গণতন্ত্রে ঐকমত্য চাই

রাজনীতি

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এমাজউদ্দীন আহমদ

গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছেই। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের হাল-হকিকত সম্পর্কে উদ্বেগেরও শেষ নেই। গণতন্ত্রের প্রকৃত সংজ্ঞাসূত্র মোতাবেক বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিদ্যমান কি-না, এ নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র অনেক পুরনো এবং আদর্শ হিসেবে মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, আদিম সমাজে বিদ্যমান ছিল এক ধরনের সমতাভিত্তিক সমবণ্টনকেন্দ্রিক ব্যবস্থা। বিদ্যমান ছিল গ্রুপ বা গোত্রের সঙ্গে এক ধরনের একাত্মতা আর ছিল সাম্য-সহমর্মিতা-সমবেদনাকেন্দ্রিক সাম্য। রবার্ট ডালের কথায়, আদিমকাল থেকেই শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সমাজের মানুষ ভেবেছেন। তাদের রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমমর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান, সামগ্রিকভাবে তারা সার্বভৌম এবং তাদের রয়েছে নিজেদের শাসন করার উপযোগী সক্ষমতার সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান। সমাজ বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হলে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা জটিল হয়ে উঠলে শাসনব্যবস্থায় স্তর ও পর্যায় সৃষ্টি হতে থাকে। ফলে কিছু দক্ষ ব্যক্তির প্রভাব স্বীকৃত হয় বটে; কিন্তু সাধারণ মানুষের চাহিদা কোনোক্রমে উপেক্ষিত হয়নি। সবাই মিলে শাসন এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালন করেছেন। এভাবে শাসনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রের উত্থান ঘটে খ্রিষ্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে। তখন গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোতে একটু একটু করে এ ব্যবস্থা স্থিতিশীল হয়। গ্রিস থেকে রোমে এর বিস্তৃতি ঘটে।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখি, গ্রিসের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পদদলিত ও সব নগররাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করে বিশ্বজয়ের অভিযান শুরু করেছিলেন একজন খ্যাতনামা গ্রিক দিজ্ঞ্বিজয়ী এবং তিনি আলেকজান্ডার। শুধু গ্রিস কেন, উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে রোমান ব্যবস্থা পর্যুদস্ত হয় হুন, শক ইত্যাদি বর্বর জাতির বিজয় অভিযানে। রোম দখল করে তাদের সংস্কৃতিচর্চা ও গণতন্ত্র দেখে কোনো কোনো নেতা অট্টহাসি দিয়ে বলেছিলেন, এখন আর এসব আবর্জনার কোনো প্রয়োজন নেই। কুঠারাঘাতে রোমের বহু নাট্যশালা তারা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবে গ্রিক ও রোমানদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসে। কিন্তু সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিশেষ করে স্বশাসনের প্রতি মানুষের যে সহজাত দুর্বলতা, তা তো চিরঞ্জীব। তার তো মৃত্যু নেই। হঠাৎ তখনকার সভ্য দুনিয়া অবলোকন করলেন, ঊষর মরু অঞ্চলের খেজুর বীথির পাশে এক গ্রামীণ পরিবেশে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াসরেব লোকালয় মদিনা নাম ধারণ করে নতুনভাবে, একেবারে নতুন আঙ্গিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করে ফেলেছে; তাও ওই এলাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন গোত্রের, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনসমষ্টির রাষ্ট্র গঠনের এক চুক্তির মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, তারা একটি সুলিখিত সংবিধান রচনাও করেছেন। এ সংবিধান 'মদিনা সনদ' নামে খ্যাত। নেতৃত্বে ছিলেন মক্কায় জন্মগ্রহণকারী ইসলামের রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। বিশ্বের সর্বত্র তখন রাজরাজড়ার শাসন। সম্রাট ও ধর্মযাজক-পোপের আধিপত্য। বিশ্বময় সাহারা মরুভূমির মধ্যে মদিনা রাষ্ট্র যেন ছোট্ট এক মরূদ্যান। এ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে উলেল্গখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল- শাসনকারীদের ন্যায়ানুগ কর্মকাণ্ড, তাদের স্বচ্ছ নীতিমালা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি। চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট মদিনা রাষ্ট্রের সনদ হয়ে ওঠে বিশ্বে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। সাম্য, শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্ব হয় এর স্লোগান। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাংলাদেশের রাজনীতি প্রকৃতপক্ষে কতটা আদর্শিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি!

সবসময় বলা হয়েছে, গণতন্ত্র একান্তভাবে পাশ্চাত্যের এবং পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গবেষক-সমালোচকদের সুচিন্তিত অভিমত ও বিশ্লেষণের ফলেই গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হয়েছে। এ বিবরণ সঠিক নয়, নয় পরিপূর্ণ। ২০০০ সালে প্রকাশিত 'দি গ্লোবাল অ্যাডভান্স অব ডেমোক্রেসি' গ্রন্থে আদেল সাফটি সত্যই বলেছেন, 'আলোকিত যুগের ইউরোপীয় চিন্তাবিদরা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উৎস যে মূল্যবোধ, তা বিশ্লেষণে সর্বপ্রথমে লেখনী ধারণ করেননি। তাদের বহু আগেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুসলিম দার্শনিকরা। প্রকৃত প্রস্তাবে জন লক এবং রুশোর বহু আগে আলফারাবি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তিরূপে স্বাধীনতা, সাম্য ও জনগণের সম্মতি সম্পর্কে মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন।'

দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়ার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমাজকে নতুনভাবে সুসজ্জিত করে। এ প্রক্রিয়ার অনুধাবনে একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। ১৮৯৩ সালে সর্বপ্রথম নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয় নিউজিল্যান্ডে। অস্ট্রেলিয়ায় তা স্বীকার করা হয় ১৯০২ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২০ সালে ও ব্রিটেনে ১৯২৮ সালে। যে ফ্রান্সে শাসনব্যবস্থাকে ওলটপালট করে বিপল্গবের জন্ম হয়েছে ১৭৮৯ সালে, সেই ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে নারীরা ভোটাধিকার লাভ করেন ১৯৪৭ সালে। ইউরোপের সবচেয়ে স্থিতিশীল, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক উন্নত এবং সৃজনশীলতায় অগ্রগামী রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডে নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয় ১৯৭১ সালে অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বছরে। এদিক থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গণতন্ত্র প্রাচীনতম বটে; গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিন্তু সাম্প্রতিককালের, এক অর্থে বিশ শতকের।

ইতিহাসে সর্বপ্রথম এই সময়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা সর্বাধিক। এক সমীক্ষায় জানা যায়, বিশ্বের সমগ্র জনসমষ্টির ৬৫ শতাংশ এখন বাস করছেন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে। পাশ্চাত্য ও মুসলিম বিশ্ব, বিশেষ করে আরব বিশ্বের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো পাশ্চাত্য রেনেসাঁ ও রিফরমেশন আন্দোলনের ফলে যেভাবে এনলাইটেনমেন্ট যুগে বা আলোকিত যুগে পা ফেলে এবং বিভিন্ন বিপল্গবের পরে যেভাবে গণঅধিকার সম্পর্কে সচকিত হয়ে ওঠে, মুসলিম বিশ্বে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তেমন প্রভাবশালী হয়ে ওঠেনি। মধ্যযুগ অতিক্রম করে পাশ্চাত্য আধুনিকতার সরোবরে যেভাবে অবগাহনের সুযোগ লাভ করে, মুসলিম বিশ্বে তেমন সুযোগ আসেনি। এ ছাড়া উনিশ শতকের শিল্পবিপল্গব যেভাবে ইউরোপে নতুন সমাজের পত্তন করে, আরব বিশ্বে তাও ছিল অনুপস্থিত। শিল্পবিপল্গবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বাণিজ্যের বহুমুখী নেটওয়ার্ক তৈরি হয় দেশে-বিদেশে। বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয় নতুনভাবে। নব নব প্রযুক্তি আবিস্কারের ফলে সমাজে বৈপল্গবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। শ্রমিক শ্রেণি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। জন্মলাভ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। শিল্পপতি, বড় বড় ব্যবসায়ী উৎপাদকদের কাছে মাথানত করতে বাধ্য হয়। আরব বিশ্বে এ ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

এটি অবশ্য সত্য, তখনকার শাসনব্যবস্থাগুলোর প্রকৃতি ছিল ভিন্ন এবং আধুনিককালের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার থেকে তা ছিল হাজার যোজন দূরের। ওই সব শাসনব্যবস্থা বিভিন্নভাবে ছিল সীমিত, অপরিণত, অনেকটা প্রাথমিক পর্যায়ের। গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের পতনের ফলে সমগ্র বিশ্বে সৃষ্টি হয় সামন্তবাদী এক অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের। গণতন্ত্রের চেতনা দলিত-মথিত করে সামন্ত প্রভুরা খণ্ডছিন্ন জনপদে প্রতিষ্ঠা করে তাদের ব্যক্তিগত আধিপত্য এবং সেই আধিপত্যের নিগড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি হয় গণতান্ত্রিক চেতনা। ইউরোপব্যাপী এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক ইতিহাসে এ সময়কাল মধ্যযুগ বলে পরিচিত। একদিকে ধর্মীয় উন্মাদনা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে সামন্তপ্রভু ও আরও পরে রাজন্যবর্গের সঙ্গে পোপদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বন্দ্ব ও দীর্ঘকালীন পরিসরে রাজতন্ত্রের প্রচণ্ড দাপট এবং তাদের পারস্পরিক সংঘাতের ফলে গণতন্ত্রের ধারণা সমাজ জীবন থেকে হয় নির্বাসিত। এ অবস্থা অব্যাহত থাকে দীর্ঘদিন। দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিকতার ঘন অন্ধকার থেকে অবশেষে আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাঠামো এবং কার্যক্রম সুস্পষ্ট হতে থাকে আঠারো শতকের ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় সংঘটিত কিছু গণভিত্তিক আন্দোলন ও বিপল্গবের মাধ্যমে।

এর দুর্দম তরঙ্গ সমগ্র ইউরোপকে আন্দোলিত করতে থাকে কয়েক শতাব্দী ধরে এবং গভীরভাবে প্রভাবিত করে ইউরোপের শিল্পকলা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে। মানবতার বিজয় ছিল এর প্রধান স্লোগান। প্রত্যেকের মনে আত্মবিশ্বাসের সূত্রকে সুদৃঢ় করা ছিল এর লক্ষ্য। সীমাহীন সম্ভাবনার অধিকারী যে মানুষ, তার স্বীকৃতি ছিল এর মৌল সুর। পাশ্চাত্যে মানুষ আবেগের পরিবর্তে যুক্তির প্রাধান্য স্বীকার করেন। ব্যক্তি-আধিপত্যের পরিবর্তে আইনের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আইনে যে তাদেরই স্বার্থ প্রতিফলিত হতে হবে, তা শাসকদের মানতে বাধ্য করেন। তাদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া শাসক যে তাদের ওপর কোনো কর আরোপ করতে পারবেন না, তা শাসককে মানতে বাধ্য করেন। সর্বোপরি, তাদের সম্মতির ভিত্তিতে যে সরকার গঠিত হবে এবং তাদের সম্মতিসাপেক্ষে সরকার অব্যাহত থাকবে, তা সরকারকে স্বীকার করতে বাধ্য হন। এভাবে পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের শিকড় জনসমাজে গভীরে প্রবেশ করতে শুরু করে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরোপিত, গণতন্ত্রের প্রকৃত সংজ্ঞা-সূত্র মোতাবেক প্রকৃত গণতন্ত্র নয়; এই বক্তব্য অমূলক নয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রের চালচিত্র কেমন! স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স প্রায় পাঁচ দশক ছুঁই ছুঁই। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষায় রয়েছে গণতন্ত্র এবং এই গণতন্ত্রের জন্য তাদের ত্যাগ কম নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের গণতন্ত্রকে এখনও আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে শাসক মহল হৈচৈ করলেও প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের অবস্থা ভালো নয়। এখানে সর্বাংশে গণতান্ত্রিক অধিকার স্বীকৃত নয়। রাজনীতির মাঠ নয় সমতল। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার এখনও এখানে সোনার হরিণ। গণতন্ত্র মানে তো শুধু নির্বাচন নয়। আর নির্বাচনের নামে এখানে বিগত কয়েক বছর ধরে যা হচ্ছে, তা গণতন্ত্রের সৌন্দর্যহানিই শুধু ঘটায়নি, কঠিন প্রশ্নের মুখেও ফেলে দিয়েছে। গণতন্ত্রে ঐকমত্য চাই। চাই পরমতসহিষুষ্ণতা। চাই সবার সমান অধিকার। কিন্তু এর কোনোটি এখানে অবাধ নয়। এমতাবস্থায় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশ যেন দুই বিপরীত মেরুতে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়