার হাজার চালককে লাইসেন্স দিতে হবে। একটি দুর্ঘটনা হলে শুধু যে আরোহীরাই মৃত্যুবরণ করে তা নয়, চালকরাও অনেক সময় নিহত হন। আমাদের দেশে অধিকাংশ গাড়িচালকই নিম্নবিত্ত পরিবারের এবং অশিক্ষিত। একজন চালকের মৃত্যু হলে তার পরিবারও যে কীরকম দুর্দশাগ্রস্ত হয়, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। গাড়িচালকরা কেউ কেউ প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন বটে; কিন্তু অধিকাংশই সেই অর্থ রক্ষা করতে পারে না। তাদের জীবনযাপন নানা উচ্ছৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ। আবার ফিরে আসি তিন বছরের শিশু নাহিদের কাছে; স্মরণ করি চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীর কি অসম্ভব সম্ভাবনা নিয়ে সৃজনশীল কাজ করতে গিয়ে অকালে প্রাণ দিলেন। ঘর বাঁধার আগেই মেহেদিরাঙা হাতে এসে পড়ল রক্তের ধারা ইমরান-সাথীর। এদের কথা খবরের কাগজে এসেছে। কিন্তু এর মধ্যেও আমাদের অজানা অনেক মৃত্যু আকাশ-বাতাস ভারি করে তুলেছে।

আমাদের দেশে সুশিক্ষিত নাগরিক চেতনাসমৃদ্ধ চালকের হাতে রাজপথ আসতে হয়তো অনেক সময় লেগে যাবে, এটা বাস্তবতা। কিন্তু ভারত, শ্রীলংকায় ওই রকম সুশিক্ষিত চালক না থাকলেও আইনের কঠোর অনুশাসনের ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থা সুস্থ হয়ে এসেছে। অপ্রতুল হাইওয়ে পুলিশ ব্যবস্থাপনা এবং শহরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন ট্রাফিক সিস্টেমকে দক্ষ, প্রশাসন ও মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী বাহিনী নিয়োগ করা প্রয়োজন। এই কর্মী বাহিনীর দেখভালের জন্য ব্যাপক নজরদারি প্রয়োজন। ইউরোপ-আমেরিকা-জাপান-চীন- এসব দেশে রাস্তার পাশে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরাগুলো এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। আইন ভঙ্গ করে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালালে সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরায় ছবি চলে আসে এবং দ্রুত মামলা হয়ে যায়। সেই মামলার জরিমানাও কম নয়। প্রকারভেদে এসব জরিমানার অর্থ প্রায় গাড়ির সমান। ঈদের সময় দেখা যায়, দুর্ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঘটে হাইওয়েতে। যে হাইওয়ে একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমি জানি, যাদের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে তারা এ লেখা পড়বে না। কিন্তু যারা এসব অসমাপ্ত জীবন ও অনিশ্চিত পথযাত্রার ভুক্তভোগী, তারা হয়তো বিষয়টি ভেবে দেখবেন। সব জীবনই অমূল্য। দুর্ঘটনায় হারানো জীবন শুধু মানুষের দীর্ঘশ্বাস বয়ে আনে না, আকাশ-বাতাস প্রিয়জনের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে। যারা নীতিনির্ধারক, যারা এ ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারেন, তাদের কাছে কি আকাশ ভারি করা বিলাপ পৌঁছাবে না?

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজ বিশ্নেষক