বাংলাদেশ-ভারত অংশীদারিত্বে চীন ফ্যাক্টর

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম আমার অন্যতম প্রিয় কলাম লেখক ও টিভি আলোচক। তিনি নানা জটিল আর্থ-সামাজিক বিষয় সহজ করে উপস্থাপন করেন। টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তার অকপট সত্য ও রসাত্মক মন্তব্য আমি উপভোগ করি। গত ২২ নভেম্বর সমকালে প্রকাশিত 'নরেন্দ্র মোদি নন আইকে গুজরাল' শীর্ষক তার কলামটি আমি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। তার কলামে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩-৬ অক্টোবরের ভারত সফরের নিরিখে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হলেই কিছু রাজনৈতিক দল যে 'দেশ বিক্রয়'-এর ধোয়া তোলেন; তিনি যথার্থভাবেই তা নাকচ করে দিয়েছেন। কিছু বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন, যেগুলো দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য বাধা হয়ে আছে। অধ্যাপক ইসলাম সতর্ক করে বলেছেন, "বাংলাদেশের নীতি-প্রণেতাদের খুবই সাবধানতার সঙ্গে ভারতের 'আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী' মনোভাব মোকাবিলা করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।" তিনি আরও বলেছেন, নরেন্দ্র মোদিকে যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে; তারপরও বাংলাদেশের মানুষের ধারণা হলো, আমরা এমন ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি করছি, যিনি মুসলিম নিধনের সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মোদি সরকারকে বাংলাদেশের মতো ভারতের হিতাকাঙ্ক্ষী দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে আরও উদার হওয়া উচিত ছিল, অথচ কি-না বিজেপি সভাপতি ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কথায় কথায় যেভাবে ভিত্তিহীনভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের কথা বলে তাদের বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন, সেটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে চিড় ধরানোর জন্য যথেষ্ট।

শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরে আমি আমার কিছু মতামত উল্লেখ করতে চাই। সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ যে অসদাচরণ প্রদর্শন করছে, এ ব্যাপারে আমি তার সঙ্গে একমত। ভারতের উচ্চপর্যায়ে দায়িত্বশীল তথা স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে সীমান্তে প্রাণঘাতী হামলা পরিচালনা হবে না- এ মর্মে বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও বিএসএফের গুলিতে সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে। যেখানে প্রায়শ সীমান্তে নিহত ব্যক্তির বুকে সরাসরি বুলেটবিদ্ধ হয়, সেখানে এ ধরনের মৃত্যুকে 'হত্যা' ছাড়া আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? বস্তুত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে তিক্ততায় সীমান্ত হত্যা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি অধ্যাপক মইনুল ইসলামের সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত যে, গরু চোরাচালান সীমান্ত হত্যার সবচেয়ে বড় কারণ।

গরু চোরাচালানে দুই দেশেরই কিছু লোকের স্বার্থ জড়িত। এমনকি দুঃখজনক হলেও দুই পাড়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও এর সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে। তবে ভারতের বিজেপি বাংলাদেশে গরু চোরাচালান বন্ধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তাতে লাভ হয়েছে আমাদেরই। বাংলাদেশে এখন অধিক সংখ্যক মানুষ দুগ্ধ উৎপাদন ও পশুপালনে নিয়োজিত হয়েছে। আশা করা যায়, কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করব।

অধ্যাপক মইনুল ইসলাম তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতা গ্রহণের পরই বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার এ চার দেশের আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তিকে (বিমসটেক) 'ঠান্ডাঘরে' পাঠিয়েছেন। আবার ২০১৩ সালে চীন যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) চালু করেছে, বাংলাদেশ তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, অথচ এখানে ভারত নেই। আবার ভারত তার 'লুক ইস্ট পলিসি'র ফলে একটি সড়ক সংযোগের পরিকল্পনা করছে, যেটা ভারত হয়ে মিয়ানমার ও তারপর থাইল্যান্ড যাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সড়ক নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যাবে।


আমি অধ্যাপক মইনুলের সঙ্গে একমত যে, অধিকাংশ বাংলাদেশিই তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির অগ্রগতি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভারতের তরফ থেকে মিয়ানমারকে চাপ সৃষ্টি বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছে, সেটা দেখতে চেয়েছিল। আমরা জানি, ২০১১ সাল থেকেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি তৈরি হয়ে আছে, অথচ ভারতে পুনঃপুন আশ্বাসের পরও আজও সেটি স্বাক্ষরিত হয়নি। রোহিঙ্গা বিষয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উদ্যোগকে ভারত সমর্থন দেয়নি। রোহিঙ্গা যেখানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা, সেখানে শরণার্থীদের কিছু ত্রাণ দেওয়া ছাড়া এ সংকট নিরসনে ভারত কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। তবে তিস্তা ছাড়াও ছয়টি অভিন্ন নদীর (মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা, দুধকুমার) পানি কীভাবে ভাগাভাগি করা যায়, অবিলম্বে তার একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করতে দুই নেতা যৌথ নদী কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম নেয় তা হলো, ফেনী নদীর পানি। সফরে একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় বলা হয়, ফেনী নদীর ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করতে পারবে ভারত। অনেক সমালোচক এ পানির পরিমাণই বুঝতে পারেননি। আমরা জানি, ঢাকা ওয়াসার একটি গভীর নলকূপ থেকে ২-৩ কিউসেক পানি উত্তোলিত হয়। অধ্যাপক মইনুলের সঙ্গে আমি একমত যে, শুস্ক মৌসুমেও যদি ফেনী নদী থেকে ভারত ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলন করে, তাতে তেমন সমস্যা হবে না। তবে চুক্তির বাইরে ভারত অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করে কিনা, সেটা মনিটরিং করতে হবে।

উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সন্ত্রাসবাদকে উভয় দেশ ও অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে গুরুতর হুমকিগুলোর একটি হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রীদ্বয় সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে তাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার কথা পুনরুল্লেখ করেন। চরমপন্থি ও মৌলবাদী দল, সন্ত্রাসী, চোরাচালানকারী, জাল নোটের চোরাচালানকারী এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা উভয় দেশের যৌথ অগ্রাধিকারের বিষয়টিও বিবৃতিতে এসেছে। সীমান্তে জিরো টলারেন্স ঘোষণার কথাও বিবৃতিতে রয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে সাতটি প্যারাগ্রাফে দু'দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়। এটা বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ গত বছরে ভারতে এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং তা আরও বাড়ছে।

প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বিষয়ে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে তিনটি বিষয় উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে প্রদত্ত ভারতের ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে উভয় নেতা সম্মতি জ্ঞাপন করেন, যা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমানে বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট চার বিলিয়ন ডলার এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এই বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয় বিদেশ থেকে অস্ত্র আমদানিতে। প্রতিরক্ষা সামগ্রীর ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয় চীন থেকে। বাকিগুলো রাশিয়া, ইউক্রেন ও পশ্চিমা দেশ থেকে। ভারত চাইছে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবসায় অংশীদার হতে। এটা কেবল লাভজনক ব্যবসার জন্য নয়, বরং এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে চীনের প্রভাব কমিয়ে আনতে। চীনের সাবমেরিন কেনায় বাংলাদেশের প্রতি বিরূপ মনোভাবমূলক আচরণ দুটি কারণে। প্রথমত, যেখানে ভারত আধুনিক প্রযুক্তির সাবমেরিন তৈরি করছে, সেখানে ভারত থেকে কেনা হলো না। দ্বিতীয়ত, ভারত বঙ্গোপসাগরে চীনের অবাধ বিচরণ দেখতে চায় না। ঠিক এই কারণে ভারত সম্প্রতি মিয়ানমারের কাছে সাবমেরিন বিক্রি করেছে। বাংলাদেশের সাবমেরিন দুটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন, যদিও এদের ডিজাইন সেই ষাটের দশকের। তার পরও চীনারা সেটা বছরের পর বছর আধুনিকীকরণ করেছে। চীনের সহায়তায় মহেশখালীর কাছে সাবমেরিন ঘাঁটি স্থাপনে বাংলাদেশের পরিকল্পনায়ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে নিরাপত্তার জন্য রাডার স্থাপনের বিষয়টি এসেছে যৌথ বিবৃতিতে। বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে নিবিড় নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ। কিন্তু কীভাবে রাডার স্থাপন ও পরিচালনা হবে, তা যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট নয়। আমি মনে করি, উপকূলীয় সীমান্ত রক্ষায় রাডার বা অন্য যে কোনো ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন হতে হবে। তথ্যের আদান-প্রদান অবশ্যই হতে পারে, ঠিক যেমনটি বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে হয়ে থাকে।

আসামে এনআরসির পর ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এনআরসির কথা শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে বাংলাদেশে অসন্তোষ রয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতৃত্ব বারবার বলে আসছে, বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ এমনকি কোটি কোটি বাংলাদেশি ভারতে প্রবেশ করেছে; এবার তাদের বের করে দেওয়া হবে। যদিও ভারত সরকার এ নিশ্চয়তা দিয়েছে- কাউকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না, তারপরও কিন্তু আতঙ্ক যায়নি। ভারতে যে কোনো মুসলিমবিরোধী ঘটনা বা পদক্ষেপ শুধু দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেই ব্যাঘাত ঘটায় না; একই সঙ্গে বাংলাদেশের হিন্দুদের মধ্যেও দুর্ভাবনার কারণ হয়। উভয় দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ সমাজের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক সম্প্র্রীতি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের উগ্র আচরণে আমাদের জন্য সে পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যেহেতু প্রতিবেশী দুটি দেশ একই সঙ্গে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে, সেহেতু আমাদের একান্ত প্রত্যাশা, দু'দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এমন কিছু যাতে না ঘটে।

নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক