শোভন-রাব্বানীর অপসারণ ও কিছু প্রশ্ন

বলা না-বলা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু সাঈদ খান

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে বিদায় নিতে হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে কমিশন দাবি, টাকার বিনিময়ে কমিটিতে পদ দেওয়া, মাদক সংশ্নিষ্টতাসহ নানা অপকর্মের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের পদত্যাগের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই হস্তক্ষেপ সময়োচিত। এটিকে স্বাগত জানাই।

এই দুই ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা ভারী হয়ে উঠেছিল, তাদের ঔদ্ধত্য অনেক ক্ষেত্রে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে অপরাধী কেবল ওরা দু'জনই নয়, আরও অনেকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে। গতকাল সোমবার সমকাল 'শোভন-রাব্বানী কমিটির ৭২ জন অভিযুক্ত' শিরোনামে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে- 'ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির ৭২ জনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। মাদকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট রয়েছেন ৬ জন। ১৫ জন বিবাহিত। প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, এমন একাধিক নেতাও কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন। জামায়াত পরিবারের সন্তান ও গোপনে শিবিরের রাজনীতি করছেন- এ রকম কয়েকজন ছাত্রলীগের পদে আছেন। সদ্য পদত্যাগকারী ছাত্রলীগ সেক্রেটারি গোলাম রাব্বানীর জেলা মাদারীপুর থেকেই কমিটিতে ঠাঁই হয়েছে ২২ জনের।' নানা অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধেও।

প্রশ্ন জাগে- এই কি সেই ছাত্রলীগ? যে সংগঠন ভাষা আন্দোলনের অগ্রসেনা ছিল। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম কর্ণধার। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছে। একাত্তরে স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলন করেছে। জাতীয় সঙ্গীতও নির্ধারণ করেছে। ছাত্রলীগ মঞ্চ থেকেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়েছে। ছাত্রলীগ তথা ছাত্র সংগঠনগুলো ছিল জাতির আশা-ভরসাস্থল। তখন কৃষক পাটের ন্যায্য দাম না পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে আসতেন। বলতেন, বাবারা তোমরাই আমাদের ভরসা। তখন পাটের ন্যায্য দামের দাবিতে ছাত্ররা রাস্তায় নামত। এভাবেই পাটের ন্যায্য মূল্যের দাবিটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতো। এমনকি কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়লে ছাত্রনেতাদের শরণাপন্ন হতো। ছাত্র নেতাকর্মীরা পাশে দাঁড়াতেন। এখন সাধারণ মানুষ ছাত্রনেতাদের থেকে দূরে থাকে, ভয়ে থাকে; যাতে তাদের হাতে লাঞ্ছিত হতে না হয়। এই হলো সেই ছাত্রলীগ বা ছাত্র রাজনীতির পরিণতি!

এই অবস্থার জন্য কে বা কারা দায়ী? এ নিয়ে বহুবার লিখেছি। নতুন করে বলার কিছু নেই। পুরনো কথাই নতুন করে বয়ান করব। সংশ্নিষ্ট ছাত্র নেতাকর্মীদের কৃতকর্মের কৈফিয়ত দিতে হবে। কোনো অজুহাতেই পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে পদস্খলনের যে পথ নির্মিত হয়েছে, তার দায় রাজনীতির নীতিনির্ধারকদেরই বহন করতে হবে।

সর্বাগ্রে বলতে হয়, অর্থনীতিতে মুক্তবাজার আর রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়বে না, কী করে আশা করি? তদুপরি দেশে যে আদর্শহীন রাজনীতির চর্চা চলছে, তার হাওয়া তরুণ সমাজের গায়েও লাগবে না, তাও-বা কী করে হয়? টাকাওয়ালারা এখন রাজনীতির পেছনে ছুটছেন। আবার রাজনীতিকরাও টাকার পেছনে ছুটছেন। কারণ, টাকাই এখন রাজনৈতিক যোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড। টাকা থাকলে নির্বাচনে মনোনয়ন বাগানো যায়, এমপি-মন্ত্রী হওয়া যায়। বলা বাহুল্য, আমি টাকাওয়ালা বা ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে আসার বিপক্ষে নই। সব পেশার মানুষের রাজনীতি করার অধিকার আছে। তবে তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে। মনোনয়ন, এমপি, মন্ত্রী বা নেতা হওয়ার মাপকাঠি হতে হবে রাজনৈতিক যোগ্যতা, ত্যাগ ও আদর্শ; টাকার দাপট নয়।

ছাত্রনেতারাও বুঝে ফেলেছেন, রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে চাই টাকা। টাকা ছাড়া নেতা হওয়া যাবে না। তাই যে পথে 'মহাজন' করেছে গমন, সেই পথেই তারাও অগ্রসর হয়েছেন। এটি সবাইকে বুঝতে হবে, রাজনীতি চলবে যে পথে, ছাত্র রাজনীতি কি ভিন্ন চলতে পারে? অতীতে ছাত্র রাজনীতির আদর্শিক ও গণমুখী ধারা ছিল। ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্র সমাজ ও জনগণের সমস্যা নিয়ে ভাবত। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করত। কোন পথে অগ্রগতি, কোন পথে মুক্তি- সেটিই ছিল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়বস্তু। তখনও ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক ছিল; কিন্তু অন্ধ অনুসারী ছিল না। দল ও ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছিল আদর্শের সম্পর্ক। যে কারণে রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হতো। ইচ্ছা করলে কিছু চাপিয়ে দিতে পারত না। এখন ছাত্র সংগঠন রাজনৈতিক দলের লেজুড়ে পরিণত হয়েছে। দলের হয়ে লাঠিবাজি করছে। দল যা বলছে, তা অন্ধ অনুসরণ করছে। এমনকি নেতাদের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থেও ছাত্ররা ব্যবহূত হচ্ছে। একজন ছাত্রনেতা যখন কোনো নেতার হয়ে একবার মাস্তানি করবে, পরে নিজের স্বার্থে তা আরও কয়েকবার করবে। এভাবেই ছাত্রনেতাদের একাংশ হয়ে উঠছে চাঁদাবাজ, পথভ্রষ্ট।

আজকের সংকটের অন্যতম কারণ, ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রহীনতা। এখন রাজনৈতিক দল ছাত্র সংগঠনের নেতা ঠিক করে দেয়। যোগ্যতা বলে কাউন্সিলরদের সমর্থন নিয়ে নেতৃত্বে আসতে হয় না। এর ফলে ছাত্র নেতৃত্বকে প্রধানত মূল সংগঠনের নেতাদের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, সতীর্থদের কাছে নয়। সমস্যা হলো- কোন ছাত্রনেতা কী করছে, তা মূল দলের নেতারা সহজে জানতে পারেন না।

এই প্রক্রিয়ায় ছাত্র নেতৃত্ব রাজনৈতিক নেতাদের মন জুগিয়ে চলতে সদাতৎপর। কমিটির সদস্যদের থোড়াই কেয়ার করে। তারা জানে- ওপরে ঠিক, সব ঠিক। এই প্রক্রিয়ায় কমিটির চেয়ে নেতা বড়। অন্যদিকে কমিটির অন্য সব কর্মকর্তা ও সদস্যরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মন জুগিয়ে চলতে না পারলে বিপদ।

ছাত্র রাজনীতিতে এখন বন্ধ্যত্ব। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন হয় না। মধুর ক্যান্টিন বা অন্য কোথায়ও আদর্শিক বাহাস-বিতর্ক হয় না। শিক্ষাঙ্গনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও ঝিমিয়ে পড়েছে। ছাত্রনেতারা ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় ও ভাগাভাগিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বেড়েছে পেশির দাপট। বহুদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হয়েছে; কিন্তু ডাকসু কার্যকর হলো না। ছাত্রলীগকে পরাস্ত করে সহসভাপতি হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর। তিনি আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে বারবার লাঞ্ছিত ও প্রহূত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কেউ তার পাশে নেই। পুলিশ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। এই হলো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের পরিবেশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরোধী পক্ষ থাকবে না, কেবল ক্ষমতাসীনদের সমর্থকদের বিচরণ থাকবে, তখন ভালো হওয়ার প্রতিযোগিতাও থাকবে না। আমরা বিএনপির আমলে ক্যাম্পাসগুলোতে কেবল ছাত্রদলকে দেখেছি। এখন কেবল ছাত্রলীগকে দেখছি। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো কিছুটা আপসমূলক সম্পর্ক গড়ে ক্যাম্পাসে টিকে আছে। কিন্তু অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে না বা হতে পারছে না।

এটি মনে রাখা দরকার, ছাত্র রাজনীতির এই বন্ধ্যত্বের কারণেই ছাত্রনেতা নামধারী দুর্বৃত্তের জন্ম হচ্ছে। একজন শোভন ও একজন রাব্বানী বিদায় নিলেও সারাদেশে হাজারো শোভন ও রাব্বানী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যারা চাঁদাবাজি, লুটপাট, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে লিপ্ত, তাদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? শোভন-রাব্বানীর পথে কেউ যে আর হাঁটবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়?

প্রশ্ন হচ্ছে, ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনীতির সুবিধাবাদী ধারার মধ্যে হাবুডুবু খাবে, না বেরিয়ে আসবে? ছাত্র আন্দোলনে অনেক অসাধ্য সাধন করার দৃষ্টান্ত আছে। ১৯৪৭-উত্তর কথাই ভাবা যাক। মুসলিম লীগের নেতাদের সিংহভাগ যখন আপসের চোরাবালিতে মাথা গুঁজেছে, তখন তরুণ সমাজ জাতিকে পথ দেখিয়েছে। তরুণরাই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল রাজনীতির সূত্রপাত করেছে। আজও কি তরুণরা রাজনীতির অধঃপতিত ধারার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি পারে না ছাত্র রাজনীতিকে স্বার্থ হাছিলের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে?

ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমাদের এডিস মশার উৎসস্থলে নজর দিতে হচ্ছে। ঠিক ছাত্র রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধেও উৎসমুখের দিকে নজর দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র ও মুক্তবুদ্ধিচর্চার প্রতিবন্ধক যে আইনি ও বেআইনি প্রাচীর গড়ে উঠেছে, তা গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আর তা না হলে ছাত্রাঙ্গন ও ছাত্র সংগঠনগুলোতে দুর্বৃত্তের উত্থান রোধ হবে না।

সাংবাদিক ও লেখক
[email protected]