বাগদাদি-পরবর্তী বিশ্ব ও বাংলাদেশ

জঙ্গিবাদ

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

গত শনিবার বিশ্ব জানতে পারে, একজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী এবং ইসলামিক স্টেটের স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর আল-বাগদাদি নিহত হয়েছেন মার্কিন বাহিনীর এক বিশেষ কমান্ডো অভিযানে। যদিও এর আগে প্রায় অর্ধডজনবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকার ও সংগঠনের তরফ থেকে বাগদাদির মৃত্যু কিংবা গুরুতর আহত হওয়ার কথা বললেও পরে তা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, সত্যি সত্যিই বাগদাদি তার পরিণতি এড়াতে পারেনি। কয়েক বছর ধরে তার নেতৃত্বে পরিচালিত বিশ্বজুড়ে নৃশংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিণতিতে তারও নৃশংস মৃত্যু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই হোয়াইট হাউসে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো দল 'ডেল্টা ফোর্স' হেলিকপ্টারে করে সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি সিরিয়ার ইদলিব শহরের বারিশা গ্রামের কাছে অবতরণ করে। বাগদাদি যে গৃহে অবস্থান করে সে গৃহে 'ডেল্টা ফোর্স' কয়েক মিনিটের অভিযানে কয়েকজন জঙ্গিকে হত্যা করে। সে সময় আবু বকর আল-বাগদাদি গৃহের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি টানেল দিয়ে তিন সন্তানসহ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মার্কিন বাহিনী তখন ওই টানেলে বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুর পাঠিয়ে বাগদাদিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। বাগদাদি টানেলের শেষ মাথায় পৌঁছে উপায়ান্তর না দেখে সুইসাইড জ্যাকের বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করে। সে সময় তার ছোট তিন সন্তানেরও মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ সফল অভিযানে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী, সিআইএসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও জঙ্গি অভিযানে সহায়তাকারী রাষ্ট্র বিশেষ করে রাশিয়া, তুরস্ক, ইরাক, কুর্দি বাহিনী এমনকি সিরিয়া সরকারেরও প্রশংসা করেন।

আবু বকর আল-বাগদাদির নামের সঙ্গে বিশ্ববাসী পরিচিত হয় ২০১০ সালের মে মাসে যখন বাগদাদি আল-কায়দা ইন ইরাকের (একিউআই) নেতৃত্বে চলে আসে। এই একিউআই-ই ইসলামিক স্টেট অব ইরাক এবং আরও পরে আইএসআইএল ও আইসিস তথা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া সংক্ষেপে আইএস বা ইসলামিক স্টেট নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সংগঠনটি ছিল মূলত ইরাকি সুন্নিদের প্রতিষ্ঠান। যারা ছিল সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাকে শিয়াদের ক্ষমতাবিরোধী। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় সাদ্দাম হোসেনের পরাজিত বাহিনীর অসংখ্য সদস্য, যাদেরকে সরকার পদচ্যুত করে। ২০১৩ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সিরিয়ার বিভিন্ন সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে আইএস মিলে যায়। তখন সিরিয়ার সুন্নিরাও বাশার আল আসাদের সরকার ও সেনবাহিনীরও শিয়াভুক্ত হওয়ার কারণে প্রচণ্ড বিরোধিতা করতে থাকে।

২০১৪ সালের মধ্যে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল ও ইরাকের মধ্যাঞ্চল আইসিসের দখলে চলে আসে। ইরাকের রাকা শহরে গড়ে ওঠে আইসিসের রাজধানী। সেখান থেকে ইরাক অভিমুখী অভিযানে ইরাকের সরকারি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। ওই বছর জুন মাসে ইরাকের বৃহত্তম শহর মাসুল আইএস দখল করে নেয়। ওই বছর ২৯ জুন মসুলের প্রাণ মসজিদে এক ভাষণে আবু বকর আল-বাগদাদি নিজেকে 'আমিরুল মোমেনিন' তথা সব মুসলমানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে বিশ্বের সব মুসলমানকে তার প্রতিষ্ঠিত খেলাফতে যোগদান ও সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানান।

পরবর্তী এক বছরের মধ্যে আইএসের অধীনে সব সৈন্য ইরাক ও সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল নিয়ে প্রায় এক কোটি জনগোষ্ঠী আইএসের কর্তৃত্বাধীনে চলে আসে। ২০১৪ সালের অক্টোবরে আইসিসের অগ্রবর্তী বাহিনী খোদ বাগদাদ শহরের উপকণ্ঠে উপনীত হয়। ঠিক সে সময় মার্কিন বাহিনী সক্রিয়ভাবে ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, একই সঙ্গে রাশিয়া সিরিয়ার আসাদের হাত শক্তিশালী করে। তবে আইসিসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দি জনগোষ্ঠী। যাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে আইএস ধীরে ধীরে এলাকা হারাতে থাকে। ২০১৭ সালের শেষ দিক মসুল এবং তার কিছুদিন পর রাজধানী রাকার পতন হয়। কিন্তু এই কয়েক বছরের মধ্যে আইএস বাগদাদির নেতৃত্বে এবং প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় বিশ্বের ইতিহাসে এক জঘন্যতম রক্তক্ষয়ী হত্যাযজ্ঞ চালায়।

প্রথমত তারা মুসলমান শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। কারণ তাদের দৃষ্টিতে শিয়ারা ইসলামের আদর্শ বিচ্যুত জনগোষ্ঠী। একই সঙ্গে সিরিয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে বসবাসরত খ্রিষ্টান ও ইয়াজেদি জনগোষ্ঠী তাদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। খ্রিষ্টান ও ইয়াজেদি জনগোষ্ঠীর মেয়েদের যৌন দাসী হিসেবে প্রকাশ্য নিলামে তোলে। তাদের ধর্ষণ করে ভিডিও ছেড়ে দিয়ে খোদ ইসলাম ধর্মের ভাবমূর্তি সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার শত শত মানুষকে জ্যান্ত কবর দেওয়া, মানুষকে মেরে ক্রুশবিদ্ধ করে সেসব দেহ রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রদর্শন করে, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। এসব বর্বরতা বিশ্ব বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমাদের এখনও মনে আছে জর্ডানের সেই তরুণ পাইলটের কথা। যার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ধীরে ধীরে আগুনে পুড়িয়ে, পূর্বঘোষিত সময়ানুযায়ী টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেই।

এতশত কুকীর্তি সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত তরুণ-তরুণী এমনকি প্রবীণরাও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নানাভাবে গিয়ে আইসিস অধিকৃত এলাকায় গিয়ে তাদের খেলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী জেহাদের মাধ্যমে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। এমনকি আমরা দেখেছি বাংলাদেশ থেকেও শিক্ষিত তরুণ-যুবক, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী-প্রকৌশলী তাদের সব ছেড়ে আইএস এলাকায় 'হিজরত' করেছিল।

২০১৭ সালের নভেম্বরে আইএসের রাজধানী রাকা পতনের পর ইসলামিক স্টেট ও তার খেলাফতেরও পতন ঘটে। কিন্তু সারাবিশ্ব তখন আইএসের শেষ অঙ্ক দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের সহায়তায় কোনো এক অজ্ঞাত নির্দেশে কয়েক হাজার আইএস যোদ্ধা ও পরিবার-পরিজন রাকা থেকে ইদলিবে সরিয়ে নেয়। তখন কয়েক হাজার আইএস সমর্থক অবরোধ থেকে বেরিয়ে অজ্ঞাত স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে, তারা বাগদাদিকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। আজ পর্যন্ত খেলাফত হারানোর পরও হাজার হাজার আইসিস সদস্য সিরিয়ার ইদলিবে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তারা ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও আবু বকর আল-বাগদাদির মৃত্যু বলা হচ্ছে আইএসের জন্য বিরাট ক্ষতি কিন্তু পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্বে আসিস, আল কায়দার মতো বিভিন্ন বাহিনী ব্যবহূত হতেই থাকবে।

বাংলাদেশে আইসিসের মতাদর্শ অনুসারীদের আমরা জেএমবি বা নব্য জেএমবি বিভিন্ন নামে চিনি। ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই হলি আর্টিসান হামলায় আমরা তাদের রক্তাক্ত আত্মপ্রকাশ দেখেছি। এরপর থেকে আমাদের দেশে বড় ধরনের আক্রমণ হয়নি। তবে আক্রমণের কিছু প্রচেষ্টা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভণ্ডুল করে দিয়েছে। এখন বড় ধরনের আক্রমণের আশঙ্কা না থাকলেও একক জঙ্গি আক্রমণের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ আমরা দেখছি একদিকে যেমন জঙ্গি ধরা পড়ছে, তেমনি জঙ্গি তৈরিও হচ্ছে। আমাদের এখানে জঙ্গি তৈরির উপাদান বিদ্যমান থাকলেও আশার কথা এই যে, জঙ্গি ভাবধারা জনমানুষের সমর্থন পায়নি। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়া এসব মতাদর্শ টিকতে পারে না।

শঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের প্রতিবেশী পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে আইএস, আল কায়দাসহ নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত আফগানিস্তান থেকে সরে যায় বা তাদের সৈন্য বাহিনীকে গুটিয়ে নিয়ে যায়, সেখানে তালেবান আবার ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান শাসন কায়েম হলে তার প্রভাব পুরো অঞ্চলের ওপর পড়বে। আমাদের বুঝতে হবে, যদি জেহাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তরুণরা সিরিয়া যেতে পারে, তবে আফগানিস্তানে যাওয়া আরও সহজ হবে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধেও আমরা সেটা দেখেছি। একই সঙ্গে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত যখন উগ্র হিন্দুত্ববাদী তৎপরতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তার বিপরীতে সেখানে মুসলিম উগ্রবাদও বাড়তে পারে। ভারতে যেহেতু মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যায় অনেক, সেহেতু সেখানে উগ্রবাদ ছড়ালে এ অঞ্চল তো বটেই, বিশ্বের জন্যও হুমকি হতে পারে।

এখন একদিকে বাগদাদি অধ্যায়ের সমাপ্তি আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি যদি না থাকে এবং যেসব আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদান জঙ্গিবাদ তৈরি করতে পারে, সেগুলো দূরীভূত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব থেকেই যাবে।

বিশেষত আমরা যদি তরুণদের জঙ্গিবাদে ঝুঁকে পড়া ঠেকাতে না পারি, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিদের কার্যক্রম নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি; তাহলে শুধু অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য আসবে না। বাগদাদি নিহত হওয়ার পর আইএসের কার্যক্রম যদি স্তিমিতও হয়, জঙ্গিবাদী নতুন গোষ্ঠী উদ্ভূত হতে কতক্ষণ? অতীতে এর নজির কম নেই। এক্ষেত্রে অভিযান ও প্রচারণার পাশাপাশি জঙ্গিবাদবিরোধী পাল্টা ভাষ্যও তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা আমি সমকালেই লিখেছি একাধিকবার। এসব ভাষ্যের মাধ্যমে আমাদের তরুণ সমাজকে বোঝাতে হবে, জঙ্গিবাদ আদৌ ইসলাম স্বীকৃত পথ নয়।



নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক