ঘুরে দাঁড়ানোই ভরসা

রাষ্ট্র ও সমাজ

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শিল্প-সাহিত্যের চর্চা কখনোই নিরুপদ্রব ছিল না, এখনও নেই। আমরা বাংলাভাষীরা নানা ধরনের বিপদ-আপদের মধ্যে থাকি। অন্যরা তাদের ভাষা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। বাংলা বানানে অন্যায় হস্তক্ষেপ ঘটে যায়, এমনকি বাঙালি শব্দের বানানের বহুকালের ' ী' কারকে হ্রস্ব করে 'ি ' কার তার বিজয় নিশান ওড়াতে চায়। আমাদের গ্যাস-তেল বন্দর-বিদ্যুৎ অন্যরা লুণ্ঠন করে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। সমুদ্রে পানির উচ্চতা ফুঁসে ওঠে; আমাদের এই অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ বলে খবর আসে। এর মধ্যে আবার এক ভয়ংকর নতুন বিপদের আভাস দেখা যাচ্ছে; ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশের ওপর প্রবহমান আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিপ্রবাহ পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছে। তিস্তার পানি বণ্টনের সুরাহা না করে ফেনী নদীর পানি নিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের পাশাপাশি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার অজুহাতে আমাদের বন্দর দুটিতে রাডার স্থাপন করে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত এঁটেছে। সবটাই সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের সঙ্গে একতরফা সমঝোতা চুক্তির বদৌলতে। এই অমানবিক চেষ্টার পেছনে তৎপর রয়েছে ভারতের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার। আমরা যাই কোথায়?

পানির অপর নাম যে জীবন সেটা বাঙালির জন্য যতটা সত্য, অনেকের জন্যই ততটা সত্য নয়। বাঙালির স্থলভূমি যেমন, মনোভূমিও তেমনি নদীনির্ভর। নদী না থাকলে এই ভূমির নিজস্বতা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, মাছ সবার পক্ষেই বেঁচে থাকা তো অবশ্যই; টিকে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। বাংলার অর্থনীতিতে খাদ্যে বাসস্থানে যেমন বাঙালির কল্পনা অনুভূতি চিন্তাভাবনায় আচার-আচরণেও, তেমনি নদী যেভাবে রয়েছে সেভাবে অন্য কিছুই নেই। বাঙালির জীবনযাপন ও সংস্কৃতির প্রতিটি এলাকায় নদী প্রবহমান, সেই নদী ধ্বংসের তৎপরতা সফল হলে বাঙালি বদলে যাবে। রাজনৈতিক দ্বিখণ্ডীকরণে যে অনিষ্ট হয়েছে তা চূড়ান্ত রূপ নেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। এই মারাত্মক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ অবশ্যই রুখে দাঁড়াবে, পশ্চিমবঙ্গের মানুষদেরও পিছিয়ে থাকার কথা নয়। ফারাক্কা বাঁধ পশ্চিমবঙ্গের উপকার করেনি, অপকার ঘটিয়েছে অপূরণীয়। এখন পানি ও আমাদের সার্বভৌমত্বের যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে তার তুলনায় ফারাক্কা তো কিছুই নয়। নদী প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তাই কেবল স্থানীয় হবে না, তাকে হতে হবে সেই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক। শুধু পশ্চিমবঙ্গের বলে নয়, ভারতের বিবেকবান মানুষরাও এমন হীন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে ধ্বনি তুলবেন বলে ভরসা করি।

বিপন্ন আমরা বিশ্বায়নের আগ্রাসনের কারণেও। ওই হাঙরের ভয়ংকর গ্রাস বিশ্বব্যাপী দরিদ্র দেশ ও দরিদ্র মানুষের সব আশা-ভরসাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। শিল্প তার উদরে চলে গেছে, কৃষিকেও সে বাদ দিচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো দেশের পণ্য বিশ্ববাজারে যাবে এটা প্রায় অসম্ভব; কিন্তু আমাদের ওপর অসম্ভব জোরালো চাপ রয়েছে বাংলাদেশের বাজারকে ধনী দেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার। ধনী দেশগুলো নিজেদের দেশে কৃষিতে ভর্তুকি দেয়, ক্ষেত্রবিশেষে রপ্তানি মূল্যকে উৎপাদন মূল্যের এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনতেও দ্বিধা করে না; কিন্তু তারা গোঁ ধরে বসে থাকে গরিব দেশগুলো নিজেদের দেশে কৃষিতে ভর্তুকি দিতে পারবে না, দিলে শাস্তি পাবে। গরিব দেশগুলো শিল্পে অনগ্রসর, তাদের নির্ভরতা কৃষির ওপর; বিশ্বায়ন সেই কৃষিকেও বাঁচতে দেবে না। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সারাবিশ্বে প্রতিবাদ উঠছে, প্রতিরোধ সংগঠিত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অধিবেশন তাই ধনী দেশগুলোর আজ্ঞামতো চলছে না। সংস্থার অধিবেশন অনেক দেশেই বাদ-প্রতিবাদের, ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে পড়ছে। আন্তর্জাতিক এই প্রতিরোধে বাংলাদেশকেও যোগ দিতে হবে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অস্থির রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভর করলে চলবে না, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে।

কানকুনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সভা চলাকালে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কৃষি খামারের মালিক লি কিয়ং হেই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ মহল থেকে বলার চেষ্টা হয়েছিল, লি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তা ছিলেন বৈকি, নইলে প্রাণ দিতে যাবেন কেন। তবে তিনি একা নন, বিশ্বায়নের লোলুপতার দরুন গরিব বিশ্বের সর্বত্রই কৃষক আজ দিশেহারা, তাদের সবারই মানসিক ভারসাম্য বিপন্ন। লি কিয়ং হেই একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে পৈতৃক কৃষি খামারে ফিরে এসে তিনি সেখানে উন্নত পদ্ধতিতে কৃষিকাজ শুরু করেন। জার্মানি থেকে বিশেষজ্ঞ এনেছিলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছিলেন কৃষিকাজে। দৃষ্টান্ত ও পরামর্শদাতা হয়ে উঠেছিলেন অন্যান্য কৃষিজীবীর কাছে। শুধু তাই নয়, ১৯৮৭তে তিনি কৃষক ফেডারেশন গঠন করেন। ১৯৮৮তে কৃষি নেতৃত্বের জন্য জাতিসংঘ পুরস্কার পান। অবাধ বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে ৩০ বার তিনি অনশন করেছেন। শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিলেন। লির এই আত্মদান বিশ্বের কোটি কোটি কৃষকের বিপন্ন দশারই উন্মোচন। সেই সঙ্গে আবার তা প্রতিরোধের স্মারকচিহ্নও বটে। লি মারা যাননি, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়েছেন; ধিক্কার জানিয়ে গেছেন বিশ্বায়নকে এবং আহ্বান জানিয়ে  গেছেন প্রতিরোধের। ওই রুখে দাঁড়ানোই বিশ্বের জন্য ভরসা। আন্দোলন ভিন্ন বাঁচার আশা বৃথা। সে আন্দোলন নদীর পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে যেমন  হবে, তেমনি হতে হবে বিশ্বায়নের লোলুপতার বিরুদ্ধেও।

দুই.

তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এই যে, পৃথিবীতে ধন-সম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র যত বাড়ছে, মানুষের নিরাপত্তা ততই কমে আসছে। এর কারণ অবশ্য মোটেই অস্পষ্ট নয়। সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে লুণ্ঠনকারীদের হাতে এবং ওই লুণ্ঠনকারীরা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে লুণ্ঠনের পরিমাণ বৃদ্ধির কাজে। এটা বিশ্বজুড়ে যেমন ঘটছে, ঘটছে তেমনি আমাদের দেশেও। এখানে জীবনের নিরাপত্তা কম, জীবিকার নিরাপত্তা আরও অল্প। সন্ত্রাসীরা বিশ্বময় দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে, সবচেয়ে সন্ত্রাসী যে রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র- সে রাষ্ট্রই দায়িত্ব নিয়েছে সন্ত্রাস দমনের। ফলে মানুষের বিপদ কমবে কি, উল্টো বাড়ছে। বাংলাদেশেও সন্ত্রাসের সঙ্গে শাসক শ্রেণির যোগাযোগ যে অত্যন্ত প্রত্যক্ষ, এ সত্য শাসক শ্রেণির লোকেরা এখন নিজেরাও অস্বীকার করতে পারছে না। এরই মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাও চলছে। সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ যে শিল্প-সংস্কৃতির মিত্র নয়, তার নাটকীয় উন্মোচন ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একেবারে শুরু থেকেই। সভ্যতাকে তো বটেই, মনুষ্যত্বকে বাঁচানোর প্রয়োজনেই আজ সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদবিরোধিতা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ তা করছেও। পৃথিবীজুড়ে আজ ওই বিরোধিতার প্রচেষ্টা চলছে। পুঁজিবাদ নানা ধরনের আচ্ছাদন ও মোহ তৈরিতে অভ্যস্ত। উদ্দেশ্য মানুষকে আবিষ্ট ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন করে রাখা। বিভ্রান্তির সৃষ্টি দার্শনিকভাবেও চলে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে তারা উপস্থিত করতে চায় সভ্যতার সঙ্গে সভ্যতার সংঘর্ষ বলে।

পুঁজিবাদের অনুসারীরা উত্তর-আধুনিকতার তত্ত্বও প্রচার করেছিল। ওই মতবাদের মূল বক্তব্যটা হলো এই রকমের, সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতার জন্য অসংখ্য লড়াই চলছে। নারী লড়ছে পুরুষের বিরুদ্ধে, স্থানীয়রা দ্বন্দ্বে লিপ্ত অস্থানীয়দের সঙ্গে; ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ চলছে পরিবারে, বিদ্যালয়ে, হাসপাতালে, জেলখানায়, এমনকি পাগলা গারদেও। কলকারখানায় তো অবশ্যই। এই যে অসংখ্য লড়াই এদের প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। এরা যে গুরুত্বপূর্ণ তা তো সবাই জানে; কিন্তু এসব দ্বন্দ্ব বড় দ্বন্দ্বকে যে নাকচ করে দেয় না, সেটাও তো সত্য। পুঁজিবাদ আছে, আছে সাম্রাজ্যবাদ, তাদের অবজ্ঞা করে, তাদের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত না হয়ে বিক্ষিপ্ত দ্বন্দ্বে ব্যস্ত থাকলে সুবিধা যা হওয়ার তা হবে পুঁজিবাদেরই। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়ায় মার্কিনি আগ্রাসন উত্তর-আধুনিকতার এই তত্ত্বেরও পতন ঘটিয়েছে; প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বে মানুষের প্রধান দ্বন্দ্ব পুঁজিবাদ ও তার রাজনৈতিক প্রকাশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গেই; অন্য দ্বন্দ্বগুলো অবশ্যই মিথ্যা নয়; কিন্তু তাদের প্রধান করে তোলার অর্থ মূল দ্বন্দ্বকে অস্পষ্ট করে দেওয়া ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

এনজিওরা যে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ও বিক্ষিপ্ত ক্ষমতায়নের কথা বলে তার দার্শনিক ভিত্তি হচ্ছে, এই উত্তর-আধুনিকতা। আজ জাতিসংঘ নিজেও একটি বৃহৎ এনজিওতে পরিণত হয়েছে; কেননা সে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ভুলে পুনর্বাসন, পুনর্গঠন, ক্ষমতায়ন, সাহায্যদান ইত্যাদিকে মুখ্য করে তুলছে। এরই মধ্যে আশা ও ভরসার দিকটা এই যে, বিশ্বব্যাপী মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। সচেতন মানুষ স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই সংগঠিত হতে চাচ্ছে, উদ্যোগ নিচ্ছে- আশা ও ভরসাই এখন মূল শক্তি।

লেখক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক