কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়ানোর বিকল্প নেই

চলমান রোহিঙ্গা সংকটের দুই বছর

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সিএম শফি সামি

বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা দৃশ্যমান। কিন্তু এর যে মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব করে তোলা, সেটা এখনও দৃশ্যমান নয়। এর মধ্যে দুই বছর কেটে গেছে। গত ২২ আগস্ট তাদের প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা শুরু হতে পারেনি। কবে সেটা শুরু হবে বা কবে নাগাদ সবার প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে; তা এখনও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না।

আমার মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের নিঃশর্ত আশ্রয় দিয়ে যথার্থ ভূমিকাই গ্রহণ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ইস্যুটি যেভাবে 'আন্তর্জাতিক' করে তুলতে পেরেছেন, সেটাকেও কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল যেভাবে সম্পৃক্ত হয়েছে, সেটা নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনা এবং তার পররাষ্ট্র দপ্তরের সক্রিয়তা ও দূরদৃষ্টিরই ফসল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না সম্ভবত আরও কিছু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পক্ষের যথাযথ ভূমিকার অভাবে।

সর্বশেষ দফায় যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে এসেছে, তার একটি অংশ, বলা চলে অনেকটা প্রতীকী অংশকেও শেষ পর্যন্ত নিজভূমে ফেরত পাঠানো গেল না মূলত তাদেরই অনাগ্রহের কারণে। এ ক্ষেত্রে তারা নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে চায়। আসলে যে কোনো দেশেই শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে এগুলো প্রাথমিক শর্ত। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে কোনো শরণার্থীই পুনরায় তার জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে চাইবে না। মিয়ানমার যদিও নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে; তাদের কথায় আস্থা রাখা কঠিন। বাংলাদেশের সঙ্গেও তারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াতে হবে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের ইস্যুগুলো আন্তর্জাতিকভাবেই নিষ্পত্তি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে নিজের বাড়ি-ঘর, সম্পদ ছেড়ে শুধু প্রাণ হাতে নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিল চরম বিপদের মুখে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেখানে নিছক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নয়; রীতিমতো জাতিগত নিধন বা 'এথনিক ক্লিনজিং' চালানো হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ সেখানে গণহত্যার সমতুল্য অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে।

আমার মনে হয়, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে এখন আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে রাখাইনে আরেকটি অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। সেখানে গিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে হবে, ওই এলাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য কতটা উপযোগী। মিয়ানমার এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই আগ্রহী হবে না। বাংলাদেশকেই এ ব্যাপারে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে, আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো যাতে মিয়ানমারকে এ ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে।

আমরা দেখছি, চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির আওতায় যাতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হয়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত জুলাই মাসে বেইজিং সফরের সময় চীনা নেতৃত্বকে কার্যকরভাবে সম্মত করাতে পেরেছেন। চীনও দৃশ্যত এ ব্যাপারে সদিচ্ছা প্রদর্শন করে আসছে। বলা চলে, চীনের চাপেই মিয়ানমার এগিয়ে এসেছে। কিন্তু চীনকে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করতে মিয়ানমারকে আরও চাপ দিতে হবে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতকে এ ব্যাপারে আরও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সমর্থন ভারতকে দিয়ে আসছে; তার বিপরীতে রোহিঙ্গা সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধানে ভারতের উচিত সর্বাত্মকভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বর্তমান অবস্থা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি গোটা অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নতুন করে বিঘ্নিত করতে পারে। এখান থেকে সৃষ্টি হতে পারে সন্ত্রাসবাদী প্রপঞ্চ। সেটা কেবল বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের জন্য উদ্বেগের নয়; গোটা দক্ষিণ এশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য উদ্বেগের ব্যাপার হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে সাফল্যের সঙ্গে জাতিসংঘ এবং ওআইসিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সক্রিয় করতে পেরেছে। আমার মনে হয়, আসিয়ানকেও সমানভাবে কূটনৈতিক মঞ্চে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, মিয়ানমার এমন একটি দেশ; গণতন্ত্রের প্রশ্নে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পক্ষের চাপের মুখেও কয়েক দশক নিজস্ব অবস্থানে অনড় থেকেছে। আসিয়ানের কয়েকটি মুসলিম দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে সোচ্চার হলেও বেশিরভাগ দেশ এখনও স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি। আসিয়ানেও আমাদের কূটনৈতিক সক্রিয়তা আরও বাড়াতে হবে। চীনের পাশাপাশি আসিয়ানের অবস্থান মিয়ানমারকে তার অগ্রহণযোগ্য অবস্থান থেকে ইতিবাচক অবস্থানে আসতে সহায়তা করবে। শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষ থেকে চাপ দিয়ে মিয়ানমারকে নমনীয় করা কঠিন। লক্ষণীয়, মিয়ানমার প্রায় প্রত্যেকবারই ইতিবাচক সাড়া দেয়; কার্যত তা প্রতিপালন করে না।

আসলে যে কোনো শরণার্থী সংকটই তৈরি হওয়া যত সহজ, সমাধান ততই কঠিন। আর কূটনৈতিক পথে আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া শরণার্থী সংকট সমাধানের আর কোনো পথও এখন পর্যন্ত কার্যকর প্রমাণ হয়নি। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশ থেকে কবে তাদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে পারবে এবং সেখানে টেকসই জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করছে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের গতি-প্রকৃতির ওপর। এ ব্যাপারে আমরা যত সক্রিয় হবো, রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার সম্ভাবনা তত উজ্জ্বল হতে থাকবে।


কূটনীতিক; সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা