আবরার হত্যার রাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব

সমাজ

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. মোহীত উল আলম

সম্প্রতি সাবেক হওয়া যুবলীগ নেতা সম্রাট ধরা পড়ার উত্তেজনা শেষ হতে না-হতেই বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে তার নিজেরই ছাত্রাবাসে পিটিয়ে হত্যা করার ভয়ানক ঘটনাটা ঘটে গেল। কুষ্টিয়ার বাড়িতে আবরারের মায়ের কান্নার ভিডিও ভাইরাল হয়ে পুরো জাতিকে কাঁদাচ্ছে। বুয়েটের সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২০ জনের বেশি বুয়েট ছাত্রকে আবরার হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বের গুণাবলি  দিয়ে দেশকে একটি অগ্রবর্তী সমাজে পরিণত করার চেষ্টায় ব্যাপৃত। সেখানে আবরারের মৃত্যু যেন অশনিসংকেত।

শরীরের রোগ হয় দুটো। একটা হচ্ছে সর্দি, যেটা দেখা যায়, রুমাল দিয়ে ঘনঘন নাক মুছতে হয়। কিন্তু সর্দিটা লক্ষণ, আসলে সর্দি যে কারণে হয়, সেটা দেখা যায় না, কিন্তু সেটার চিকিৎসা না করলে সর্দি সারে না। সেজন্য কী কারণে আবরার হত্যাকারীরা বুয়েট প্রশাসনের প্রায় নাকের ডগায় ত্রাসের রাজত্ব বিস্তার করতে পারল- এ কারণটা চিহ্নিত করে সেটি দূর করাটাই হচ্ছে সমস্যার সমাধান।

দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ বুয়েটে যখন ভিন্নমত পোষণ ও সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি চুক্তি হওয়া বাংলাদেশ-ভারতের কিছু বিষয়কে সমালোচনা করে আবরার তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিল, সেটি দেখে বুয়েট ছাত্রলীগের (এখন তারা বহিস্কৃত) নেতৃত্ব তাকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয়, যেটি টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত (ডেইলি স্টার, ৮ অক্টোবর) এবং সেখানে প্রথমে জেরা, তথ্য অনুসন্ধান ও তারপরে ব্যাপক মারধর করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। আবরারকে মারধরের প্রত্যক্ষ ভিডিও ফুটেজটি হয়তো পাওয়া সম্ভব হবে না, কিন্তু এর মধ্যে বরগুনার রিফাত শরীফ বা তারও আগে শিশু ছিনতাইকারী হিসেবে চিহ্নিত করে এক শিশু-স্কুলের সামনে একজন প্রতিবন্ধী নারীকে জনতা পিটিয়ে মারার দৃশ্য আমরা দেখেছি। কয়েকজন মিলে একজনকে মারার দৃশ্যের একটি পরিচিত প্যাটার্ন আছে। প্রথমে একজন মারবে কি মারবে না এভাবে এগিয়ে যায়। কিন্তু একবার একজন মারতে শুরু করলে তখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেটি উপস্থিত অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং তারাও পেটানোতে অংশগ্রহণ করে। এটি মব সাইকোলোজি বা জন-মনস্তত্ত্ব এবং এ মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্নটি যুবাদের বয়সের ধর্মের কারণে খড়ের গাদায় আগুন লাগার মতো কাজ করে। আবার অপরাধকাণ্ডের একটি নিজস্ব চরিত্র আছে। দূর থেকে অপরাধকে অপরাধ মনে হয়, কিন্তু অপরাধের গণ্ডির মধ্যে একবার ঢুকে গেলে তখন অপরাধ অপরাধীর মনে নিজস্ব একটি যুক্তিবোধ তৈরি করে, যার ফলে অপরাধকে অপরাধীর কাছে আর অপরাধ মনে হয় না। তখন যে লোকটাকে তারা মারতে থাকে, তাকে তাদের কাছে আর মানুষ মনে হয় না, এবং তখন নৃশংসতার নিষ্ঠুরতম উদাহরণ তৈরি হয়। জন-মনস্তত্ত্বের সঙ্গে অপরাধবোধের আপাত স্বাধীনতাবোধ মিশ্রিত হলেই রিফাত শরীফ, ফেনীর রাফি বা বুয়েটের আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা সংঘটিত হয়।

তার পরও আবরারকে হত্যার ঘটনাটা ব্যতিক্রম। কারণ কেবল মেধার দিক থেকে দেশের শীর্ষ ফলাফলকারীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। আবরার স্কুল ও কলেজজীবনে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে দু'বারই গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে। ধরে নিচ্ছি, তাকে যারা মেরেছে তারাও ফলাফলের দিক থেকে ওই কাছাকাছি ফলাফল নিয়েই বুয়েটে অধ্যয়ন করছিল। কিন্তু তারা রাজনীতির নামে নিজেদেরকে বিপথে পরিচালিত করছিল, একজন সহপাঠীকে মেরে ফেলার মতো গুরুতর অপরাধটি করে ফেলল। শুধু আবরারের বাবা-মা নয়, যারা শোকাতুর; এই হত্যাকারী যুবকদের মা-বাবাও তো একই কারণে শঙ্কিত হয়ে উঠবেন এই ভেবে যে, তাদের এত মেধাবী ছেলেটি নরহত্যার মতো পাপ কী করে করল! আবরারের বাবা-মা যেমন আর কোনোদিন তাদের ছেলেকে প্রকৌশলী হিসেবে দেখবেন না, এক অর্থে এই হত্যাকারীদের মা-বাবারাও তাদের ছেলেদের হয়তো আর প্রকৌশলী হিসেবে দেখবেন না। হয়তো ছেলেদের চরম শাস্তি পেতে দেখবেন তারা।

সর্দি রোগের কারণটা ঠিক এই জায়গাতেই। সব দলীয় রাজনীতির একটি আদর্শ থাকে, যেটি ব্যানারে লেখা যায়, বক্তৃতায় বলা যায়, সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রচার করা যায়, কিন্তু রাজনীতির আদর্শের চর্চার বাস্তব ক্ষেত্রটা একেবারেই অন্যরকম। কারণ সব রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কটা বাম চোখের সঙ্গে ডান চোখের সম্পর্কের মতো। আদর্শ বায়বীয় একটি চেতনার মতো হলেও ক্ষমতা হচ্ছে প্রধানত অর্থনীতি-সংশ্নিষ্ট নিরেট বাস্তব। মধ্যযুগের সামন্তপ্রথার ভাষায় বললে ক্ষমতা হচ্ছে নিরেট রাজমুকুট, সিংহাসন এবং রাজদণ্ডের মতো বস্তুবাদী একটা ব্যাপার। এই প্রতিটি বস্তুর ওপর অধিকার সে যুগে রাজার ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করত। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ এবং উত্তরাধুনিক যুগে ক্ষমতার সঙ্গে অর্থনীতির এ নেটওয়ার্কিংটা জটিল ও খানিকটা আন্তঃসাংঘর্ষিক। কারণ ক্ষমতা বজায় রাখা হয় প্রধানত একটি অনুসারী বা সমর্থক দল তৈরি করার মাধ্যমে। আদর্শের প্রকৃত অনুসারীরা এ জায়গাটাতে মার খায়। বরঞ্চ ফেইক, নতুন গজিয়ে ওঠা, আদর্শবদলকারী, ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী, দলবদলকারী এবং সুযোগসন্ধানীরা এই আপাত আকর্ষণীয় কিন্তু বস্তুত ফেইক সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করে, যারা আদর্শে দুর্বল, কিন্তু পেশিবহুল, দুর্বৃত্তপরায়ণ ও সম্পদলোভী। এরাই দেখা যায় মাঠ দখল করে রাখতে ওস্তাদ। আবার মাঠ যার দখলে, ক্ষমতাও তার দখলে, এরকম একটি অযাচাইকৃত প্রতীতি থেকে অনেক সময় শাসক দল ভোগে। সেজন্য একটি রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন ম্যাকিয়াভেল্লি কথিত রাজনৈতিক দ্বি-চারিতা হয়ে ওঠে সে দলের রাজনৈতিক আচরণের প্রথম বৈশিষ্ট্য। আদর্শের কথা বলা হবে, গণতন্ত্রের কথা বলা হবে, কিন্তু কার্যত লক্ষ্য রাখতে হবে মাঠটা দখলে আছে কি-না। মাঠ দখলে রাখার এ বাস্তব প্রয়োজনটা তৈরি করে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত উপসর্গের, যেটির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের যারা থিঙ্কট্যাঙ্ক বা নিউক্লিয়াস বা মূল নেতৃত্ব তাদের সঙ্গে এদের সম্পর্কটা হয় লাভ-হেইট সম্পর্ক। এইটিই আন্তঃসাংঘর্ষিক প্রেক্ষাপট। সুশীল, আদর্শবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিউক্লিয়াস এই অশুভ উপসর্গের উত্থান হোক, তা একেবারেই চায় না। কিন্তু ভয় থাকে এই অনিষ্ট উপসর্গগুলোকে যদি পালা না হয়, তাহলে মাঠ দখলে থাকবে কী করে! উপসর্গগুলোকে ফেলাও যায় না, গেলাও যায় না। এ কারণেই হাট ডাকা, টোল ডাকা, নির্মাণ কাজের তদারকি নেওয়া বা বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজির শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করা, কিংবা ক্যাসিনোবাজির মতো অতি সফিস্টিকেটেড জুয়ার আসর বসানোর সংস্কৃতি তৈরি হয়, ক্ষমতার উৎসে লুকিয়ে থাকা এই ভয়টা থেকে যে, এই আশকারাগুলো না দিলে মাঠ দখল করে রাখবে  কারা! ক্ষমতাসীন দলের এই মনোভাবটা বুঝে  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণও থাকে নমনীয় ও ক্ষেত্রবিশেষে ভাগীদার হিসেবে। এবং আন্তঃসংঘর্ষটা এ জায়গায়ও ঘটে।

ওপরের ব্যাখ্যাটির মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ছাত্র রাজনীতির চরিত্রটাও বোঝা যায় আশা করি। বর্তমান সরকারের সফল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতির নামে কিছু নেতৃত্ব তৈরি হয়, যারা নানাভাবে এই উন্নয়নমূলক কাজে অন্যায়ভাবে অংশগ্রহণ করতে চায় এবং প্রকারান্তরে উন্নয়ন কাজের বিঘ্ন ঘটায়, এবং প্রকারান্তরে সরকারের সদিচ্ছার যবনিকা টানে। কিন্তু এসব অবৈধ কাজ করতে তারা অবলীলাক্রমে দলীয় আদর্শের বুলি কপচায়। এটিও আন্তঃসাংঘর্ষিক প্যাটার্নের একটি উদাহরণ। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে আমি একমত যে, এতদসত্ত্বেও বুয়েটের ঘটনাটি একেবারেই ব্যতিক্রম। কারণ এখানে শুধু ভিন্নমত পোষণ করার কারণে একটি অত্যন্ত মেধাবী ছেলের প্রাণ চলে গেল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতু ও সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শুধু ভিন্নমতের জন্য কাউকে মেরে ফেলতে হবে, এটা ঠিক নয়।

আবরারের গণমাধ্যমে আসা ঘটনাটার বিশ্নেষণ করে আমি যেটা বুঝতে পারি, সেটা হলো তারা আবরারকে টার্গেট করেছিল তার ভিন্নমত পোষণ বা শিবির করার সন্দেহ থেকে বা ফেসবুকে তার দেওয়া শেষ স্ট্যাটাসটির কারণে, তা নয়। কারণ সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন লোকের সাক্ষাৎকার থেকে বুঝতে পারি, আবরারের রাজনৈতিক ধারণা নিয়ে সরকারি ছাত্র সংগঠনটির নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট ছিল বা উপদ্রুত ছিল তা মনে হয় না, তবুও তাকে মারা হলো এ জন্য যে, এই বুয়েট নেতৃত্বটি তাদের উচ্চবর্গের নেতৃত্বের কাছে জানান দিতে চেয়েছিল যে, তারা সরকারি দলের সমর্থনে এমন একটা কিছু করবে, যাতে তাদের প্রতি নেতৃত্বের গুণমুগ্ধতা বেড়ে যায়। যুবা মনস্তত্ত্বের কাছে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশংসা আদায় করাও রাজনৈতিক আচরণের প্রটোকলে একটি স্বীকৃত অনুষঙ্গ এবং আবরারের শেষ স্ট্যাটাসটি সম্ভবত তাদের সে সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাদের গ্রুপ ভাষাটাকে যদি আমি অনুমান করতে পারি, সেটা হবে এরকম : 'হ্যাঁ, আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী এরকম একটা ভালো চুক্তি করে এসেছে, আর তুই সেটার সমালোচনা করিস, ব্যাটা, তোর এত সাহস!' কিন্তু এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যে নিতান্তই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী এবং এর ফলে যে গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক চর্চা চলে, সেটা তারা খেয়াল করতে পারে না।

যারা অন্যায় করে, অপরাধ করে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জোগানোর চিন্তা করে তারা বোকাদের জন্য নির্ধারিত স্বর্গেরও নিচে বাস করে। প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, দল যখন বিপদে পড়ে, নেতৃত্ব যখন সংকটে নিপতিত হয়, তখন এরাই সর্বাগ্রে উধাও হয়, ভোল পাল্টে ফেলে, যেটি প্রকৃত আদর্শ অনুসারীরা কখনও করে না।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক