উত্তরণের সন্ধিক্ষণে সামাজিক সহিংসতা

মুখোমুখি অবাধ্য সত্য

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. জিয়া রহমান

যুবলীগ নেতাদের ক্যাসিনো-কাণ্ড, শিশু তুহিনকে নৃশংসভাবে হত্যা, বেশ কিছু ধর্ষণ ও সর্বশেষ ভোলায় গুজবকে কেন্দ্র করে যে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এ ধরনের ঘটনার পেছনে কারণ ও এগুলোর সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলে ধরেছি। কোনো না কোনোভাবে এসব ঘটনার মাধ্যমে আমাদের সমাজে সমস্যার নতুন নতুন উপসর্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তা বলার চেষ্টা করেছি। বিষয়গুলোকে সামাজিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট উপসর্গ হিসেবেই দেখতে হবে। ভোলার ঘটনা সেই পরিপ্রেক্ষিতটা সামনে আরও বড় করে নিয়ে এসেছে। এ ধরনের ঘটনা বারবার কেন ঘটছে, কারা ঘটাচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর যেমন জরুরি, তেমনি অসাম্প্রদায়িক চর্চার সংহতি জোরদার করাটাও জরুরি।


দুই.

ক্যাসিনো-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারিতে সংশ্নিষ্ট যুবলীগ নেতাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা তাদের অস্বাভাবিক জীবনযাপন পদ্ধতির সঙ্গেও নতুন করে পরিচিত হয়েছি। সর্বশেষ গত রোববার গণভবনে অনুষ্ঠিত সভা থেকে যুবলীগের চেয়ারম্যানকেও অব্যাহতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের মতো যুবলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জনসাধারণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের বিধ্বংসী কার্যকলাপ মূলত দলীয়করণ, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহির অভাব এবং মোটা দাগে সামাজিক অসঙ্গতিরই প্রতিচ্ছবি। যুবলীগের নেতৃত্বে যুবকদের উপস্থিতি থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন থেকে দলে যুব নেতৃত্ব অনুপস্থিত। যুবলীগ মানেই যেন একটি শক্তি প্রদর্শনের সংগঠন। সাধারণ মানুষের মাঝে এটিই ছিল প্রধান প্রত্যক্ষ। একটি সংগঠন আরেকটি সংগঠনের সহযোগী হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু যুবলীগের নেতৃত্বে এ ধরনের চর্চা ছিল না বললেই চলে। প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী কঠিন সিদ্ধান্ত যা কি-না একটি অভিযান কিংবা আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছে, তাকে আমরা দৃঢ়ভাবে সমর্থন জানাই। যুবলীগে বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া এবং নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে সম্মেলনের আয়োজনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এখন যা দরকার তা হচ্ছে- এই অভিযানকে যথাযথভাবে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। বস্তুত এ নতুন ধরনের কঠিন অভিযান তখনই সার্থকতা পাবে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে নগ্ন লেজড়বৃত্তি থেকে দূরে রাখবে। একই সঙ্গে যদি মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সৃজনশীলতা ও সততা নেতৃত্বের প্রধান গুণাবলি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তাহলে আমরা হয়তো আগামীতে এসব অঙ্গ সংগঠনের ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারব। ক্যাসিনো সমস্যাটি যেহেতু সমসাময়িক অপরাধেরই একটি রূপ এবং যেহেতু অনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেহেতু এসব অপরাধকে আইনের আওতায় আনা ও যুবলীগ ছাড়াও এর সঙ্গে যত কর্তাব্যক্তির সংশ্নিষ্টতা রয়েছে, তাদেরও গ্রেপ্তার করা জরুরি।

তিন.

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে তুহিন নামের ৫ বছরের একটি শিশুকে যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা আমাদের বিমূঢ় করেছে। ক্যাসিনো-কাণ্ড যেমন আমাদের উঠতি পুঁজিবাদী সমাজের একটি উদাহরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, শিশু তুহিনের হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও উঠতি পুঁজিবাদী সমাজের ঋণাত্মক নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় দ্বন্দ্ব-সংঘাত, লোভ ও ব্যক্তিকে যে পণ্যে রূপান্তর করেছে, তুহিন হত্যাকাণ্ড বিশ্নেষণে তেমনটি দেখা যাচ্ছে। সামান্য লোভ এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে দৃশ্যমান প্রতিযোগিতা পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার নিয়ামক, এটি তারই একটি দৃষ্টান্ত। কতটা নৃশংস হলে পিতা তার পুত্রকে নিজ হাতে নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে এবং এ কাজে আপন আত্মীয়দের ব্যবহার করতে পারে, তা অবিশ্বাস্য। সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে এ কথাটি বারবার বলেছি যে, এই উঠতি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যুগ সন্ধিক্ষণে এ ধরনের অপরাধ ভবিষ্যতে আরও দেখা যাবে। কাজেই এখন থেকেই বিষয়গুলো নজরে এনে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। মানুষের হিংস্র সত্তাকে দমন করার সামাজিক কৌশল যেমন খুবই জরুরি, ঠিক তেমনি ন্যায়বিচারের প্রধান মানদণ্ড যেটি দ্রুত শাস্তি প্রয়োগ করাও জরুরি। মনে রাখতে হবে, পরিপকস্ফ পুঁজিবাদী সমাজে নানা ধরনের অসঙ্গতি থাকলেও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার শক্ত অবস্থান এবং ব্যক্তির সামাজিকীকরণের নানাবিধ সৃজনশীল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এ ধরনের অসঙ্গতি দূর হয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে মানবিক গুণাবলি লালন, চর্চা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিতে পারি।

চার.

ভোলার ঘটনা আমাদের আরেক দফায় উদ্বিগ্ন করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি সনাতনী সমাজ ব্যবস্থা প্রযুক্তির সংশ্নিষ্টতার কারণে প্রতিনিয়ত অস্থিরতার দিকে চলে যাচ্ছে, ভোলার ঘটনা তারই একটি নতুন সংযোজন। আমরা এর আগে রামু, নাসিরনগর ও গঙ্গাচড়ায় প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে, বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়িয়েছে এবং মানুষের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ভোলার ঘটনা তারই পুনরাবৃত্তি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক সংহতির যে চর্চা আমরা সারাবিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি দলগুলোর রাজনৈতিক চর্চার স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনার অবক্ষয় ঘটানো হয়েছে। এসব উগ্র, সহিংস রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আদিবাসী এবং ভিন্নমতাবলম্বী মানুষজনকে কখনও নৃশংসভাবে হত্যা কিংবা তাদের জানমালের ক্ষতি করার মধ্য দিয়ে পুরো দেশে একটি ভীতির সংস্কৃতি চালু করেছে। অতীতে কোনো উস্কানি ছাড়াই এসব সামাজিক গোষ্ঠী রাতের অন্ধকারে ভিন্নমতাবলম্বীদের আঘাত করেছে আর এখন সে জায়গা থেকে সরে এসে আরও সূক্ষ্ণভাবে সমাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক সংহতি নষ্ট করা হচ্ছে। বর্তমানে একটি অভিনব পন্থা হচ্ছে ফেসবুকসহ অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দিয়ে একদিকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বিচ্ছুরণ ঘটানো হচ্ছে, অন্যদিকে নির্দোষ ব্যক্তিকে ভিকটিমে পরিণত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দেশের চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তি যেমন তার নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছে, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তিও নিজেদের কায়েমি স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে একটি আইন (ডিজিটাল নিরাপত্তা) আছে। এই আইনের অধীনে এ ধরনের জঘন্য কাজে লিপ্তদের দ্রুত শাস্তি বিধানের মধ্য দিয়েই এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার যথাযথ করার লক্ষ্যে এটিকে একটি নিয়মের মধ্যে আনা যায় কি-না, তাও ভাবা যেতে পারে। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে তথাকথিত বিজয় উল্লাসের নামে পৈশাচিক কাণ্ড ঘটেছিল। ভোলার লালমোহনসহ আগৈলঝাড়া, রামশীল, চট্টগ্রাম ও আরও বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছিলেন। আক্রান্ত হয়েছিলেন ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও। সেসব ঘটনার বিচার হয়নি। আর এ জন্যই এখনও ক্ষতের সৃষ্টি হচ্ছে।

বস্তুত, আমরা গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে অভাবনীয় পরিবর্তন দেখতে পেয়েছি। এটিকে সুসংহত ও টেকসই করতে চাইলে সমাজ উন্নয়নের এই পর্বে সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, সংশ্নিষ্ট আইনের পরিবর্তন ও কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। আমি বারবার বলছি, আমরা উত্তরণের একটি যুগসন্ধিক্ষণে অবস্থান করছি। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই সন্ধিক্ষণের সঙ্গে সামাজিক অপরাধের একটি নীরব যোগসূত্র রয়েছে। সে কারণে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সুসংগঠিত কার্যাবলির মধ্য দিয়ে আগামী দিনে এ ধরনের অপরাধ রোধ করতে হবে।

[email protected]

সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়