নিরাপত্তা ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মোহাম্মদ আলী শিকদার

১৬ সেপ্টেম্বর একটি প্রধান দৈনিকের শেষ পাতায় বড় শিরোনাম ছিল- 'রোহিঙ্গাদের এনআইডি কার্ডপ্রাপ্তি, তদন্তে দুদক। প্রতিবেদনে প্রকাশ, চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রাপ্তি নিয়ে কেলেঙ্কারির ঘটনায় তদন্তে দুদকের দল নিশ্চিত ছিল- চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে বসেই ওই অপকর্ম চালিয়েছে একটি জালিয়াত চক্র। ১৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রধান শিরোনাম- 'নানা কৌশলে ভোটার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা'। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর শুরুতে উল্লিখিত একই দৈনিকের শেষ পাতায় আরও একটি বড় উদ্বেগজনক খবর ছাপা হয়। তাতে বলা হয়- 'রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আবদার, অবাধ চলাফেরা, ফোন ও ইন্টারনেট সেবা দাবি।' এ বিষয়ে সরব অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও এইচআরডব্লিউ। একটা জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল্য টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অথচ নির্বাচন কমিশনের কিছু দুর্নীতিবাজ লোক স্থানীয় দুর্বৃত্তদের সহায়তায় জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট অপকর্ম করে যাচ্ছে নিশ্চিন্ত মনে। উল্লিখিত খবরগুলো যে নতুন শুনছি, তা নয়।

১৯৭৮ সালের পর থেকে অদ্যাবধি রোহিঙ্গাদের নিয়ে এ রকম খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় আসছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বানের স্রোতের মতো রোহিঙ্গা আসার আগ পর্যন্ত এর ভয়াবহ পরিণতি অনুধাবন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ২০১৭ সালের আগে সাড়ে তিন-চার লাখ রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল দীর্ঘদিন ধরে। এদের ঘিরে এনআইডি, পাসপোর্ট প্রদানের খবরসহ আরও মারাত্মক সব খবরের সচিত্র প্রতিবেদন পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের যতটুকু সতর্ক হওয়া দরকার ছিল. তার কিছুই আমরা করিনি। সে সময়ে সব ব্যাপারে যদি আমরা সতর্ক হতাম, তাহলে হয়তো ২০১৭ সালে এত বড় দুর্যোগ আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ত না। ওই সাড়ে তিন-চার লাখ রোহিঙ্গার নিবন্ধন ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত করা হয়নি। ফলে সঠিক হিসাব তখন কেউ জানতেন না। তারা সেখানে কী করত, সে খবর কেউ গুরুত্বসহকারে ধর্তব্যের মধ্যে নিয়েছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। ২০১৭ সালের আগে এই রোহিঙ্গা ইস্যু সম্পর্কে আমি বেশ কিছু লেখা লিখেছি। টেলিভিশনের টক শোতে একাধিকবার বলেছি, এই অবৈধভাবে, নিবন্ধনহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা আমাদের রাষ্ট্রের ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য বিষফোঁড়া। তখন কক্সবাজারে জাতিসংঘের ক্যাম্পে রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০-৩২ হাজার। অবশিষ্ট সাড়ে তিন-চার লাখের কোনো হিসাব কারও কাছে ছিল না।

এখনকার তুলনায় তখন সংখ্যা কম থাকায় স্থানীয় জনগণ আজকে যে রকম বিপদের সম্মুখীন, সেটি তারা সে সময়ে বুঝতে পারেনি। তখন অনেক রোহিঙ্গা এনআইডি পেয়েছে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গেছে। অনেকে ভোটার হয়েছে, সে খবরও পত্রিকায় বিভিন্ন সময় ছাপা হয়েছে। এসব পুরনো রোহিঙ্গা আজ সব ক্যাম্পের নেতা হয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রত্যাবাসনের পথে নানারকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ কাজে সহায়তা করছে স্থানীয় ক্ষমতাবান দুর্বৃত্ত চক্র, যারা শুধু ক্ষমতা ও টাকা ছাড়া দেশ-জাতির ভালোমন্দ চিন্তা করে না। সে সময় রোহিঙ্গারা নিজেদের মতো করে মাদ্রাসা করেছে, স্কুল করেছে- কেউ ভ্রূক্ষেপ করেনি। সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে রামুতে একটি মাদ্রাসা তখন হয়েছিল, যার নাম সম্প্রতি পরিবর্তন করা হয়েছে। রামুতে যে কোনো মানুষকে জিজ্ঞেস করলেই ওই মাদ্রাসা দেখিয়ে দিতে পারে। এই কয়েকদিন আগে উখিয়া উপজেলার ময়নাগোলা ক্যাম্প থেকে সাব্বির আহমদ মনজু নামের এক রোহিঙ্গার কাছ থেকে অত্যাধুনিক একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই লেখাটি লিখতে বসে কক্সবাজারের কয়েকজন সাংবাদিক ও পরিচিতজনের সঙ্গে কথা বলে যে বিষয়গুলো জানলাম তা সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মোটেও ভালো খবর নয়।



বিষয়গুলো একেক করে এখানে তুলে ধরছি- এক. প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ৩২টি ক্যাম্পের ভেতরে কোথাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারি কোনো প্রতিনিধি থাকেন না। শুধু তিন প্রধান প্রবেশপথে তিনটি পুলিশ পোস্ট থাকে। ক্যাম্পের ভেতরে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার বড় একটা অংশ নিরীহ হলেও পাশাপাশি অনেক দুর্বৃত্ত চক্র তৈরি হয়েছে। এই দুর্বৃত্ত চক্র কী করছে, তার হদিস রাখার মতো ওই সময়ে ক্যাম্পের ভেতরে কেউ থাকে না। ক্যাম্পের ভেতরে ফাঁড়ি নেই এবং রাতের বেলায় পুলিশের টহল দলও থাকে না। গত দুই বছরে ক্যাম্পের ভেতরে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে ৩০ জনের বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে; দুই. ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গারা শত শত দোকানসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের পসার বসিয়েছে। ব্যবসা করে অনেক রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে বিপুল টাকার মালিক হয়েছে; তিন. ক্যাম্পের ভেতরে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য জাতিসংঘসহ দেশি-বিদেশি এনজিওর পক্ষ থেকে প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে চাকরি দেওয়া হয়েছে, যাদের মাসিক বেতন ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত; চার. জাতিসংঘসহ এনজিওদের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে দুই হাজার নেতা বা মাঝি নিয়োগ কিংবা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যারা ক্যাম্পের ভেতরে সবকিছুর মাতবরি-সর্দারি করে। টেকনাফ, উখিয়া উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন রয়েছে। উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাউকেই কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়নি। কিন্তু অন্যদিকে স্থানীয় সাধারণ জনগণই আজ সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার হুমকির মধ্যে আছে; পাঁচ. একজন সাংবাদিক তথ্য দিলেন, তিনি একদিন দিনের বেলায় একটি ক্যাম্পে গিয়ে ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সহকারী, পিয়ন, সিকিউরিটি কাউকেই দেখতে পাননি। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান ওই সাংবাদিক জানালেন, এতদিন অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার যে কর্মকর্তা সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ভোগবিলাস আর বিদেশি সংস্থাগুলোর গিফটের পর গিফট নিয়ে বাংলাদেশকে ২০০ বছরের ক্ষতির মধ্যে ফেলে গেছেন। শোনা যায়, ২২ আগস্ট মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের অনেকেই আগের রাতে কিডনাফ হয়েছে কথিত রোহিঙ্গা নেতা মহিবুল্লার লোকজন দ্বারা; ছয়. একজন আরেকটি তথ্য দিলেন। তিনি জানালেন, বিভিন্ন সাহায্যসমগ্রী নিয়ে জাতিসংঘসহ বিদেশি এনজিওদের কার্গো বিমান ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবতরণ করে। সেখান থেকে কাভার্ড ট্রাকে সেগুলো সরাসরি জাতিসংঘ ও বিদেশি এনজিওদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় চলে যায়। এই কার্গোতে কী সব দ্রব্য আসে এবং কী পরিমাণ আসে, তা দেখার জন্য বাংলাদেশি কোনো প্রতিনিধি থাকেন না।

ক্রমিক নম্বর এক থেকে ছয় পর্যন্ত বর্ণিত তথ্যাদির অর্ধেকও যদি সঠিক হয়, তাহলে বুঝতে হবে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দুটি নিয়েই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ আছে। উদ্বাস্তু শরণার্থীরা তো ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমতি পাওয়ার কথা নয়। তাহলে তারা কী করে জাতিসংঘ এবং এনজিওগুলোতে হাজার হাজার টাকা বেতনের চাকরি পেল? কী করে তারা হাটবাজার তৈরি করে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে? এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে চাইবে না- সেটাই স্বাভাবিক। আর নিরীহ রোহিঙ্গারা নিজ ভিটেমাটিতে ফেরত যেতে চাইলেও শক্তিশালী সিন্ডিকেট, ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তো রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে দেবে না। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গারা যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে স্রোতের মতো বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণ নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে ওইসব নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সব রকম সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। দুই বছরের মাথায় এসে চিত্রটি সম্পর্ণ বিপরীত হলো কী করে।

স্থানীয় জনগণ এখন একটা ভীতিময় পরিস্থিতির মধ্যে আছে। অনেক স্থানীয়রা বলেন, স্কুল-কলেজে মেয়েদের পাঠিয়ে তারা সব সময় শঙ্কায় থাকেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু স্থানীয় জনগণ নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরও বড় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে। এটা সবাই জানেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কিছু ধর্মান্ধ উগ্রবাদী গোষ্ঠী হতাশাগ্রস্ত সাধারণ রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগে বহু রকম উস্কানিমূলক অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করেছে সবসময়। কক্সবাজারের স্থানীয় কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তি দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নিয়ে ড্রাগ, মানব পাচার ও অস্ত্র চোরাচালানের মতো ভয়ঙ্কর সব অপবাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিছুদিন আগে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা ড্রাগ ব্যবসার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম, সেগুলো নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের একটা সংক্ষিপ্ত ও সীমাবদ্ধ পর্যালোচনা মাত্র। বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখলে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো আরও বহু কারণ রয়েছে। গত দুই বছরে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হয়নি বা তারা ফেরত যায়নি, সেটা বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের দীর্ঘসূত্রতার তুলনায় হতাশ হওয়ার মতো কিছু নয়। হোস্ট কান্ট্রি বা শরণার্থী গ্রহণকারী দেশ হিসেবে সতর্কতার বিষয় হলো, এই হতাশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা দেশ যেন দুরভিসন্ধি আঁটতে না পারে, তার জন্য শুরু থেকে কড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয়। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আছে। এর পরিণতিতে বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্নেষক
[email protected]