ভোক্তা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি নয়, কমানো যায়

বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম শামসুল আলম

আগামীতে যেসব দেশকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, বাংলাদেশ থাকবে সেসব দেশের শীর্ষে। তখন জ্বালানির ওপর স্বত্বাধিকার টিকিয়ে রাখা বা অর্জন করা ভোক্তার পক্ষে সহজ হবে না। ভোক্তার ভোগ ব্যয় হ্রাস পাবে। সরকার রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক প্রবৃদ্ধির গতি ও প্রকৃতি বজায় রাখা, উন্নত দেশগুলোর তালিকায় স্থান করে নেওয়া, বেকার সমস্যা সমাধান করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সফল হওয়া বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন হবে। তাই বিদ্যুৎ বা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। সে জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। জ্বালানি অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

২. বিদ্যুতের অভাব বা সংকট নয়; ১৫ অক্টোবর সমকালে 'উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গলার কাঁটা' শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিদ্যমান পরিপ্রক্ষিত পরিকল্পনা, পাঁচশালা পরিকল্পনা এবং মহাপরিকল্পনা উপেক্ষা করে অব্যাহত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন এখন জাতির গলার কাঁটা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দায়িত্বশীল সুনির্দিষ্ট কতিপয় ব্যক্তি কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ীকে অত্যধিক মুনাফা লাভের সুযোগ দেন এবং বিদ্যুৎকে জাতির গলার কাঁটায় পরিণত করেন। তারা মাদক কিংবা ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের মতো কি ভয়ানক অপরাধী নন? তারা কি দুর্নীতি সম্প্রসারণ করে এ খাতকে অপরাধ জগতে পরিণত করেননি? তারা কি এসব কৃতকর্মের জন্য অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন, নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে ব্যবসায়ীদের যেমন লাভবান করেছেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালনেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে ব্যবসায়ীদের তেমন লাভবান করার সুযোগ পাবেন এবং নিজে লাভবান হবেন, উৎপাদনের মতো সঞ্চালনেও বিদ্যুৎকে গলার কাঁটায় পরিণত করবেন? ভোক্তা তথা জনগণের এমন সব প্রশ্নের জবাব সময়েই দেবে। তবে যে বিদ্যুৎ পৃথিবীকে অন্ধকার থেকে আলোয় এনেছে, মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করেছে, সেই বিদ্যুৎ এখন দুর্নীতি সম্পৃক্ত।

৩. ২০১৫ সালে বিইআরসি পাইকারি বিদ্যুতের গড় মূল্যহার নির্ধারণ করে ৪.৯০ টাকা। জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় হ্রাস বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে যৌক্তিক সমন্বয় না করায় পাইকারি বিদ্যুতে ৩.৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধি দ্বারা সমন্বয় করেনি। ২০১৭ সালের আদেশে সে ঘাটতি সরকারি ভর্তুকি দ্বারা সমন্বয় করে। তবে বিতরণে ঘাটতি ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের মূল্যহার ০.৩৫ টাকা বৃদ্ধি দ্বারা সমন্বয় করে। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার ছিল ৫.৪৪ টাকা। তবে পাইকারি বিদ্যুতের গড় মূল্যহার ২০১৭ সালে ৪.৮৪ টাকা, ২০১৮ সালে ৪.৮০ টাকা এবং ২০১৯ সালে ৪.৭৭ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। বর্তমানে ইউনিট প্রতি ৫.৮৮ টাকা এবং এ বছর ঘাটতি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

৪. ২০১৭ সালে পাইকারি বিদ্যুতে ঘাটতি ছিল প্রায় ৩.৬ হাজার কোটি টাকা। ১ বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার কোটি টাকা (৫৩ শতাংশ)। ১ বছরের ব্যবধানে এমন বৃদ্ধি নজিরবিহীন এবং অবাস্তব। ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ অবধি গড়ে বছরে ১২ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা (মেগাওয়াট) বৃদ্ধি পায়। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন (কিলোওয়াট-আওয়ার) বৃদ্ধি পায় গড়ে প্রায় ৬.৫ শতাংশ হারে। এই পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর (পিএফ) নেমে আসে ৪৯ থেকে ৪০ শতাংশে। অর্থাৎ চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি না রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় অব্যবহূত-স্বল্প ব্যবহূত উৎপাদনক্ষমতার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বেজ লোড প্ল্যান্টের উৎপাদনক্ষমতা বিদ্যমান সর্বমোট ডিরেটেড উৎপাদনক্ষমতার মাত্র ৪৬ শতাংশ। এরপরও দফায় দফায় ছোট ছোট ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ছে। বিগত ১২ বছরে ব্যক্তি খাত ২২,১৬৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ ক্রয়ে কেবল ক্যাপাসি চার্জ দিতে হয় ৫৩,৫২২ কোটি টাকা। এসব বিদ্যুতে বিনিয়োগ ব্যয় অত্যধিক ও অস্বাভাবিক। বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের এমন দৃষ্টান্ত কেউ কোথাও কখনও দেখেনি, ভবিষ্যতেও দেখবে না- এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়।

৫. ১৯৯৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত জ্বালানি মিশ্রে জ্বালানিগুলোর অনুপাত ছিল- গ্যাস : তেল : জল= ৮৭.১ : ৬.৫ : ৬.৪। ২০১৮ সালে ছিল- গ্যাস : তেল : জল : কয়লা : আমদানি বিদ্যুৎ : আরই = ৬৪.৫১ : ২৪.৫২ : ১.৬৩ : ২.৭০ : ৭.৬৩ : ০.০১। যৌক্তিক ও সাশ্রয়ী মূলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় নূ্যনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল গৃহীত হয়। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত জ্বালানি মিশ্রে জ্বালানিগুলোর অনুপাত দেখানো হয়- গ্যাস : তেল : জল : কয়লা : এনই : আরই = ৩০.০ : ৩.০ : ৫৩.০ : ১.০ : ১০.০ : ৩.০। ২০১০ সালের বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ উৎপাদনক্ষমতা হবে ৪০ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক (এলএনজিসহ) উৎপাদনক্ষমতা হবে যথাক্রমে ৫০ ও ২৫ শতাংশ।

৬. বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত জ্বালানি মিশ্র অযৌক্তিক এবং নূ্যনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মহাপরিকল্পনা বা পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনায় দেখানো জ্বালানি মিশ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। পরিকল্পনা বা মহাপরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুপাত কমিয়ে আনা হয়, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অনুৎসাহিত করা হয় এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুপাত বাড়ানো হয়। অথচ বাস্তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অনুপাত কমেছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অনুপাত কমিয়ে আনার কৌশল গৃহীত হয়নি। বরং গ্রিডে আমদানিকৃত এলএনজির মতো দামি জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি করায় গ্যাসভিক্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা ছাড়া বর্ধিত বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। অর্থাৎ পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা বা মহাপরিকল্পনা মাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি হয়নি। আবার অর্জিত উৎপাদনক্ষমতা মাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও হয়নি। ফলে সরকারের নূ্যনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং মেরিট অর্ডার লোড ডিচপ্যাস নীতি অনুসরণে পিডিবি সফল হয়নি।

৭. পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যগুলোর অন্যতম : ১. ২০২১ সাল নাগাদ মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার ৬০০ ইউনিট নিশ্চিত করা; ২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারে দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং এ খাত উন্নয়নে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। বাস্তবে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ সাল নাগাদ মাথাপিছু ৩৩৬ ইউনিট বিদ্যুৎ (গ্রিড) ব্যবহার হয়। হিসাব মতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট জিডিপি উৎপাদনে ১.৫ ইউনিট বাণিজ্যিক জ্বালানি প্রয়োজন পড়ে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সে হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি দক্ষতা ৪০ শতাংশ অতিক্রম করেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উন্নয়ন প্রতিযোগিতাহীন। পরিকল্পনাধীন-নির্মাণাধীন বেজ লোড বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের উৎপাদনে আসা অত্যধিক বিলম্বিত। গ্যাসভিত্তিক বেজলোড বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর সরকারি খাতে গড়ে ৪০ শতাংশের নিচে এবং ব্যক্তি খাতে গড়ে ৭০ শতাংশের ওপরে। স্বল্প খরচে নিজস্ব আমদানিকৃত জ্বালানি তেলে ব্যক্তি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় এবং জ্বালানি তেলে ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ পায়। অথচ ব্যয়বহুল বিপিসির জ্বালানি তেলে সরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অর্থাৎ নূ্যনতম ব্যয় অপেক্ষা অধিক ব্যয় বিদ্যুৎ উৎপাদন কৌশল গৃহীত হয়। তাছাড়া জ্বালানি সংকট বজায় রাখায় উৎপাদনক্ষমতা স্বল্প ব্যবহার হয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ক্যাবের অভিমত, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় যৌক্তিক (দুর্নীতিমুক্ত) হলে বিদ্যুতের দাম ভোক্তা পর্যায়ে বৃদ্ধি নয়, কমানো যায়।

৮. প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-৭৮) উল্লেখ করা হয়, দুর্নীতি একটি অসামাজিক কাজ। দুর্নীতির মাধ্যমে সাফল্য বিস্তৃতি সম্ভব এরূপ বিশ্বাসে স্থাপিত সমাজে অগ্রগতি পথ হারায়। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্বিশেষে অপরাধীকে শনাক্ত করা এবং শাস্তি প্রদান করা আবশ্যক। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-১৫) বলা হয়, দুর্নীতি জাতীয় সম্পদ ও সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করে। মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। এ যাবৎকাল ধরে দুর্নীতি প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তেমন কোনো কাজে আসেনি। তাই আরও প্রচেষ্টা প্রয়োজন। জ্বালানি খাতসহ অন্যান্য খাত উন্নয়নে দুর্নীতি বড় বাধা। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯১৬-২০) সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সরকার দুর্নীতি দমন অভিযানে আছে। ভোক্তারা এ অভিযানে সরকারের সঙ্গে আছে। ক্যাব কর্তৃক বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা চুরির অভিযোগ তদন্ত এবং নাইকো চুক্তি বাতিল করানোই তার প্রমাণ। দুর্নীতিমুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রত্যাশায় ভোক্তারা জ্বালানি অপরাধীদের বিচার চায়।

শিক্ষাবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ