বিতর্কিত নাগরিক আইনের বিপদ ও বিভ্রান্তি

দক্ষিণ এশিয়া

প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

সম্প্রতি ভারতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর থেকে দেশটির উত্তর-পূর্বের প্রদেশগুলোতে বিক্ষোভ চলছে। এর ফলে বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই কোটি মানুষের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা অমূলক নয়। ভারত সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দেশটিতে বসবাসরত কথিত বিদেশিদের জন্য ইতিপূর্বে বাংলাদেশকে দায়ী করা হয়েছে। ভারতের বর্তমান সরকারে থাকা (ভারতীয় জনতা পার্টি) বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আসামে এনআরসি ও ভারতীয় নাগরিকত্ব বিল সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা বলেছিল, অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করা বিদেশিদের চিহ্নিত করতেই তারা নাগরিকত্ব বিল সংশোধন করবে। তবে বিদেশি বললেও প্রকৃতপক্ষে কথিত বাংলাদেশি মুসলমানদের চিহ্নিত করে ভারত থেকে বের করে দেওয়াই বিজেপির মূল উদ্দেশ্য। ইতিপূর্বে তারা আশঙ্কা করেছিল, আসামে বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশের ফলে সেখানকার অহমিয় বাসিন্দারা চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। এমন এক সময় আসবে, যখন তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। এ জন্য তারা এনআরসি করার উদ্যোগ নেয়।

প্রথমে বিজেপি দাবি করেছিল, আসামে কোটি কোটি বাংলাদেশি মুসলমান অবৈধভাবে অবস্থান করছে। পরে এনআরসির ফলাফলে দেখা যায়, সেখানে (তাদের ভাষায়) অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। যার মধ্যে ১২ লাখ বাঙালি হিন্দু। এই ২০ লাখ মানুষের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যকই এনআরসিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেননি। সেখানে বলা হয়েছিল, ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর পূর্ব থেকে যারা ভারতে বসবাস করছেন- তার প্রমাণ দেখাতে পারলে এনআরসির অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বাদ পড়াদের মধ্যে অনেকেই সেখানে যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। এমনকি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি আলী আহমেদের পরিবার, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যের পরিবার ও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সৈনিকও এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত হননি। বিজেপি যাদেরকে বের করে দেওয়ার জন্য এনআরসি করেছে এবং যাদের সংখ্যা কোটি বলে দাবি করেছে; এনআরসির ফলে দেখা যায়, সেই বাঙালি মুসলমানরা সংখ্যায় মাত্র দুই লাখ; যারা ১৯৪৭-এর আগে থেকেই সেখানে বসবাস করে আসছেন। এমনকি ১৯ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে আসামের পতিত জমি চাষাবাদের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে তারা পূর্ব বাংলা থেকে সেখানে যান। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দুও ছিলেন। সুতরাং, তারা প্রায় শতাব্দী ধরে সেখানে বসবাস করছেন। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশিরা ভারতে প্রবেশ করেছে বলে বিজেপি যে দাবি করে আসছে, তা কোনোভাবেই সঠিক নয়।

এনআরসির ফলাফল পক্ষে না যাওয়ায় বিজেপি নিজেই তা মানছে না। তারা নতুন করে এনআরসি করার কথা বলছে। তারা মুসলমানদের নাগরিকত্ব হনন না করা পর্যন্ত এনআরসির মতো কার্যক্রম চালাবে- এটা স্পষ্ট। এরই অংশ হিসেবে বিজেপি নাগরিকত্ব বিল সংশোধন করে নতুন আইন পাস করল। যে আইনে ২০১৪ সালের পর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশ করা অমুসলিমদের অত্যাচারিত হিসেবে বিবেচনা করে নাগরিকত্ব প্রদানের কথা বলা হয়েছে। বিজেপির মূল লক্ষ্য বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তান নয়। কারণ পাকিস্তানে অনেক আগে থেকেই হিন্দু প্রায় নেই। আর তালেবানের উত্থানের পর আফগানিস্তানের শিখ ও হিন্দুরাও সেই সময়েই দেশটি ত্যাগ করে। বিজেপি মূলত বাঙালি ও মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে। এর ফলে সারা ভারতে বসবাসরত মুসলমান, বাঙালি ও অসমিয়দের মধ্যে অসন্তুষ্টি বিরাজ করছে। বিজেপির এসব উদ্যোগ দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতা ও শাসনতন্ত্রের জন্য হুমকি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ভারত পাকিস্তান-আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে এক কাতারে শামিল করল। অথচ বাংলাদেশ এই ডিসেম্বর মাসেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

সম্প্রতি ভারতের গোয়েন্দাপ্রধান সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানিয়েছেন, তিন দেশ থেকে আসা অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা ৩১ হাজার। অথচ তারা এটাকে কয়েক কোটি বলে দীর্ঘদিন থেকে দাবি করে এসেছে। পরে এনআরসি করেছে। সেখানে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ; আর এখন সেটা ৩১ হাজার। অথচ এই এনআরসির জন্য তারা কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। সামনে ভারতের সাধারণ নির্বাচন। দেশটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে, কর্মসংস্থানের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েও বিজেপি সরকার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারছে না। এমতাবস্থায় নির্বাচনে জিততে বিজেপি সরকার ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনকে ব্যবহার করছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অবশ্য বরাবরই বলে চলেছেন, এসব বিষয় ভারতের অভ্যন্তরীণ। রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করা হবে। এতে বাংলাদেশের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলেও একাধিকবার আশ্বস্ত করেছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, নাগরিত্ব আইন নিয়ে আসামের নাগরিকদের উদ্বেগের কিছু নেই। তিনি আসামের নাগরিক বলতে মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বুঝিয়েছেন। বিজেপিপ্রধান ও দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপির অন্য নেতারা বরাবরই বাংলাদেশকে দোষারোপ করে চলেছেন। তাদের এই দোষারোপ বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। এই বিল পাস হওয়ার পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বা ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করছে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয় :এক. ভারতে হিন্দু উগ্রবাদ বেড়ে যাবে। দুই. এর ফলে বাংলদেশে উগ্রবাদীদের দ্বারা সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাদের জমিজমার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভারতে এই আইন পাসের পর উদ্বেগে পড়েছেন বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।

ভারতের সংসদে অমিত শাহ বলেছেন, ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর সংখ্যা ছিল ২৩ শতাংশ। বর্তমানে তা ৯ শতাংশ। তিনি এ রকম একটি ভুল চিত্র বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন। তিনি ভুলে গেছেন যে, ১৯৪৭ সালে অনেক মুসলমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার ও ওড়িশা থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। আবার অনেক হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। সে সময় সম্পত্তি বদল করার নিয়ম ছিল। যাদের পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলাদেশে সম্পদ ছিল এবং পরিবারও দুই দেশে ছিল এ রকম অসংখ্য হিন্দু ভারতে চলে গেছেন। বিশেষ করে অনেক শিক্ষিত শ্রেণির হিন্দু বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিল। ওই সময়েই একদিকে ভারত থেকে কিছু সংখ্যক মুসলমান বাংলাদেশে এসেছেন, অন্যদিকে কিছু সংখ্যক হিন্দু ভারতে গেছেন। এর ফলেই মূলত বাংলাদেশে সংখ্যালঘু কমে এসেছে। ওই সময় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশে কোনো দাঙ্গার ঘটনা ঘটেনি, যেমনটি ঘটেছিল পাঞ্জাবে।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই রোল মডেল। বর্তমানে এই সম্পর্ক আরও সুদৃঢ়। তবে ভারতে চলমান উত্তেজনা ও উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ১৯৪৭ সালে যে দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ভারত বিভক্ত হয়েছিল; ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই তত্ত্বকে অনেকখানি দুর্বল করে তুলেছিল। বিজেপি সরকার আবার সেই বিষয়কেই সামনে নিয়ে এলো। তাদের এই আইন সেখানকার আন্তঃসংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ। ইতোমধ্যে ভারতের এই আইন সংশোধনীর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘ বলেছে, মুসলমানদের বাদ দেওয়ার এ আইন মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক। এ আইন অবশ্যই আন্তর্জাতিক বিপত্তির সম্মুখীন হবে।

এখন বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। এ উদ্বেগ যাতে প্রকট না হয়, সে জন্য ভারতকে জানিয়ে দেওয়া দরকার- তাদের অভ্যন্তরীণ কোনো পদক্ষেপের প্রভাব যেন বাংলাদেশের ওপর না পড়ে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি যাতে বিনষ্ট না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সংখ্যালঘুদের সঙ্গে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। ভারত থেকে কেউ যাতে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। সীমান্তে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর
ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক