চার দফা আদায়ে চীন তুরুপের তাস

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আহমদ রফিক

শরণার্থীদের নিয়ে একাধিক লেখা লিখতে হচ্ছে। কারণ মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থী নামের রোহিঙ্গাদের অনেকেই সমস্যা তৈরি করে চলেছে। সে সমস্যা নানামাত্রিক। সম্ভাব্য সমস্যা নিয়ে সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছিল তাদের আগমনের সূচনালগ্নেই। মনে হয়, বিষয়টি তখন মানবিক কারণে কেউ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেননি।

পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ একাধিকবার শরণার্থী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। একবার নিজেরাও শরণার্থী হয়েছে একাত্তরে, আশ্রয় নিয়েছে ভারতে। যুদ্ধ শেষে স্বদেশে ফিরে এসেছে। কিন্তু বড় শরণার্থী সমস্যা ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাপীড়িত দেশভাগের সময় এবং তার কিছু সময় পরও। সেসব দাঙ্গা ছিল বীভৎস- নরনারী হত্যা ও নারী ধর্ষণ।

তিন শাসনামলের অনাচারী রাজনৈতিক ঘটনাবলি দেখার অভিজ্ঞতার কারণে আমার মনে হয়েছিল, লাখে লাখে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে না পারলে বাংলাদেশের জন্য আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্যা তৈরি হবে। যেমন হয়েছে পূর্ববঙ্গে ও সিন্ধুতে (করাচি) বিহারি মোহাজের শরণার্থীদের নিয়ে।

শরণার্থীরা চরিত্র বিচারে মোটা দাগে দুই ধরনের- স্থায়ী ও অস্থায়ী। '৪৭-এর মোহাজের-রিফিউজিদের স্ট্যাটাস ছিল স্থায়ী, পুরোপুরি না হলেও কিয়ৎমাত্রায় নেহরু-লিয়াকত প্যাক্টের কল্যাণে। কিন্তু পাকিস্তানে মোহাজেরদের আচরণগত কারণে সমাধানের পরিবর্তে কণ্টকিত সমস্যাই তৈরি হয়। যেমন- করাচিতে, তেমনি পূর্ববঙ্গের ঢাকাসহ একাধিক শহরে। শেষ পর্যন্ত ওরা একাত্তরে যুদ্ধাপরাধী রাজাকারে পরিণত হয়। বর্তমানে তারা জেনেভা ক্যাম্পে শোচনীয় জীবনযাপন করছে।

এসবের সূত্র উল্লেখই যথেষ্ট। বিশদ বিবরণে না গিয়ে তুলনা টেনে বলতে হয়, পূর্বোক্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী রোহিঙ্গারা অস্থায়ী শরণার্থী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় স্বদেশে ফিরে যাবে অনুকূল পরিবেশে- এমনটাই ছিল তখনকার হিসাব ও বাস্তবতা। কিন্তু রাজনীতি এমনই বিটকেলে বিষয় যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে হিসাব মেনে চলে না। মিলছে না রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এবং তা একাধিক মাত্রায়। ওদের বড়সড় অংশের, বিশেষ করে তরুণদের আচরণ এককথায় আপত্তিকর। ইতিমধ্যেই দু'বছরে যা কিছু ঘটেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, অনৈতিকতা, দুর্নীতিপরায়ণতা, নাগরিকত্ব পেতে জাল-জালিয়াতি, সর্বোপরি তারুণ্যে সন্ত্রাসীপনা। জুটে যাচ্ছে একইরকম বহিরাগত নেতা।

এক পত্রিকায় দেখেছি লেখা- 'কে এই মহিবুল্লাহ, যে রোহিঙ্গাদের প্ররোচিত করছে স্বদেশে ফিরে না যেতে? কে বা কাদের মদদে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার প্রতিবাদী সমাবেশ স্বদেশে ফিরে না যেতে? একটি কথা তো স্পষ্ট, বাংলাদেশ তাদের জোর করে মৃত্যু উপত্যকায় পাঠাতে চায় না। চায় অনুকূল পরিবেশে তাদের প্রত্যাগমন। আমরাও একই কথা বলি। আর সে জন্যই আমাদের লেখায় দাবি, চীনকে আন্তরিক সততায় অন্তর্ভুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক বৈঠকের মাধ্যমে দ্রুত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান। আমি বিশেষভাবে 'দ্রুত' শব্দটির ওপর জোর দিতে চাই। কারণ প্রত্যাবাসনে যত দেরি হবে, তত স্থানীয় সমস্যা বাড়তে থাকবে। ইতিমধ্যে দু'বছর কেটে গেছে। সমস্যার সমাধান দূরে থাক, নতুন নতুন স্থানিক সমস্যা তৈরি হতে শুরু করেছে।

এর কারণ একাধিক। কারণ যেমন স্থানিক, তেমনি আন্তর্জাতিক চরিত্রের। বৈশ্বিক বৃহৎ শক্তিগুলো নিজ স্বার্থে তাদের মতো করে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে খেলছে। এ খেলায় যেমন কার্যকর আন্তর্জাতিক রাজনীতি (যেখানে জাতিসংঘ প্রায় অকেজো বলা চলে), তেমনি তাদের কারও ঘুঁটি হিসেবে স্থানীয় বৃহৎ এনজিওগুলো।

এনজিও নিয়ে সমস্যার কথা বাংলাদেশে স্বল্প আলোচিত বিষয় নয়। প্রগতিশীল রাজনৈতিক-বুদ্ধিজীবী মহল বিশেষ বিশেষ এনজিওর কার্যকলাপ নিয়ে বিচার, বিশ্নেষণ ও সমালোচনা কম করেনি। কিন্তু সরকার সেসব যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য কানে তোলেনি। এখন তারা রোহিঙ্গা উপলক্ষে ঘটনাবিশেষের কারণে এনজিওগুলোর ভূমিকা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছে।

এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রোহিঙ্গা বসতি এলাকায় রোহিঙ্গা বনাম স্থানীয় অধিবাসীদের সম্পর্ক এবং তা মূলত অসন্তুষ্টি ও বিরূপতার। এতে কোথাও জ্বালানি যোগ করছে কোনো কোনো এনজিও কার্যকলাপ, যা স্থানীয় স্বার্থবিরোধী। উখিয়া, টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত কোথাও, কিছু ব্যতিক্রম বাদে রোহিঙ্গা বনাম স্থানীয় অধিবাসী সম্পর্ক মসৃণ নয়।


কোথাও কোথাও ইতিমধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘাতের ঘটনাও ঘটতে দেখা যাচ্ছে। যেমন কক্সবাজারে। আবার এদিকে উখিয়া বা পাহাড়ি এলাকায় একদিকে শরণার্থী শিবিরের জন্য বন কেটে উজাড় করে পাহাড়িদের জীবনযাত্রার ছন্দ নষ্ট করা হচ্ছে, বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ভিন্নধাতের জীবনযাত্রার উপদ্রবে, উৎপাতে তারা ক্ষুব্ধ। একদিকে ক্ষুব্ধ পাহাড়ি

মানুষ, অন্যদিকে স্থানীয় বাঙালি সমাজ নানা কারণে অসন্তুষ্ট। সেখানে অর্থনৈতিক, সামাজিক দুই ধরনের কারণই উপস্থিত। মাঝখানে এনজিওগুলোর রোহিঙ্গাদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ, যা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অনেকেরই ধারণা। এ ছাড়া রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক বিভেদ।

একটি কাগজে দেখছি শিরোনাম :'শরণার্থী ও স্থানীয়দের সম্পর্কের অবনতি'। আমি শঙ্কিত হয়ে ভাবছি করাচির সিন্ধি-মোহাজের (বিহারি) সংঘাতের কথা। এখন তো করাচিসহ একাধিক সিন্ধি অঞ্চলে বিহারিদের রাজনৈতিক সংগঠন এমকিউএমের প্রাধান্য। সিন্ধিরা কোণঠাসা। দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা নাফ-সংলগ্ন চট্টগ্রামের সীমান্ত এলাকা কি তেমন পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? কারণ অন্তত একটা তো বটেই, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী তরুণদের উগ্রতা।

পূর্বোক্ত শিরোনামের প্রতিবেদনের আলোচনায় যে তথ্যটি উঠে এসেছে, তা রীতিমতো শঙ্কার তো বটেই। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে :'রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে স্থানীয় গ্রামবাসীর বড় অভিযোগ, তারা বড়ই অকৃতজ্ঞ।... এদের আচরণ বড়ই উদ্ধত বলেও অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের।' প্রতিবেদকের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তার মতে, 'একদল তরুণের মধ্যে দেখা গেছে উচ্ছৃঙ্খল, বেপরোয়া মনোভাব।' সম্ভবত পূর্ব অভিজ্ঞতা ও নিজ বাস্তুভিটায় ফিরতে না পারার হতাশা থেকে এ অবস্থা। অবশ্য এ জাতীয় দৃশ্যপট হয়তো সর্বত্র বিরাজমান না-ও হতে পারে। কিন্তু এযাবৎ প্রকাশিত আরও বহু ঘটনার প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বাস্তব বিচারে নেতিবাচক, অন্তত বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেষ কথা একটাই- যত দ্রুত সম্ভব তাদের স্বদেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা।

কথাটা আমরা আগেই বলেছি, আবারও বলছি। এ সমস্যা সমাধানের মূল চাবিকাঠি চীনের হাতে। চীনের সঙ্গে বেইজিংয়ে এক দফা আলোচনা হয়েছে। আরও হচ্ছে। তাদেরকে দিয়েই, অন্যদের সমর্থন নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সমস্যা সমাধান করতে হবে।

ইতিমধ্যে জাতিসংঘ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। এ সম্পর্কে মাহাথির মোহাম্মদের বক্তব্যটি বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অতীব সঙ্গতিপূর্ণ। তার মতে, 'সংকট সমাধান করতে হবে এখনই' (শিরোনাম সংবাদপত্রের)। তিনি এ সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শক্তিমান সদস্যদের সংশ্নিষ্ট হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, 'এটা স্পষ্ট যে, মিয়ানমার এ সংকটের সমাধান করতে রাজি নয়।' সে জন্যই আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি তার আহ্বান।

এ সম্পর্কে নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষপাতী। অর্থাৎ অবস্থা কিছুটা অনুকূল হওয়ার মুখে। 'মিয়ানমার বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিতে ৩৯৪-২১ ভোটে বার্মা অ্যাক্ট গৃহীত। এরপর সিনেটেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রতিনিধি পরিষদ।'

অন্যদিকে শেখ হাসিনার চার দফায় রয়েছে : রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমারের সদিচ্ছা, বৈষম্যমূলক আইন ও চর্চা পরিত্যাগ, রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন এবং রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ ও রোহিঙ্গাবিরোধী নৃশংসতা দূর করার নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক মহল থেকে। পরিস্থিতি বিচারে এই নিশ্চয়তায় চীনের সম্মতি আদায় করতে হবে, যা হবে তুরুপের তাস।

এ চাপ অব্যাহত রাখায় কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র লাগাতার চাপের মাধ্যমেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে। এখানে আরও একটি প্রশ্ন :শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনে সম্মতি। এখানেও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভাষাসৈনিক, কবি, রবীন্দ্রগবেষক ও প্রাবন্ধিক