প্রধানমন্ত্রী বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছেন

দুর্নীতি

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. মইনুল ইসলাম

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার মাধ্যমে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও পুঁজি লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত 'নিজের ঘর' থেকে 'দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স'-এর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। প্রথমে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পর দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার নামিদামি ফুটবল ক্লাবগুলোতে বেআইনিভাবে চালু হওয়া এবং পুলিশের নাকের ডগায় রমরমা ব্যবসা চালানো অনেক ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে র‌্যাবের ক্র্যাকডাউন ও ক্যাসিনো পরিচালনাকারী আওয়ামী যুব লীগের নেতার আসনে গেড়ে বসা 'গডফাদারদের' গ্রেফতার ও কোটি কোটি টাকা মূল্যের জুয়ার সরঞ্জাম উদ্ঘাটন দেশে-বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে কয়েকজনের কাছ থেকে কয়েকশ' কোটি টাকার এফডিআর ও বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা পাওয়ার পর এই গডফাদাররা প্রকৃতপক্ষে কত শত বা হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছে এবং কীভাবে, তা নিয়ে সবার মধ্যে প্রচণ্ড কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের ভাষ্য অনুযায়ী, এই গডফাদারদের সিংহভাগই বিএনপি ও ফ্রিডম পার্টি থেকে যুবলীগে ঢুকে পড়ে গত দশ বছরে প্রতাপশালী নেতা বনে গেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই ক্র্যাকডাউনকে শেখ হাসিনার নির্দেশে শুরু হওয়া 'শুদ্ধি অভিযান' অভিহিত করে দাবি করেছেন, এই অভিযান আরও সম্প্রসারিত ও জোরদার করা হবে। গত ২ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থ যে 'উইপোকারা' খেয়ে ফেলছে, ওদেরকে দমন করতে হবে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই এখন নাকি গোয়েন্দাদের স্ক্যানারে রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে অদূর ভবিষ্যতে ক্র্যাকডাউন পরিচালিত হবে। দেরিতে হলেও এই শুদ্ধি অভিযান শুরু করার জন্য শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন, তার প্রতি রইল শুভকামনা। বাংলাদেশের উন্নয়নের পথের 'এক নম্বর বাধা' দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন। এবার যদি এই দুটি জাতীয় মহাদুর্দশার বিরুদ্ধে তার নেতৃত্বে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ সত্যি সত্যিই শুরু হয়, তাহলে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করবেন।

বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯৬-২০০৮ পর্যায়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোট পরপর দু'বার নির্বাচনে জয়ী হতে পারেনি দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের তাণ্ডব থেকে দলের বা জোটের নেতাকর্মীরা মুক্ত থাকতে না পারার কারণে। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের তিনটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনেই জনগণ সদ্য সাবেক সরকারে আসীন দল বা জোটকে প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জনগণের প্রত্যাখ্যানের কারণে ক্ষমতা হারানোর এই 'অনিবার্য ধারাবাহিকতার' ভয়ে হয়তো সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে বিদায় করেছে। অভিযোগ উঠেছিল, ২০০৯-১৪ মেয়াদের মহাজোট সরকারও দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের পুরনো পথেই শাসনকার্য চালিয়েছিল। সে জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা সত্ত্বেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত জোট বয়কট না করলে ওই নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন মহাজোটকে আবারও পরাজিত করতে সক্ষম হতো বলে ওয়াকিবহাল মহলে দৃঢ়মূল ধারণা ছিল। খালেদা জিয়ার 'পণ্ডিতপ্রবর পুত্রের' ডিকটেশনে এবং সন্ত্রাস ও খুনোখুনির মাধ্যমে সামরিক শাসন আনতে পারবে বলে জামায়াত-শিবিরের অগাধ বিশ্বাসের কারণে ভুল চাল দিয়ে তারা ওই সুযোগ হারিয়েছে। কিন্তু ২০১৪-১৮ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনায় সাফল্যের কারণে শেখ হাসিনার ওপর জনগণের আস্থা ক্রমেই বেড়েছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনী প্রচারের পর্যায়ে বোঝা যাচ্ছিল, জনগণ শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতির এই সাফল্যের ধারা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি সম্পর্কে জনগণের মনে বিতৃষ্ণা জোরদার হতে থাকায় তাদের জনপ্রিয়তায়ও ভাটার টান শুরু হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং চাণক্যপ্রবর 'থিঙ্কট্যাঙ্ক' জনগণের এই নাড়িস্পন্দন ধরতে না পারায় আওয়ামী লীগ ও মহাজোট যে পথেই এগিয়ে যায়, এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। ফলে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এই গোল্ডেন চান্সটা হারিয়ে ফেলেছে।



গত নয় মাসে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপই সৃষ্টি করতে পারেনি। উপরন্তু অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো এখন আরও বেশি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশে পৌঁছে গেছে, যেটা এশিয়ায় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার। সাফল্যের এই শিখরে পৌঁছার পর এবং বিরোধী জোটের কোনো রাজনৈতিক চাপ না থাকা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা যে নিজের ঘর থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে শুদ্ধি অভিযানটা শুরু করলেন, সেটা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। বিশেষত, শুদ্ধি অভিযানে শেখ হাসিনার সাফল্যের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি এ জন্য যে, তিনি হয়তো এই অভিযানের মাধ্যমে তার জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংগ্রামে ঝাঁপ দিয়েছেন। এ দেশে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনকে রুখে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখানো যেন বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়া, শুদ্ধি অভিযানের কারণে শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি লুটেরাদের টার্গেটে পরিণত হতে পারেন!

স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকারেও ১৯৭৩ সাল থেকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও আমলারা সক্রিয় হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বেশ কয়েকবার তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য প্রকাশ্যেই বঙ্গবন্ধুকে অভিযোগ জানিয়েছিলেন; কিন্তু কোনো ফায়দা হয়নি। দুর্দিনের সঙ্গীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে না পেরে দুর্নীতিকে মেনে নেওয়ার এই ভুল বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে সমালোচকরা বাঁকা কথা বলার সুযোগ পায়। আরও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এ দেশে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের সুযোগ করে দিয়েছেন তাদের অবৈধ শাসনকে স্থায়ী করার প্রয়োজনে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানি কায়দার সামরিক বাহিনী ও সিভিল আমলাতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত নব্য ঔপনিবেশিক, আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজি লুণ্ঠনমূলক সরকার ব্যবস্থা। সুযোগ-শিকারি ডানপন্থি ও বামপন্থি নেতা-পাতিনেতা-কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সিভিল আমলা, পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদের কেনাবেচার রাজনীতির মাধ্যমে জড়ো করে ক্যান্টনমেন্টে বসেই জিয়াউর রহমান গড়ে তুলেছিলেন তার তল্পিবাহক রাজনৈতিক দল বিএনপি। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তিনি নিজে দুর্নীতি না করলেও তার আমলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন ক্রমেই বেড়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে তার আমল নিয়ে দুটি গবেষণা-গ্রন্থের দু'জন লেখকের কাছে তিনি খোলামেলা স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত বই 'পেট্রন-ক্লায়েন্ট পলিটিক্স এন্ড বিজনেস ইন বাংলাদেশ'-এর লেখক কোসানেকের কাছে প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে জিয়া বলেছিলেন, 'তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উন্নয়নের প্রাথমিক স্তরে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি অপরিহার্য বাস্তবতা।'

১৯৫৭ সালে প্রকাশিত পল বারানের বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ 'পলিটিক্যাল ইকোনমি অব গ্রোথ'-এ মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া (বা মুৎসুদ্দি পুঁজি) ও মুৎসুদ্দি সরকার ধারণাগুলো সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বারান 'মুৎসুদ্দি পুঁজি' কনসেপ্টটির সংজ্ঞা দিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর নব্য ঔপনিবেশিক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রচণ্ড শক্তিধর বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে তৃতীয় বিশ্বের পুঁজিপতিদের এজেন্টের ভূমিকা পালনকে ফোকাস করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইন্ডেন্টর, আমদানিকারক, সোল এজেন্ট, পরিবেশক, অ্যাসেমব্লি প্ল্যান্ট স্থাপনকারী শিল্পপতি, ফ্র্যান্সাইজি কিংবা সেলস এজেন্টের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে যেসব বাণিজ্যনির্ভর পুঁজিপতি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে মুনাফা আহরণ করে, তাদেরকেই পল বারান 'মুৎসুদ্দি পুঁজি' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় 'মুৎসুদ্দি সরকার' বলা হয়েছে ওইসব রাষ্ট্রের সরকারকে, যেগুলো উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর ও তাদের তল্পিবাহক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ডিকটেশন মেনে চলে। সামরিক একনায়ক জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকারের শাসনামলে দু'জনেরই মার্কিন বশংবদতার কারণে এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপর তখনকার বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বব্যাপ্ত নির্ভরতাহেতু তাদের নেতৃত্বাধীন সরকারকে 'মুৎসুদ্দি সরকার' আখ্যায়িত করা যায়। ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশে যে পুঁজিপতি গোষ্ঠীর বিকাশ হয়েছে তাদের চারিত্র্য বর্ণনার জন্য 'মুৎসুদ্দি পুঁজি' কনসেপ্টটি খুবই জুতসই। ১৯৭৫ সাল থেকে বর্ধিত বৈদেশিক অনুদান ও ঋণ থেকে মার্জিন আহরণ এবং আমদানি বাণিজ্যে বহুল প্রচলিত নানা পদ্ধতিতে এ দেশে পুঁজি লুণ্ঠন ও দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছিল, যে প্রক্রিয়াগুলো স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হওয়ার পর গত ২৮ বছর একই প্রক্রিয়াগুলো চালু রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বা জোটগুলোর নেতাকর্মীরা সরকারি প্রকল্পগুলো থেকে বেধড়ক্‌ পুঁজি লুণ্ঠন করেছে। দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় এই ৪৪ বছর ধরে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিও বেড়ে পর্বতপ্রমাণ হয়ে উঠেছে। এই সরকার ব্যবস্থাকেই উন্নয়ন ডিসকোর্সে 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' বা চৌর্যতন্ত্র কিংবা 'পুঁজি লুণ্ঠনমূলক সরকার' আখ্যায়িত করা হয়। দুঃখজনক হলো যে, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর দশ বছর অতিক্রান্ত হলেও শেখ হাসিনা এই দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা দেখাননি। ফলে তার দলের সব স্তরের নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশই লুটেরা পুঁজির ফায়দাভোগী হয়ে 'আঙুল ফুলে কলাগাছের' রূপ ধারণ করেছে। তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ জনমনে ভীতি-সঞ্চারকারী 'গডফাদারে' পরিণত হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এসব গডফাদার কখনোই আওয়ামী লীগের আদর্শিক রাজনীতির জন্য প্রাণপাত করবে না, বরং তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে খোদ শেখ হাসিনার জন্যই তারা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ভূমিকা পালনে দ্বিধা করবে না। তাই তাদের বিরুদ্ধে যদি শেখ হাসিনা সত্যি সত্যিই শুদ্ধি অভিযান জোরদার করেন, তাহলে হয়তো তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার দুঃসাহসই দেখাবেন। এই দুর্বৃত্তরা সহজে চলমান ক্র্যাকডাউনকে মেনে নেবে না। কিন্তু ওই ভয়ে শুদ্ধি অভিযান থামতে পারে না। এ দেশের কলঙ্কজনক দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের ইতিহাস বদলানোর গুরুদায়িত্ব শেখ হাসিনা অসীম সাহসে তার কাঁধে তুলে নিয়েছেন, জাতি তার সঙ্গে থাকবে।

শেখ হাসিনা ৭৩ বছরে পা রেখেছেন, আওয়ামী লীগের অন্যান্য বর্ষীয়ান নেতা-নেত্রীও বয়সের দিক থেকে ৭০ বা ৮০ বছরের ঘরে অবস্থান করছেন। তারা যদি এ দেশের জনগণের মনে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার আসন স্থায়ী করতে চান, তাহলে এই শুদ্ধি অভিযানকে বেগবান করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই হবে। শেখ হাসিনা যে সুযোগটি সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তা হারানো দুর্ভাগ্যজনক হবে। বর্ষীয়ান নেতা-নেত্রীদের প্রায় সবাইকে তিনি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ঢালাও পরিবর্তনকে সমর্থন করতে পারিনি। গত মন্ত্রিসভার মধ্যে যাদের ব্যাপারে জনগণের মধ্যে প্রশংসা, সুনাম ও শ্রদ্ধা পরিলক্ষিত হয়েছে, তাদের মন্ত্রিসভা থেকে খারিজ করে দেওয়া অসমীচীন হয়েছে, জাতির জন্যও তা ক্ষতিকর হয়েছে। প্রবীণদের জায়গায় নবীনরা মন্ত্রিসভায় স্থান করে নেবেন সেটা স্বাভাবিক; কিন্তু রদবদলটা হতে হবে ক্রমান্বয়ে। অন্যদিকে, বর্তমান মন্ত্রিসভায় যাদের ঠাঁই হয়েছে, তাদের কয়েকজনের অতীতের রেকর্ড মোটেও প্রশংসনীয় নয়। চলমান এই শুদ্ধি অভিযানকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে পরিণত করুন।

অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়