ভোলায় গুজব ও সংঘর্ষ

সম্প্রীতি বিনষ্টের অশুভ তৎপরতা

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ২২ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মোহাম্মাদ আলী শিকদার

ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় গত ২০ অক্টোবর রোববার ফেসবুকে একটি আপত্তিকর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কথিত তৌহিদী মুসলিম জনতার সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ১৮ অক্টোবর একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে একটি অবমাননাকর বক্তব্য পাওয়া যায়।

পুলিশের বক্তব্য থেকে জানা যায়, ওই তরুণ শুক্রবার থানায় আসেন এবং অভিযোগ করেন, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে এবং তিনি নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় থানায় এসেছেন। হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের পুলিশ স্বল্প সময়ের মধ্যে আটক করতে সক্ষম হয়। আইন ও বিচারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হলে বিষয়টি এখানেই শেষ হতে পারত এবং রোববারের দুঃখজনক ঘটনা এড়ানো যেত, চারজন মানুষের জীবন যেত না।

ধর্ম অবমাননা করার অধিকার কারও নেই, তেমনি আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকারও কারও নেই। দুটিই অন্যায় ও অপরাধ। তবে আইন হাতে তুলে নেওয়া অপেক্ষাকৃত বড় অপরাধ। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়; এমনকি যারা আইন প্রয়োগ ও বিচার করেন, তারাও নন। একটি ছোট অপরাধ যেমন আরেকটি বড় অপরাধের জন্ম দেয়, তেমনি একটি বড় অপরাধ অনেকটি বড় অপরাধের জন্ম দিতে পারে। তাই অপরাধ তা ছোট হোক আর বড় হোক, সেটিকে অঙ্কুরেই শেষ করার জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদা সর্বত্র অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় থাকবে, সেটাই প্রত্যাশিত। কারণ সাংবিধানিকভাবে জননিরাপত্তা রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যাতে আইনের আশ্রয় পেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রকম বৈষম্য হলে তা হবে মস্তবড় অপরাধ। ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে চারজন মানুষের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু না হলে এবার পুলিশসহ প্রশাসন ঘটনার সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে যেভাবে রামু ও নাসিরনগরের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে, সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়।

খবরটি থানায় আসার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তাতে আর বাড়াবাড়ি হওয়ার সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার কারণে রোববারের অপ্রত্যাশিত গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন উঠেছে, এই উগ্রবাদী 'তৌহিদী জনতা' কারা, এদের আসল পরিচয় কী? তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগ বাড়িয়ে কোনো পক্ষের দিকে আঙুল তুলতে চাই না। কিন্তু পূর্বে সংঘটিত একই রকম ঘটনার সূত্র ধরে বলতে চাই, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুলিশের ওপর আক্রমণকারী ওই তৌহিদী জনতার নামের আড়ালে কারা রয়েছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা প্রয়োজন। কারণ, এটিকে কিছুতেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাচ্ছে না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজেদের দুর্বলতার কারণে সুবিধা করতে পারে না, তারা সর্বদা তক্কে তক্কে থাকে এবং একটি সুযোগ পেলেই তার ওপর ভর করে অপতৎপরতা চালিয়ে পানি ঘোলা করতে চায়; যদি তাতে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়িটির সন্ধান পাওয়া যায়। আর এরা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকে না, সূক্ষ্ণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সে রকম সুযোগ তৈরি করে। ভোলার ঘটনাটি আমার কাছে এমনই মনে হয়েছে।

শুক্রবার পুলিশের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের পরও একটি পক্ষ শনিবার দিনরাতজুড়ে ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন বক্তব্যসহ ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালায় এবং রোববার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ঈদগাহ মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয়। রামু ও নাসিরনগরে একই প্যাটার্নের সমাবেশ থেকে ভয়ানক অপ্রীতিকর ঘটনার অভিজ্ঞতায় পুলিশের পক্ষ থেকে সমাবেশ না করার আহ্বান জানানো হয়। রোববার পুলিশ সুপারের বক্তব্য শুনে সমাবেশে আগত ধর্মপ্রাণ মানুষ সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যেতে শুরু করেন। এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকে পুলিশের ওপর আক্রমণ শুরু হয় এবং ব্যাপকভাবে ইট-পাথর মারতে থাকে। কয়েকজন পুলিশ আহত হয়। বেগতিক দেখে পুলিশ সুপার নিজে তার ফোর্স নিয়ে পাশের মসজিদের ভেতর আশ্রয় নেন। দুর্বৃত্তরা তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে মসজিদের ভেতরে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এমতাবস্থায় আত্মরক্ষার্থে পুলিশের পক্ষ থেকে গুলি চালানো হয় এবং তাতে চারজন নিহত হওয়ার খবর আসে। তারপর আগত লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যায়। প্রশ্ন উঠেছে, আগত নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ যখন পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপের কথা পুলিশ সুপারের মুখে শুনে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যাচ্ছিল, তখন আবার পুলিশের ওপর আক্রমণ শুরু করল কারা? আক্রমণে ব্যবহূত এত ইট-পাথর তারা কোথায় পেল? আত্মরক্ষার্থে মসজিদে আশ্রয় নেওয়ার পরও পুলিশের ওপর আক্রমণের এই ঘটনা দেখে জামায়াত-শিবিরের পুরোনো তাণ্ডবের কথা মনে পড়ে। নব্বইয়ের দশকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে আন্দোলনের নামে জামায়াতের ক্যাডার বাহিনী কর্তব্যরত পুলিশের একজন সদস্যকে মসজিদের ভেতরে টেনে নিয়ে ইটের আঘাতে মাথার ঘিলু বের করে দেয় এবং তাতে ওই পুলিশ সদস্য নিহত হন। মসজিদের ভেতরেই তার লাশ লুকিয়ে রাখে।

ভোলাতে রোববার যেভাবে লোকজনকে লঞ্চ, ট্রলার, নৌকা ভাড়া করে বোরহানউদ্দিনে আনা হয়েছে, সেটা কি অপরিকল্পিতভাবে, কোনো সুসংগঠিত সংগঠন ছাড়া স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে সম্ভব? এতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনের তৎপরতা আবশ্যক। এরা কারা, এদের উদ্দেশ্য কী, সেটা বোঝার জন্য কেতাব নিয়ে বসার প্রয়োজন নেই। এ দেশে কারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে, কারা ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়ায়, কাদের এত টাকা আছে, সেটি সবাই জানেন। তাদের সঙ্গী পৃষ্ঠপোষকদেরও এ দেশের মানুষ চেনে। এই সময় এ ধরনের একটা অপতৎপরতার উদ্দেশ্যও বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকে কেন্দ্র করে এবং তার সঙ্গে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ফ্রন্ট অরগানাইজেশনে শুদ্ধি অভিযান ইত্যাদিকে ঘিরে পঁচাত্তরের পরে আবির্ভূত অপশক্তি সীমাহীন প্রপাগান্ডাসহ বহু রকম গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলার চেষ্টা করছে। আর এই সময়েই যখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো সংবেদনশীল ঘটনা ঘটে, তখন সেটি বিচ্ছিন্নভাবে দেখার উপায় নেই।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পুনরায় ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চালু হওয়ার পর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার বহু অপচেষ্টা আমরা দেখেছি। সুতরাং ভোলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অশুভ তৎপরতাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্নেষক