সন্ত্রাস ও ছাত্র রাজনীতির দুই ধারা

শিক্ষাঙ্গন

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আনু মুহাম্মদ

আবরার হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক কিছু এখন বাংলাদেশের মানুষ জানেন। তবে এর কিছুই জানা হতো না, আবরারের লাশও হয়তো পাওয়া যেত না; যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ তৈরি না করতেন। যদি শিক্ষার্থীদের ঐক্য ও আন্দোলন না থাকত, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যতটুকু দাবি মেনেছে, তাও হতো না। আরও যে নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্বর নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তাও এই প্রতিরোধ ও সমাজের জখম জনমতের চাপের কারণে।

আবরারের অপরাধ ছিল জাতীয় কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা, যা একজন সচেতন তরুণের করার কথা। আবরার কোনো কটূক্তি করেননি, প্রধানমন্ত্রী নিয়ে কোনো কথা বলেননি। শুধু যুক্তি-তথ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তিতে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কারও ভিন্নমত থাকলে বা তথ্য-যুক্তিতে ভুল থাকলে তিনি এর জবাবে ১০টা স্ট্যাটাস দিতে পারতেন। না, খুনিদের হাত নিশপিশ করে। কারণ তাদের কাজই হলো লাঠিয়াল হিসেবে হুমহাম করা, পেশি দেখানো। জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে লাঠিয়াল বাহিনী লাগে, সে উর্দিপরা হোক বা না হোক। তাদের কাজই ভিন্নমতের মানুষদের পিটিয়ে তাকে ও অন্যদের শিক্ষা দেওয়া, প্রভুকে সন্তুষ্ট করা। মারতে মারতে কিংবা চাপাতি দিয়ে মেরে ফেলা; তাই তাদের জন্য একই সঙ্গে খেলা ও দায়িত্ব। ক্রসফায়ারও তাই। এটাই চলছে  রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তার  অন্যতম চর্চাকেন্দ্র। বুয়েটের আবরার এই তাণ্ডবেরই সর্বশেষ শিকার।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানের সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের তাণ্ডব গত কয়েক বছরের নিয়মিত ঘটনা। ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান ও গভর্নর মোনায়েম খান সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ) তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে ক্রমবর্ধমান গণপ্রতিরোধকে বাধা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল। এরা প্রতিবাদের সব তৎপরতা নিশ্চিহ্ন করার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ত্রাস ছড়াত, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকারীদের হামলা করত, এমনকি শিক্ষকদেরও রেহাই দিত না। ইতিহাস পর্যালোচনায় পরিস্কার দেখা যায় যে, ছাত্র সংগঠনের সহিংস আচরণ বা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্র-সমর্থিত সহিংসতা পাকিস্তানের এই সামরিক শাসনের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। দুঃখজনকভাবে এই প্রবণতা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও থেমে যায়নি, বরং প্রত্যেক সরকারের আমলে আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। কাজেই শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির সন্ত্রাস প্রকৃতপক্ষে সব ছাত্র সংগঠনের বৈশিষ্ট্য নয়, তা প্রধানত 'শাসক দলের ছাত্র সংগঠন' প্রবণতা। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ছাত্র রাজনীতির সমস্যা নয়, এটি সরকারি ছাত্র সংগঠনের রোগ ও ভোগের প্রকাশ। ঘটনাক্রম দেখলে এটি স্পষ্ট হয় যে, সরকারি ছাত্র সংগঠন সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পেশিশক্তি হিসেবেই কাজ করে।

আশির দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালে তারা ১০ দফা দাবি প্রণয়ন করেন। এর প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিল যারা, তারাই এর পুরো বিপরীত যাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছে ৯০-পরবর্তী সরকারি ক্ষমতায় গিয়ে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কৌশলপত্র, এডিবির উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পসহ নানা ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়ন এ দেশের শিক্ষা বণিকদের জন্য শিক্ষা খাত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ে উইকএন্ড, ইভনিং নামে বাণিজ্যিক তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রেও বাণিজ্য ও শিক্ষার ধস একই সঙ্গে বাড়ছে।

অন্যদিকে একই সময়ে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়েছে। ১৯৯১ থেকে কোথাও আর কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সরকারি ছাত্র সংগঠনের একাধিপত্য হলে হলে শিক্ষার্থীদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারি দল ও সরকারি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে ভিন্নমত প্রকাশের পথে বিঘ্ন সৃষ্টির নানা পথ নিয়েছে, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশে বাধা প্রদান এমনকি সুন্দরবন নিয়ে কথা বললে আক্রমণের হুমকি, হলে হলে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে সরকারি  মিছিল-সমাবেশে অংশ নেওয়ানো এরই অংশ। প্রশ্ন ফাঁস, ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্য বিস্তারের সঙ্গে এই সন্ত্রাসী আবহাওয়া প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খবরের কাগজে প্রকাশিত অসংখ্য প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কীভাবে ভূমি ও দোকান দখল, দরপত্র ছিনতাই, আর বিরোধিতাকারীদের দমন করতে ভাড়াটে মাস্তান হিসেবে সরকারি ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা কাজ করছে। কীভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেতন বাড়ানো বা শিক্ষাবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের দমন করার জন্য এই সংগঠনকে ব্যবহার করছে। এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দমন করতে মিথ্যা মামলা দিয়েছে প্রশাসন, ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীদের ওপর- এ রকম উদাহরণ অনেক। এসবের বিনিময়ে শাসক সংগঠনের নেতাকর্মীরা যা চায় তা-ই করার বিশেষ অধিকার অর্জন করে। এসবের মধ্যে ছিনতাই, যৌন হয়রানির পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা আদায় সবই অন্তর্ভুক্ত। ১ বৈশাখে নববর্ষের উৎসবে যৌন হয়রানির সিসিটিভি ছবি থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা ধামাচাপা দেওয়ায় প্রমাণিত হয় যে, এতে তাদের ক্ষমতাপুষ্ট লোকজনই জড়িত ছিল। খুন, চাপাতিসহ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ত্রাস সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা বহুবার খবর হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বজিৎ হত্যার ভিডিও থাকায় সরকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর দায়িত্ব সরকার অস্বীকার করতে পারেনি, প্রবল জনমতের কারণে বিচারও হয়েছে। কিন্তু প্রধান আসামিরা সফলভাবে পলাতক থেকেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুবায়ের হত্যার ক্ষেত্রেও ঘটনা একই। অর্থ-সম্পদ ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজ সংগঠনেই বহু খুনোখুনিতে ছাত্রলীগের কর্মীরাও অনেকে হতাহত হয়েছেন, এসব নিয়েও অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছে।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ওপরও সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনীর নানা নিপীড়নের ঘটনা প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এ রকম ঘটনা ঘটছে। এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে দু'জন শিক্ষক ছাত্রলীগ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন-রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কর্তৃক হুমকি, হয়রানি, ত্রাসের শিকার হয়েছেন। এখনও তাদের ভোগান্তি শেষ হয়নি। তাদের অপরাধ ছিল, তারা শিক্ষক ও নাগরিক হিসেবে দেশে অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে এক-দুই লাইন লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু এ ধরনের প্রতিবাদ না করেও যে হয়রানি-হামলা থেকে রক্ষা নেই, তার দৃষ্টান্ত বহু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই অবসরপ্রাপ্ত একজন শিক্ষক এ রকম কোনো প্রতিবাদও করেননি। একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা নিয়ে শুধু লেখাপড়া ও ক্লাসরুম শিক্ষকতাতেই লেগে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু তারপরও পরীক্ষা, ক্লাসের নিয়মকানুন রক্ষা করার অপরাধে তাকে শুধু অকথ্য অপমান নয়,  আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করতে চেয়েছে মন্ত্রী সমর্থিত ছাত্রলীগের লোকজন।



হাতুড়ি বাহিনী, হেলমেট বাহিনী, চাপাতি বাহিনী হিসেবে সরকারি ছাত্র সংগঠন যা যা করে রেকর্ড তৈরি করছে, তার সবই ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদ নিয়েই। শিক্ষকদের মধ্যে মেরুদণ্ডহীন-তোষামোদকারী-লোভী ব্যক্তিদের সংখ্যা বৃদ্ধি না পেলে পরিস্থিতি এ রকম ভয়াবহ হতে পারত না। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব উপাচার্য এবং প্রক্টরই শিক্ষক। কিন্তু তাদের অনেকের মধ্যেই শিক্ষকের চেয়ে পুলিশ বা আমলা বা সরকারদলীয় ক্যাডার হওয়ার প্রবণতাই বেশি। সন্ত্রাস দমনে তাদের আগ্রহ নেই। কেননা সন্ত্রাসীদের তারা নিজেদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে চান। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তো সরকারি দলের কমিটিতেই আছেন।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চা থেকে এখন অনেক দূরে। শাসক ছাত্র সংগঠন যার প্রতিনিধিত্ব করে তা আসলে একধরনের জমিদারি ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে। এসব প্রতিষ্ঠানে তাই ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুস্থ বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি এখনও একটি স্বপ্ন আর অব্যাহত লড়াইয়ের বিষয়। তারপরও অনেক প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রত্যেক সরকারের সময় শাসক ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রের বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ঠিকই সরব হয়েছে শিক্ষার্থীরা। 'সাধারণ ছাত্র ঐক্য', 'নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা', 'নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর', 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর', 'নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজ', 'বেতন-ফি বৃদ্ধিবিরোধী ছাত্রঐক্য', 'ভ্যাট নাই', 'ধর্ষণ প্রতিরোধ মঞ্চ', 'সুন্দরবনের জন্য আমরা', 'জাতীয় সম্পদ রক্ষা তরুণ সমাজ', 'ছাত্র সংসদের দাবিতে ছাত্রসমাজ', 'নিপীড়নের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী' ইত্যাদি ব্যানারের অধীনে নতুন নতুন মঞ্চ দেখা গেছে গত কয়েক বছরে। যদিও এসব নতুন মঞ্চের কোনো স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো নেই; তবুও শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশকে তাদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা প্রমাণিত।

অন্যায় নিপীড়ন বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে কোনো প্রতিবাদী ধারাই ক্ষমতাবানদের কাছে বাম হিসেবে নিন্দিত, তা কেউ কোনো সংগঠনে থাকুক বা না থাকুক। 'বাম'দের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের এই ক্রোধ কেন? কারণ এরাই ছাত্র রাজনীতিকে সরকারি রাহু থেকে মুক্ত করতে চায়; বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, নিয়োগে অনিয়ম, বেতন-ফির অযৌক্তিক বৃদ্ধি ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করে, নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কথা বলে, সন্ত্রাস, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়; এরাই দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; এরাই সীমান্ত হত্যা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; এরাই সুন্দরবন রক্ষার পক্ষে লড়াই করে; প্যালেস্টাইনসহ দেশে দেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়।

'ছাত্র রাজনীতি' আর সন্ত্রাস তাই এক কথা নয়। ছাত্র রাজনীতির আসলে দুটি প্রধান ধারা :একটি ধারা ক্ষমতাসীন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর রাজনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের কাছাকাছি থাকে, আর অন্যটি তাদের বদলানোর জন্য লড়াই করে। প্রথম ধারাটি শাসক ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে উলঙ্গভাবে প্রকাশিত, যা ক্ষমতাসীন দলকে প্রতিনিধিত্ব করে, আর দখলকারী, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাড়াটে সৈনিকের মতো ভূমিকা পালন করে। এই ধারা তরুণদের শক্তির অবক্ষয়ের দিকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয় ধারাটি দৃঢ়ভাবে সংগঠিত নয়, রাষ্ট্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধ পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে, সে কারণে আর পুলিশসহ  ক্ষমতার নানা খুঁটির বৈরী আচরণ পায়। কিন্তু এই দ্বিতীয় ধারাটিই সমাজের নতুন জন্মের শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।

বাংলাদেশে মন্ত্রী, এমপি, সরকারি দলের নেতা, বিভিন্ন লাঠিয়াল বাহিনীর দুর্নীতি-লুট-জুলুমের সমাধান হিসেবে যদি কেউ বলেন, বাংলাদেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিতে হবে, তাহলে এর সঙ্গে একমত হওয়ার মতো অনেক লোক এ দেশে পাওয়া যাবে। কারণ তাদের কাছে রাজনীতি মানে আজ বা গতকালের ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সন্ত্রাস, লুট, জুলুম। কিন্তু একই কথা যখন 'বিদ্বান' লোকজন বলেন, তখন সত্যিই অবাক হতে হয়। সহজ প্রশ্ন :এসব দুর্বৃত্ত ক্ষমতা বহাল রেখে দেশের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে কী হবে? সব অপরাধ আরও বেপরোয়া হবে; কিন্তু বিরোধিতা করার কেউ থাকবে না। ঠিক একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে সন্ত্রাস, হল দখল, দুর্নীতি ইত্যাদির পৃষ্ঠপোষক শক্তিগুলো অটুট রেখে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ- এসবের বিরুদ্ধে কথা বলার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা আজ সন্ত্রাসবিরোধী যে আন্দোলন করছেন, প্রশাসন মেরামত করার যে দাবিগুলো তুলছেন, সে রকম আন্দোলন করার পথ বন্ধ করা, জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনে সরকারের ভূমিকার সমালোচনার পথ বন্ধ করা, আবরার যে রকম স্ট্যাটাস দিয়ে দেশের পক্ষে তার মত প্রকাশ করেছিলেন, তার পথ বন্ধ করতে ক্ষমতাবানদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া। প্রয়োজন ভীতি, সন্ত্রাস, জোরজবরদস্তি থেকে শিক্ষাঙ্গন মুক্ত করে সবার মতপ্রকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সংগঠনের অধিকার সম্প্রসারণ।

অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়