আইনের প্রয়োগ ও বিনিয়োগ পরিবেশ

অর্থ পাচার

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম হাফিজউদ্দিন খান

খেলাপি ঋণ এবং অর্থ পাচার- এ দুই-ই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের ব্যাপারে দৃশ্যত সরকারের উদ্যোগ-আয়োজনের কমতি নেই বটে কিন্তু বিস্ময়কর হলো, তারপরও এ চিত্র স্ম্ফীত হচ্ছে- এ রকম কথা শোনা যায়। এ নিয়ে কিছুদিন আগে এ কলামেই লিখেছিলাম। অর্থ পাচার নিয়েও নানারকম কথা হচ্ছে। সরকারের তরফে এ ব্যাপারে উদ্যোগ-আয়োজনের কমতি নেই বটে, কিন্তু তারপরও থেমে নেই অর্থ পাচার। কিছুদিন পর পরই সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার খোরাক জোগায়। অর্থ পাচার হচ্ছে নানাভাবে এবং বিষয়টি সম্পর্কে সরকারের সংশ্নিষ্টরা ওয়াকিবহাল। তারপরও কেন থামছে না অর্থ পাচার? তাহলে কি প্রকৃত অর্থে এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি আছে? এমন প্রশ্ন ইতিমধ্যে নানা মহল থেকে উঠেছে। কিছুদিন আগে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, 'ব্যাংক ব্যবস্থা এবং আমদানি-রফতানির আড়ালে অর্থ পাচার ঠেকাতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। অর্থ পাচার রোধে সব আমদানি-রফতানিকৃত পণ্য যথাযথভাবে স্ক্যানিং করা হবে। অর্থ পাচার মূলত ব্যাংক ও এনবিআর- এই দুই জায়গার মাধ্যমে হয়। এর বাইরে বড় আকারে মানি লন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা নেই। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি-রফতানির মাধ্যমে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলার মধ্য দিয়ে অর্থ পাচার হয়। আমদানি-রফতানির মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে আমরা শতভাগ স্ক্যানারের ব্যবস্থা করছি।' মন্ত্রীর এমন বক্তব্য আশা জাগানিয়া হলেও বিদ্যমান বাস্তবতা এখনও এর বিপরীত। অর্থ পাচার নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তবে কখনও কখনও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এর ব্যাপকতা বাড়ে-কমে। যারা অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত তাদের চিহ্নিত করা এবং কঠোর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু জরিমানায় এর যথাযথ সমাধান মিলবে না। মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন আমাদের বৃহৎ জাতীয় স্বার্থেই রোধ করতে হবে।

সংবাদমাধ্যমে এই যে কখনও কখনও খবর আসে দেশ থেকে প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে তা আমাদের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, এ যেন অনেকটাই জাতীয় দুর্যোগের মতো। বিদেশে অনেক বাংলাদেশির আলিশান বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি, বিদেশি ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় রয়েছে- এমন খবর তো নতুন কিছু নয়। এর জন্য অর্থ পাচার হয়েছে অবৈধভাবে, সরকার তথা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে। এর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হলে আশু কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিদেশে কারা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত, কোন কোন বিত্তবান সেকেন্ড হোমের মালিক ইত্যাদি বিষয় চিহ্নিত করতে বিদেশের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সঙ্গে চুক্তির আওতায় এ কাজ করা যেতে পারে। আমদানি ও রফতানি খাতের দুর্নীতি বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। অর্থ পাচার, জঙ্গি অর্থায়নের ব্যাপারে ইতিপূর্বে সরকারের সংশ্নিষ্ট মহল ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করার পরও এই দুস্কর্ম থেমে নেই।

অর্থ পাচার প্রতিরোধে এনবিআরের ভূমিকা আরও কার্যকর করতে মানি লন্ডারিং আইনের সংশোধন এবং দুদকসহ সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি ও এর কার্যকারিতা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। কিছুদিন আগে একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে প্রকাশ, সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশটির ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ বাড়ছে বৈ কমছে না। প্রায় একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে মালয়েশিয়ায়ও। অনেকেই বলে থাকেন, এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়। কখনও কখনও এমনটিও পরিলক্ষিত হয়েছে, সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ অর্থ পাচারের বিষয়টি আমলে নিতেই রাজি নন। যদি এই হয় অবস্থা তাহলে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি নেতিবাচক বিষয়ের গণ্ডিমুক্ত আমরা কীভাবে হবো! নিকট অতীতে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শতকরা ৮০ ভাগ অর্থ পাচার হয় আমদানি-রফতানির সময়। আমদানি মূল্য বেশি করে দেখানো হয়। রফতানি মূল্য দেখানো হয় কম করে। এর মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা চলে যাচ্ছে।

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী কয়েক বছর ধরে সুইস ব্যাংক জমাকৃত অর্থের পরিমাণটা প্রকাশ করে থাকে, যা আগে করত না। এখনকার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তথ্য দেওয়ার ব্যাপারে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। আমরা অনেকেই জানি, জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী যে সনদ আছে, এর বাইরে বাংলাদেশ অর্থ সরবরাহের তথ্য জানার জন্য আরও বেশ কিছু দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক সই করেছে। কাজেই আমি মনে করি, তথ্য জানার বিষয়টি এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দুদককে এ ব্যাপারে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অভিযুক্ত যে বা যিনিই হোন না কেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনোরকম পক্ষপাতমূলক আচরণ কিংবা বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কাম্য নয়।

অর্থ পাচার প্রতিরোধে সরকারের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলকে আরও সুনির্দিষ্ট করে দায়িত্ব ভাগ করে দিতে হবে এবং এর মনিটরিং ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সব মহলের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে আরও জরুরি হলো সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যারা অর্থ পাচার করে তারা যাতে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছায়া না পায় তাও নিশ্চিত করা জরুরি। বিদ্যমান বাস্তবতা আমলে রেখেই অর্থ পাচার রোধে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। আর এ জন্যই সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে দেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো যেসব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে এর যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে। এ ক্ষেত্রে তারা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সমীকরণ করে থাকে। এর নিরসন ঘটানো জরুরি। ব্যবস্থা ভালো না করলে অবস্থা ভালোর আশা দুরাশা মাত্র।

অর্থ পাচার রোধে সরকারের রাজনৈতিক কোনো সদিচ্ছার অভাব নেই- সরকারের এমন অঙ্গীকারের ব্যাপারে কেউ কেউ যে প্রশ্ন তোলেন তাও অমূলক নয়। যদি তাই না হতো তাহলে কীভাবে অর্থ পাচার হয়ে থাকে? দুদককে শক্তিশালী করার কথা সরকারের তরফে বার বার বলা হলেও এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে তাদের অবস্থান ও কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ তো বটেই, পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। যত কথাই বলা হোক না কেন, বিনিয়োগ পরিবেশ-পরিস্থিতি এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত হলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বিস্তৃত হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করার পরও অবৈধ অর্থ বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করার অপচেষ্টা চলতে পারে। কাজেই বিনিয়োগ পরিবেশ যেমন জরুরি, পাশাপাশি এও জরুরি যে, কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং এর দৃশ্যমান প্রয়োগ।

অর্থ পাচার রোধ করতেই হবে। দেশের অর্থনীতিসহ জাতীয় সামগ্রিক স্বার্থ-প্রয়োজনের নিরিখে এর কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও সমভাবেই জরুরি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি নিশ্চিত হলে অনেক অনিয়ম-অনাচারই সহজে রোধ করা যাবে। অস্বচ্ছ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে থাকে সুযোগসন্ধানীরা- এ রকম তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। এসব নিয়ে এ পর্যন্ত কথা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত কিংবা দুঃখজনক হলেও সত্য, কাজের কাজ এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়। অর্থ পাচার জাতীয় দুর্যোগেরই নামান্তর- এভাবেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের যা যা করণীয় তা করতে হবে পক্ষপাতহীন অবস্থান নিয়ে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন