বারবার কেন একই পাণ্ডুলিপি মঞ্চায়ন

ভোলায় গুজব ও সংঘর্ষ

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

বদিউল আলম মজুমদার

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় রোববারের অঘটন নানা দিক থেকেই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত। ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহে যে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছে, তা নিশ্চয়ই মর্মান্তিক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পারস্পরিক সংঘাত, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রায় প্রতিদিনই আমরা প্রাণহানির খবর পেয়ে থাকি। কিন্তু নিছক ফেসবুকে লেখালেখির জেরে চার-চারটি তাজা প্রাণ ঝরে যাবে? এর কোনো সান্ত্বনা থাকতে পারে না। এ ধরনের মৃত্যু 'দুর্ঘটনা' হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভোলার ঘটনায় আমরা যেমন ব্যথিত, তেমনই উদ্বিগ্ন। আমি শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই। আহতদের প্রতিও আমার শুভকামনা। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে সংশ্নিষ্ট সবাইকে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে বলি।

ভোলার পুরো ঘটনা যদি দেখি- ভিন্ন ধর্মের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতার প্রতিফলন ছাড়া আর কিছু নয়। বিক্ষুব্ধরা অভিযোগ করেছিল, একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী তরুণ ফেসবুকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারকে নিয়ে অবমাননাকর কথা লিখেছে। কিন্তু ওই তরুণ দ্রুতই নিজ উদ্যোগে থানায় গিয়ে হাজির হয়েছিল এবং অভিযোগ করেছিল যে, তার ফেসবুক হ্যাক করে এসব কথা লেখা হয়েছে। পুলিশের পক্ষেও এর নেপথ্যের দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুতই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছিল। আমার প্রশ্ন, তারপরও ঘটনা এতদূর গড়াল কেন? স্পষ্টতই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিক্ষুব্ধ সদস্যরা এই ঘটনার আইনি সুরাহা চাননি। তারা এটা নিয়ে সংখ্যাগুরুর দাপট দেখাতে চেয়েছেন। অথচ একবারও কি তারা ভেবেছিলেন, এই দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন সদস্যের পক্ষে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার সাহস থাকা সম্ভব কি-না? বিষয়টি ঠান্ডা মাথায় ভাবলেই বোঝা যায়। তারা যদি অসহিষ্ণু না হতেন, তাহলে হয়তো ঘটনা এতদূর গড়াত না।

মনে রাখতে হবে- সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্ম ভিন্ন হতে পারে। এমনকি এক ধর্মের মধ্যেও মত ও পথের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে আমরা মানুষ। বিশ্বের সব ধর্মই এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য। কোনো ধর্মই মানুষকে আলাদা করে দেখে না। কোনো ধর্মই অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে উন্মাদনা সৃষ্টির কথা বলে না। বরং অপরের প্রতি মানবতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে। অথচ ভোলায় দেখা গেল, অভিযুক্ত ব্যক্তির অস্বীকৃতি এবং পুলিশি তদন্তে ফেসবুক হ্যাক হওয়ার স্বীকৃতির পরও কিছু গোষ্ঠী চেয়েছে উত্তেজনা সৃষ্টি হোক। আর এর জের ধরেই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল।

ভোলায় যা ঘটেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে তা কাম্য ছিল না। এ দেশে স্বাধীনতার আগে ধর্মীয় উত্তেজনা এবং এর জের ধরে দাঙ্গা ও খুনাখুনি কম হয়নি। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন আমরা মেনে নিতে চাইনি বলেই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। যে কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল স্তম্ভ। বলা চলে, এ দেশের মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল সব ধর্মের মানুষের সমান স্বাধীনতার জন্য। সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। ভোলার ঘটনা দেখে প্রশ্ন জাগে- এই জন্যই কি বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল?

দুর্ভাগ্যজনক হলো, গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ভোলাতেই প্রথম ঘটল না। এর আগে একইভাবে ফেসবুক হ্যাক করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ লেখালেখি করে কক্সবাজারের রামুতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছিল। ভোলার ঘটনা যেন রামু বা নাসিরনগরেরই ধারাবাহিকতা। বারবার যেন একই পাণ্ডুলিপি মঞ্চায়ন করা হচ্ছে। সাদা চোখে দেখলেও বোঝা যায়, স্বার্থান্বেষী একটি মহল বারবার একই ধরনের ঘটনাকে পুঁজি করে কিছু লোককে উস্কানি দিয়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে চায়।

আমাদের এখন ভাবনার সময় এসেছে কারা বারবার একই ঘটনা ঘটাচ্ছে। কেন কিছুদিন পরপর এমন ঘটনা ঘটছে। এর নেপথ্য শক্তিকে চিহ্নিত করার দায়িত্ব প্রধানত সরকারের। পাশাপাশি আমাদের সমাজবিজ্ঞানীদের, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদেরও বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। ধর্মীয় নেতাদেরও, বিশেষত সংখ্যাগুরু ধর্মীয় নেতাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে কেন ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা সহিংস রূপ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে আসলে কারা লাভবান হচ্ছে। সংখ্যাগুরু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি এতে করে উজ্জ্বল না ম্লান হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনীতিকদেরও ভাবতে হবে, আপনারা কি এমন পরিস্থিতিতে সদর্থক ভূমিকা পালন করছেন? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকারী ও ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিকারীরা স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের প্রশ্রয়ে থাকে। রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে, আপনারা কাদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন? কাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উৎসাহ দিচ্ছেন। এ ধরনের অঘটনের পুনরাবৃত্তি চলতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে। তখন আপনারা মদদদাতা হিসেবে রেহাই পাবেন না।

ভোলার অঘটনের পর কয়েকটি আলামত পাওয়া যাচ্ছে, যা নিছক রাজনৈতিক উত্তেজনার ফসল নয়। বরং এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের আভাস দেয়। যেমন সংবাদপত্রে পুলিশের বরাতে বলা হচ্ছে, নিহতদের দু'জনের মাথা থেঁতলানো পাওয়া গেছে। তা যদি সত্যি হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই একটি অপশক্তি রয়েছে গোটা ঘটনার পেছনে। এ থেকে সাধারণ মানুষেরও সতর্ক হতে হবে। এতে প্রমাণ হয়, একটি অপশক্তি আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চায়।

ভোলার ঘটনায় আরেকটি বিষয় আমাকে আশ্চর্য করেছে। তা হচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের দাবি মেনে নিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তরে সম্মতি দিয়েছে পুলিশ। অথচ এই ঘটনা কতটা তাৎক্ষণিক উন্মাদনা আর কতটা নীলনকশা, তার আলামত পাওয়া যাবে লাশের ময়নাতদন্তের মধ্য দিয়েই। ময়নাতদন্তের মধ্য দিয়েই নেপথ্যের অপশক্তি চিহ্নিত করা সহজ হতো। আমি মনে  করি, বিষয়টি নিয়ে সংশ্নিষ্টদের দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হবে।

আমি আশা করি, ভোলার ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করা হবে। এ ধরনের ঘটনায় দায়সারা তদন্তের যে নজির অতীতে রয়েছে, তেমন নয়। তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভোলা, রামু, কিংবা নাসিরনগর দেখতে থাকব আমরা। বড় কথা, এর নেপথ্য খলনায়কদের যথাযথভাবে চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করতে হবে। তাদের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

ধর্ম, সম্প্রদায়, দল, মত নির্বিশেষে সবার প্রতি আমার আবেদন থাকবে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আত্মঘাতী পথে হাঁটবেন না। আমরা যদি পরস্পরের প্রতি সহনশীলতার চর্চা করি, অপরের ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি- তাহলে কোনো অপশক্তিই আমাদের উসকে দিতে পারবে না।

সাধারণ সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক