তিস্তায় পানির বদলে প্রতিশ্রুতিই গড়াবে?

বাংলাদেশ-ভারত

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শেখ রোকন

বাংলাদেশের দিক থেকে বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শংকর গত মঙ্গলবার আসলে কী বলে গেলেন? নতুন দায়িত্ব পাওয়া এই কূটনীতিক টার্নড রাজনীতিকের দুই দিনের ঢাকা সফরের দৃশ্যত মূল উদ্দেশ্য ছিল আগামী অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। স্বাভাবিকভাবেই এর বাইরেও বাংলাদেশে তার প্রতিপক্ষ এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে যৌথ বৈঠকে আসামের এনআরসি, সীমান্ত হত্যা, বিভিন্ন যৌথ প্রকল্প, রোহিঙ্গা প্রভৃতি ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। খুব বেশি প্রত্যাশা নিয়ে না হলেও আমি আগ্রহের সঙ্গে নজর রেখেছিলাম তিস্তা নিয়ে তিনি কী বলেন, সেদিকে।

স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবাহিত 'দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত' ৫৪ নদীর ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর এবার একটি 'নতুন' কথা বলেছেন। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পারস্পরিক সমঝোতা এবং উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে 'নতুন ফর্মুলা' খুঁজতে ঐকমত্য হয়েছে। (দৈনিক সমকাল, ২১ আগস্ট, ২০১৯)। আমার ধারণা, নতুন ফর্মুলা মানে আসলে 'একক ফর্মুলা' বোঝাতে চেয়েছেন তিনি। এখন এক একটি অভিন্ন নদী ধরে দুই দেশের মধ্যে আলাদা আলোচনা চলে। যেমন গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে একটি চুক্তি হয়েছিল। যেমন তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে পঞ্চাশের দশক থেকে আলোচনা চলছে। যেমন মনু, খোয়াই, ধরলা, দুধকুমার, ফেনী, মুহুরী নদী নিয়ে আলোচনা চলছে। একক ফর্মুলার ক্ষেত্রে যদি দুই দেশ একমত হতে পারে, তাহলে হয়তো অভিন্ন সব নদী নিয়ে একযোগে আলোচনা চালানো যাবে।

একদিক থেকে বিষয়টি মন্দ নয়। বস্তুত আমি নিজেও এ বিষয়ে অনেকবার লিখেছি। আগ্রহীরা পড়তে পারেন 'তিস্তার ঘাটেই বসে থাকব?' (দৈনিক সমকাল, ১৫ মে, ২০১২)। এখন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি যদি 'স্ট্যান্ডার্ড' ধরি, তাহলে এক একটি নদীর পানি বণ্টনের আলোচনায় অন্তত ২৫ বছর লেগে যাবে। তাহলে অর্ধশতাধিক নদীর ক্ষেত্রে তাত্ত্বিকভাবে অন্তত সাড়ে ১৩শ' বছর লেগে যাবে। তিস্তার আলোচনা পাঁচ দশকেও শেষ করা যায়নি। এই নদীর আলোচনা 'স্ট্যান্ডার্ড' মানলে প্রয়োজন হবে ২৭শ' বছর। বলাবাহুল্য, স্বীকৃত ৫৪টির বাইরেও দুই দেশের মধ্যে আরও অভিন্ন নদী রয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেশ ও অর্থনীতির জন্য সেগুলো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহ নেই, এক একটি অভিন্ন নদীর প্রেক্ষিত ভিন্ন। যেমন বিপুলা ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে ছোট্ট লংলার প্রেক্ষিত কোনোভাবেই মেলানোর অবকাশ নেই। কিন্তু আলোচনার দীর্ঘসূত্রতা বিবেচনায় একক ফর্মুলা মন্দের ভালো।

মুশকিল হচ্ছে, ভারতের পক্ষ থেকে অভিন্ন নদীগুলোর জন্য একক ফর্মুলার কথা এমন সময় বলা হচ্ছে, যখন তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে কেবল স্বাক্ষরের জন্য বাকি রয়ে গেছে। সবারই মনে থাকার কথা, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরেই ওই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি ও আকস্মিক অনুপস্থিতিতে তা আটকে যায়। তারপর থেকে গত আট বছরে তিস্তার প্রশ্নে ওই একই অজুহাত; কেন্দ্রীয় সরকার রাজি থাকলেও রাজ্য সরকারের অসম্মতির মুখে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না। এই অবস্থায় সব নদী নিয়ে একক ফর্মুলায় আগ্রহের 'বিটুইন দ্য লাইনস' অর্থ হচ্ছে, তিস্তা নিয়ে আলোচনায় অনাগ্রহ প্রকাশ করা। চূড়ান্ত হওয়া চুক্তিটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া।

বস্তুত এবারের সফরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে থেকে তিস্তার ব্যাপারে আলাদা করে বলতে কতটা আগ্রহী ছিলেন আমার সন্দেহ রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে শেষ পর্যন্ত বলেন- 'এ বিষয়ে আমাদের একটা অবস্থান আছে। প্রতিশ্রুতি আছে, এটা আপনারা সবাই জানেন। এতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।' (প্রথম আলো, ২১ আগস্ট, ২০১৯)। লক্ষণীয়, তিনি কার্যত তিস্তার নামও উচ্চারণ করতে চাননি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকরের এই সংবাদ সম্মেলন দেখতে দেখতে মনে পড়ছিল গত বছর মে মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলের ঢাকা সফরের কথা। সেবারও দুই পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, 'ওই হ্যাভ অলরেডি টকড অ্যাবাউট দ্য ওয়াটার শেয়ারিং ম্যাটার অব আইডেন্টিকেল রিভারস।' অর্থাৎ, আমরা ইতিমধ্যে 'নির্দিষ্ট নদীগুলোর' পানি বণ্টন বিষয়ে কথা বলেছি। তিনিও যেন 'তিস্তা' শব্দটি উচ্চারণ করতে কুণ্ঠিত ছিলেন।

সন্দেহের সুবিধা বা 'বেনিফিট অব ডাউট' দিয়ে বলতেই পারি যে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিব উভয়েরই তিস্তার নাম উচ্চারণে কুণ্ঠা কাকতাল মাত্র। নেপথ্যে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নেই। হতে পারে, গত কয়েক বছরে ভারতীয় পক্ষে তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুতে যখন এতবার 'প্রতিশ্রুতি' ব্যক্ত করা হয়েছে এবং দুই দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের যে কোনো সাক্ষাতে নদীটির প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে এত তোলা হয়েছে যে, নদীটির নাম উচ্চারণও বিব্রতকর হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরেও কি তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে? ভারতের জন্য যা-ই হোক, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জন্য তিস্তা একটি রাজনৈতিক ইস্যু। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হলেও তাতে সীমান্তের দুই পাশে নির্মিত দুই ব্যারাজের কতটা লাভ হবে, এ নিয়ে আমরা বিভিন্ন সময়েই প্রশ্ন তুলেছি। দুই ব্যারাজের পানি প্রত্যাহার ক্ষমতা কত এবং শুস্ক মৌসুমে প্রাকৃতিকভাবেই নদীটিতে কত কিউসেক পানি থাকে, এ নিয়েও কারিগরি আলোচনা আমরা কম করিনি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন উচ্চতার বন্ধুত্বের প্রশ্নে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাকে তিস্তা নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এই সেদিনও, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে, তিস্তাপাড়ের লালমনিরহাটে বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরেকবার খোঁটা দিয়েছেন। বলেছেন- 'বিরোধী দলে থাকতে শেখ হাসিনা বলেছিলেন ক্ষমতায় গেলেই তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা হবে। কিন্তু ক্ষমতার ১০ বছরেও তিনি সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।'


আমরা অবশ্য দেখছি, তিস্তা প্রশ্নে শেখ হাসিনা সরকারের চেষ্টার ঘাটতি ছিল না। দুই দেশের সম্পর্ক বিবেচনায় যতটুকু সম্ভব ঢাকার দিক থেকে তিস্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে হয়েছে। অনেকের মানে আছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফর দৃশ্যত অন্তত তিনবার পিছিয়েছিল। প্রকাশ্যে নানা কারণ দেখানো হলেও, কূটনৈতিক মহলে কানাঘুষা ছিল, তিস্তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনা দিল্লি যেতে চান না। ফলশ্রুতিতে, ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারিতে দুই দফা সফর পেছানোর পর এপ্রিলে শেখ হাসিনাকে পাশে রেখে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, তার ওই মেয়াদকালেই তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হবে। সম্ভবত ওই প্রতিশ্রুতিকে সম্মান জানিয়ে মোদি সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে হাসিনা সরকার। আমরা দেখি, পরের বছর, ২০১৮ সালের মে মাসে, পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনকালে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে ব্যতিক্রমীভাবে তিস্তা প্রসঙ্গ ওঠেনি।

তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে উজান-ভাটির আলোচনা পাঁচ দশক ধরে চলা বিষয়টিই 'ঐতিহাসিক' সন্দেহ নেই। গত কয়েক বছরে এই চুক্তির ব্যাপারে ভারতীয় পক্ষের 'প্রতিশ্রুতি' ব্যক্ত করাও যেন ইতিহাসের অনিবার্য অংশ হয়ে পড়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মনমোহন সিং বলে গিয়েছিলেন, তিস্তা চুক্তি হবেই। তার ভাষায়, এটা ছিল 'সময়ের ব্যাপার' মাত্র। ২০১৫ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাংলাদেশ সফরে এসে নরেন্দ্র মোদি আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছিলেন- 'পবন, পানি ও পাখি' সীমানা দিয়ে আটকানো যায় না। পরে দফায় দফায় কেবল প্রতিশ্রুতিই এসেছে, পানি নয়। অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে তিস্তা নিয়ে কী হবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।

আগাম বলা যেতে পারে, মোদি সরকারের প্রথম মেয়াদ শেষ হয়ে এখন দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হয়েছে। তিস্তা আটকে আছে সেই প্রতিশ্রুতিতেই। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শংকরও ঠারে ঠারে যা বলে গেলেন, সেটাকে অনুবাদ করলে কেবল প্রতিশ্রুতিই মেলে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তিস্তায় পানির বদলে কি কেবল প্রতিশ্রুতিই গড়াতে থাকবে?

লেখক ও গবেষক
মহাসচিব, রিভারাইন পিপল
skrokon@gmail.com