ঐক্যফ্রন্ট কতটা সফল হবে

 রাজনীতি

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আহমদ রফিক

বাংলাদেশের রাজনীতি স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকেই সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা অনুসরণ করে চলেছে; যদিও এর মধ্যে সামরিক ব্যক্তিত্বের অধীনে রাষ্ট্রপতি-শাসন পদ্ধতির ব্যবস্থাও চলেছে নেহাত কম সময়ের জন্য নয়। সংসদীয় গণতন্ত্রী ব্যবস্থার মূল কথা দেশি-বিদেশি তাত্ত্বিকগণ বলে থাকেন- এতে ক্ষমতাসীন শাসনের বিপরীতে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক শাসনের জন্য অপরিহার্য। তা না হলে শাসনব্যবস্থা একনায়কী চরিত্র অর্জন করতে পারে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরোধী। এটা বহু উচ্চারিত বক্তব্য।

বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। সরকার তার ইচ্ছামতো রাষ্ট্র পরিচালনা করছে; জবাবদিহির কোনো অবকাশ সেখানে দৃশ্যমান নয়। গৃহপালিত বিরোধী দলকে তাদের নির্ধারিত ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে।

গত নির্বাচনে যারা বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তারা নানা মতভেদে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন-ভিন্ন মতাদর্শগত মতবিভেদ ও বিরূপতা, প্রাক-নির্বাচনী পরস্পর-বিরোধিতা এতটা প্রকট ছিল যে, এদের জোট বলাটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নেতৃত্বের কোন্দল নিয়ে এক গালিচায় একাধিক পীরের অবস্থান অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়; বিশেষ করে ড. কামাল হোসেন বনাম ডা. বি. চৌধুরীর অদৃশ্য দ্বন্দ্ব। শেষ পর্যন্ত বি. চৌধুরীর প্রস্থান ঐক্য প্রক্রিয়ার জোট থেকে।

অন্যদিকে এক সময়কার অন্যতম প্রধান দল বিএনপি তৎকালীন সংকটাপন্ন অবস্থায়ও নিজদের পূর্বমহিমা ভুলতে পারেনি। তাই অনিচ্ছায় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের জোটবদ্ধ হওয়া। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আচরণে অন্তর্নিহিত অসন্তুষ্টির প্রকাশ রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। পরে তো তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নির্বাচনোত্তর পর্যায়ে বিএনপি বনাম ঐক্য প্রক্রিয়ার দ্বন্দ্ব আরও এতটাই প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে যে, বিষয়টি ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রধান ড. কামাল হোসেনের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। স্বভাবসুলভ বিনয়ে অভ্যস্ত ড. কামাল হোসেন সেসব হজম করে নিয়ে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন।

দুই .

বর্তমান আলোচ্য বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব ঘটনার কিছুটা বিশদ বিবরণ তুলে ধরার কারণ একটাই। ঐক্য প্রক্রিয়া বনাম বিএনপির পূর্বসম্পর্কটির অন্তর্গত কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে বলে আমার মনে হয় না। অপ্রিয় সত্য হলো, ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেমনই হোক, এ সম্বন্ধে ভারত, চীনসহ আন্তর্জাতিক মহল তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি। কারণ যাই হোক এবং আওয়ামী লীগ একচেটিয়াভাবে হলেও শক্ত হাতে দেশ শাসন করে চলেছে।

বিএনপি এই বিতর্কিত নির্বাচন তখনও মেনে নিতে পারেনি, এখনও নির্বাচনোত্তর আওয়ামী লীগের নির্বিঘ্ন শাসন সহ্য করতে পারছে না। সর্বোপরি তাদের নেত্রী দুর্নীতি মামলার রায়ে কারারুদ্ধ। তার মুক্তির কোনো প্রকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তাকে ডিঙিয়ে তারেক রহমানের দড়ি ঢিলে দেওয়া, গুটিকয় নির্বাচিত প্রতিনিধির সংসদে যোগ দেওয়ার কোনো সুফল মেলেনি। এমন গুঞ্জন তখন বাতাসে ভাসছিল, তারেকের এই ছাড় দেওয়া খালেদা জিয়ার জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে। কিন্তু বৃথা সেসব জল্পনা-কল্পনা।

প্রায় এক বছর হতে চলল, মোটামুটি বৈশ্বিক সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার রাজ্যপাট গুছিয়ে নিচ্ছেন। দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সত্ত্বেও তা সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না। একমাত্র সমস্যা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য তিস্তা চুক্তি এবং ভবিষ্যৎ আসাম এনআরসি নিয়ে। দুটি বিষয়ই জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে চলেছে। অসন্তোষ যতটা সরকারের বিরুদ্ধে, দুর্বোধ্য কারণে তা অধিকতর মাত্রায় ভারতের বিরুদ্ধে। মোদি সরকার তথা বিজেপি যদি কথিত 'অনুপ্রবেশ'-এর ইস্যুটি নিয়ে অনড় অবস্থান নেয়, সেটা তাহলে আওয়ামী লীগের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে উঠবে।

একটি বিষয় সম্ভবত রাজনৈতিক মহলে সবারই উপলব্ধিতে রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের অতিমাত্রিক ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি জনগণের অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠছে। এটা একদিক থেকে আওয়ামী লীগ শাসনের দুর্বলতা হিসেবে গণ্য। রাজনীতিমনস্ক শিক্ষিত শ্রেণিতে জরিপ করা হলে প্রকট ভারত-বিরোধিতাই হয়তো প্রকাশ পাবে। ভারতের নিরপেক্ষ সাংবাদিক মহল এ সম্বন্ধে সচেতন, যা তাদের লেখায় প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সরকারের জন্য এটা নেতিবাচক দিক। সম্ভবত সরকার এ সম্পর্কে সচেতন বলেই বোধহয় ভারতবিরোধী চীনের সঙ্গে বিশেষ এক মাপের সম্পর্ক রেখে চলছে।


তিন.

এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো, এর পেছনে রয়েছে একটি সংবাদ শিরোনাম :'সরকারবিরোধী সব দলকে পাশে চায় ঐক্যফ্রন্ট'। অনেক দিন পর ঐক্যফ্রন্ট একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময়ের অলসঘুমের জড়তা কাটিয়ে ঐক্যফ্রন্ট আবার সবকিছু ভুলে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। উদ্দেশ্য, একাধিক সরকারি দুর্বলতার ইস্যু নিয়ে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি তৈরি করে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করা, দাবি-দাওয়া তুলে ধরা, পরিবেশ অনুকূল হলে আন্দোলনে নামা। মূলত এককথায়, জনঅসন্তোষ থেকে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা।

সে উদ্দেশ্য সামনে রেখে গণফোরাম নেতা, নাগরিক ঐক্যের নেতা, জেএসডি সবাই সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিয়েছেন; যাতে আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী, আরও ঐক্যবদ্ধ একটি জোট গঠন করে সরকারকে সুনির্দিষ্ট দাবি মানতে বাধ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে বিতর্কিত খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি এই নতুন প্রচেষ্টায় প্রধান ইস্যু করে তোলার তারা পক্ষপাতী নন। এটা বিএনপির একক দলীয় ইস্যু হিসেবে দেখতে চান তারা, কৌশলগত কারণে। প্রাধান্য দেওয়া জাতীয়-জনবান্ধব ইস্যুগুলোকে।

এই জোট তৈরির ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য একদিকে বামপন্থি দলগুলোকেও এবার জোটভুক্ত করা, সেই সঙ্গে সরকারবিরোধী ইসলামপন্থি দলগুলোকেও জোটে টেনে আনা। অর্থাৎ রাজনৈতিক মতাদর্শের বিচারে পরস্পরবিরোধী দলগুলোকে এক তাঁবুর নিচে অবস্থানের ব্যবস্থা করা। নেপথ্যে ভারতবিরোধী ঐক্যজোট।

ইস্যু বা দাবি যত বাস্তবোচিত হোক না কেন, শেষোক্ত স্ববিরোধী প্রচেষ্টা কি খুব একটা টেকসই হবে? বামপন্থি দলগুলোর জন্য তা কতটা গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে? বিশেষ করে সিপিবির ক্ষেত্রে? সর্বদলীয় জোট মতাদর্শগত দিক থেকে পরস্পরবিরোধী হলে ঠোকাঠুকিতে ভাঙন শুরু হয়ে যায়। এদেশে উদাহরণ কম নয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, আওয়ামী লীগ তো হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে গভীর গাঁটছড়া বেঁধে রেখেছে। সেটা কৌশলী আঁতাত; রাজনৈতিক জোট নয়। অবস্থাদৃষ্টে আওয়ামী লীগও ইসলামপন্থিদের জন্য টোপ ফেলতে পারে। ক্ষমতাসীন থাকার কারণে তাদের পক্ষে কাজটা মোটেই কঠিন নয়।

একটি বিষয় কেন জানি এরা ভেবে দেখেন না যে, খণ্ড খণ্ড ছোটখাটো ইসলামী দলগুলোর ভোট টানার ক্ষমতা কতটুকু? এ হিসাব বিএনপিও কোনোদিন যথাযথভাবে করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে রেখেছে ওদের সংঘাতমূলক শক্তির জন্য; ওদের ঐক্য ও সংহতির জন্য। আমার মতে, এটা তাদের জন্য আত্মঘাতী পদক্ষেপ। যাই হোক, এ প্রচেষ্টা কতটা ফলপ্রসূ হবে, কতটা পরস্পরবিরোধী না হয়ে পরস্পরনির্ভর হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে দলগুলোর জোট বাঁধার ক্ষেত্রে নিঃস্বার্থ আন্তরিকতার ওপর, যা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্লভই বলা চলে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস তেমন একাধিক উদাহরণ ধরে রেখেছে অতীতে। তাই শেষ কথাটা হলো, 'সব দলকে পাশে চাওয়া' আর বাস্তবে কাছে পাওয়া- এ দুটি ঘটনার মধ্যে ব্যাটে-বলে অনেক ফারাক। সময় বলে দেবে এ আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টার অবশেষ পরিণতি।

ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক