নারী শ্রমিক নয়, নিগ্রহ বন্ধ করুন

মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ড. তাসনিম সিদ্দিকী

বেশিরভাগ নারী অর্থনৈতিক কারণকেই তাদের অভিবাসনের প্রধান চালিকাশক্তি বলে মনে করেন। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ব্যবসায়িক ক্ষতি ইত্যাদি থেকে মুক্তি পেয়ে বেশি উপার্জন ও নিশ্চিত সচ্ছল জীবনের স্বপ্নই তাদের অভিবাসনের মূল কারণ। কিন্তু অনেকের সে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়, আবার অনেকেই ফেরেন তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে। অভিবাসী অনেক নারী নিয়মিত বেতন পান না, আবার অনেকে একেবারেই পান না। কাউকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়, কাউকে মানসিকভাবে হেয় করা হয়। এমনকি কেউ কেউ যৌন নির্যাতনেরও শিকার হন। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, যারা এসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের অনেকেই চাকরিদাতার বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ আবার দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন, দেশে ফেরার জন্য বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এসব কারণে  নারী অভিবাসী প্রেরণকারী কিছু দেশ তাদের নারী অভিবাসন সংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন করেছে। তারা হয় নারী গৃহকর্মী প্রেরণ একেবারেই নিষিদ্ধ করেছে অথবা কিছু দেশে গৃহকর্মী হিসেবে নারীর অভিবাসন কমিয়ে দিয়েছে।


দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নারী শ্রমিক পাঠানোয় নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০০৩ সালে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়। এটা প্রত্যাহার হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই নারী শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। প্রাথমিক অবস্থায় নারী শ্রমিকরা মূলত ওমান, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে সৌদি আরবে বিশেষভাবে নারী শ্রমিক গমনের সংখ্যা বেড়ে যায়। এর কারণ হলো- আগে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে নারী শ্রমিক সৌদি আরবে যেতেন। ওই সময় সেখানে ইন্দোনেশিয়ার একজন নারী শ্রমিককে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে এবং নেপালের শ্রমিকদের নির্যাতনের বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। তখন নেপাল নারী শ্রমিক প্রেরণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে এবং ইন্দোনেশিয়া একেবারেই বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী সময় অবশ্য পাঠানো শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের প্রেরণের বড় ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়। এটা এ কারণে হয় যে, পুরুষ শ্রমিক যাওয়ার ওপর সৌদি আরব সাত বছর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছিল। তখন সৌদি আরব নারী শ্রমিক প্রেরণের শর্তে পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার কথা জানায়। ২০০৩ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মোট অভিবাসীর ৫ শতাংশ ছিল নারী। কিন্তু ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট শ্রমিকের ১৮ শতাংশে দাঁড়ায় নারী শ্রমিকের সংখ্যা।

২০১৮ সালে মোট যত সংখ্যক শ্রমিক বিদেশে গেছেন তাদের ১২ শতাংশ ছিলেন নারী। এই নারীরা মূলত সৌদি আরবে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে নারী শ্রমিক বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হলো- যখন বাংলাদেশ সরকার ও এজেন্সিগুলো পুরুষের বাজার খোলার জন্য সৌদি আরবকে চাপ দেয়, তখন পুরুষের অনুপাতে নারী শ্রমিক গ্রহণের নীতি গ্রহণ করে। এই পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ে। আগেও নারী শ্রমিকরা নিগৃহীত হতেন; কিন্তু সৌদি আরবে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিগ্রহের সংখ্যাও বেড়েছে। গত তিন বছর থেকে ক্রমাগত বাড়ছেই। এই নিগ্রহ কমানোর জন্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই অবস্থায় নারী শ্রমিক পাঠানো ঠিক হচ্ছে না, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পাঠানো হোক। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একটি বিষয়ে একমত ছিলেন তা হচ্ছে, নারী শ্রমিক প্রেরণ বন্ধ না করে বরং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কারণ প্রেরণ বন্ধ হলে অবৈধ অভিবাসন বেড়ে যাবে। তখন নিগ্রহের মাত্রাও বেড়ে যাবে। তাই সরকারকে নিরাপত্তার জায়গাগুলো আরও জোরদার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। আমরা এখনও সেই জায়গায় আছি, আমরা চাই নারী শ্রমিক যেতে থাকুক, একই সঙ্গে অব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হোক।

আমরা এসব খুঁজতে গিয়ে যে বিষয়গুলো পেয়েছি তা হলো- একেবারেই অশিক্ষিত ও অদক্ষ কিছু নারীকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। তারা সেখানে গিয়ে নিজেদের করণীয় ও নিরাপত্তাসহ অন্য বিষয়গুলো বুঝতে পারছেন না। তাই সেখানে সেফহোম বাড়ানো দরকার। সেখানে নারী শ্রমিকদের ফোন রাখতে দেওয়া হচ্ছে না, এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ফোন রাখতে না দিলে নারী শ্রমিক পাঠানো হবে না- এ ধরনের বার্তা পৌঁছানো দরকার। ওই জায়গায় প্রতি মাসে একবার হলেও নারী শ্রমিকদের কথা শোনা উচিত। এ জন্য প্রবাসীদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তাদেরকে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ধরনের কোনো কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।

এক গবেষণায় দেখা যায়, নারী শ্রমিকদের মধ্যে যারা সৌদির শহর অঞ্চলে থাকেন, তারা কম নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাচ্ছেন, তারা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কারণ ওই সব এলাকার মানুষজন তাঁবু থেকে ঘরে উঠলেও এখনও মূলধারার সমাজব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে। তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা বা চিন্তা নেই। তারা মানবাধিকার বা মানবিকতার চর্চা থেকেও দূরে। তারা যখন এই শ্রমিকদের নিয়ে যাচ্ছেন তখন মনে করছেন, তাদেরকে কিনে এনেছেন। তারা নারীদের দাসীর মতো ব্যবহার করছেন। সৌদি আরবে নারী শ্রমিকের চাহিদা আছে; কিন্তু এত সংখ্যক শ্রমিকের চাহিদা সেখানে নেই। আমাদের সেখানে বুঝে-শুনে শ্রমিক পাঠাতে হবে। সরকারের উচিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে শ্রমিক না পাঠানো। দ্বিতীয় যে ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বিদেশে যাওয়ার জন্য নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া হবে না, বরং তারা যেখানে কাজ করবেন, সেখান থেকে এজেন্সিকে আড়াই হাজার ডলার করে দেওয়া হবে, যাতে তারা নারী শ্রমিকদের সে দেশের ভাষা ও কাজের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলে। যেন তারা বাজারে যেতে পারে, হিসাব রাখতে পারে। কিন্তু যা হচ্ছে তা হলো- এজেন্সিগুলো টাকাটা নিচ্ছে কিন্তু ওই ধরনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না। এরপর সেখানে গিয়ে যখন নারীরা বেতন চাচ্ছেন তখন বলা হচ্ছে, তোমাকে তো আড়াই হাজার ডলার দিয়ে একবারেই কিনে নিয়েছি। তোমাকে তো আর বেতন দেওয়া হবে না। তোমাকে এখানে বিনা বেতনে দুই বছর কাজ করতে হবে।

এখানে একটি বড় সমস্যা বিদ্যমান। এ কাজটি এই উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল যেন নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; কিন্তু এজেন্সিগুলো তার সামান্য ব্যয় করে পুরো অংশ মুনাফা হিসেবে রেখে দিয়েছে বা দিচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে অ্যাম্বাসিকে পরিস্কারভাবে নীতিমালা জানিয়ে দেওয়া দরকার। এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে যখন কোনো ভিসা প্রস্তুত হয়, তখন তাদেরকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া যে, এই আড়াই হাজার ডলার দেওয়া হয়েছে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য, এটা তার বেতন নয়। এই বিষয়গুলো সুরাহা করেই পাঠানো দরকার। এজেন্সিগুলো ওই দেশে গিয়ে ভালো ভালো কর্মসংস্থানদাতাদের সঙ্গে কথা বলে ভিসা সংগ্রহ করছে না। ভিসা সংগ্রহ হচ্ছে ওই দেশে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে। যারা কোনো বিচার-বিবেচনা না করে ভিসা সংগ্রহ করছে এবং সেই ভিসাগুলো প্রস্তুত করছে আমাদের দেশের এজেন্সিগুলো। এই এজেন্সিগুলোর অনেকেই মধ্যস্বত্বভোগীদের সঙ্গে মিশে আছে।

এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দূর না করলে এ ধরনের নির্যাতনের হাত থেকে নারী শ্রমিকদের বাঁচানো কঠিন হবে। ওই মধ্যস্বত্বভোগীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ধরা সহজ। যে নারী নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরেছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে তারা কোন কোন এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েছিলেন এবং ওই এজেন্সিগুলো যাদের থেকে ভিসা সংগ্রহ করেছিল তাদেরকে নিষিদ্ধ করা দরকার। এই জায়গায় আমাদের যেতে হবে। আমরা কোনো অবস্থাতেই নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করতে চাই না; কিন্তু এই অন্যায় দমাতে চাই। যারা সৌদি আরবে যাচ্ছেন তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখা যাচ্ছে না। এ জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হয়ে ওই সব এলাকায় ছোট ছোট কিছু গ্রুপ করে দেওয়া দরকার, যারা নারী শ্রমিকদের খোঁজখবর রাখবে।

আরেকটি দিক হচ্ছে, গৃহকর্মী হিসেবে নারী শ্রমিক প্রেরণের জায়গায় এ ধরনের বেশি ঘটনা ঘটছে। আমরা কেন এখন কেয়ার গিভার বা নার্স তৈরির দিকে বা গার্মেন্টের দিকে যাচ্ছি না? কেয়ার গিভার হিসেবে গেলে কিন্তু অন্যায়ের সুযোগ কম। এ জন্য দেশের নার্সিং শিক্ষাকে জোরদার করা দরকার। সরকার যথেষ্ট ভালো উদ্যোগ নিচ্ছে, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যারা নির্যাতিত হয়ে ফেরত আসছে, সরকার তাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে। তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহায়তারও প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যাতে তারা সেই অর্থে কিছু করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। কিন্তু ওই দেশেও সরকারের সেবা বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে হবে। কেউ কোনো সমস্যায় পড়লে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)
[email protected]