একসময় 'এক দেশে সমাজতন্ত্র' নিয়ে বহু বিতর্কের ঢল বয়ে গেছে, সেসব এখন পুরোনো ইতিহাস। তবে এক দেশে একটি কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে সম্ভবত বিতর্কের অবকাশ ছিল না। এর ন্যায্যতা নিয়েও গল্প চালু আছে রাজনৈতিক নেতাবিশেষের পক্ষে। রাশিয়া বা চীনের পার্টির কথা যদি বাদও দিই, ভারতীয় উপমহাদেশে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রথম পর্বে সাংগঠনিক প্রকাশ সেখানকার তিন প্রধান শহর থেকে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত এই প্রকাশ একটি সংগঠন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে।

তবে মার্কস-অ্যাঙ্গেলসের মতাদর্শিক রচনাবলি এবং দু'জনের যৌথ উদ্যোগে রচিত ঘোষণাপত্রসুলভ 'কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো' (১৮৪৮) যে আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মধারার নয়া পথ রচনা করে বিশ্বে চমক জাগায়, তার মূল বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ ছিল না। বিতর্ক দেখা দিতে পারে দেশকালস্থানভেদে নীতি ও কৌশলগত ভিন্নতা নিয়ে। আর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট বিশ্বে বলশেভিক বিপ্লবের প্রেরণায় দেখাও দেয় একাধিক দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আপন বৈশিষ্ট্যে।

দুর্ভাগ্যই বলতে হবে, কমিউনিস্ট মতাদর্শের যে ষাটের দশকের মস্কো-চীন দ্বন্দ্ব নীতিগত দিক থেকে, যে প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনে-সংগঠনে বিভাজন, তা ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিকেও দ্বিভাজিত করে। এখানেই থেমে থাকেনি ভিন্নধারা; ভিন্ন মতবাদ ক্ষমতা দখলের নীতি ও কৌশলগত দিক নিয়ে। মোটা দাগে ত্রিধারা, যদিও এর মধ্যে এসইউসির খণ্ডিত অনুপ্রবেশ।

দুই.

কিন্তু কী হলো- ভারতে বিদেশি শাসনের অবসান ও ভারত বিভাগ, বঙ্গ বিভাগের ফলে যে পূর্ববঙ্গে-পূর্ব পাকিস্তানে একটি কমিউনিস্ট পার্টি উল্লিখিত প্রভাবে প্রথমে দ্বিভাজিত হয়ে পড়ে। সেই মস্কো-পিকিং দুই ঘরানা, শেষোক্ত ঘরানায় তারুণ্যের প্রাধান্য। বিস্ময়ের ঘটনা যে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিপরীতে প্রতিবাদে-আন্দোলনে ষাটের দশকের শেষার্ধে যথেষ্ট শক্তির প্রকাশ ঘটানো বামপন্থিরা, বিশেষ করে ছাত্র সমাজও বিভাজনের ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো।

তবে ছাত্র সমাজে যতটা, তার চেয়ে অনেক অনেক বিভাজন জাতীয় রাজনীতিতে, বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। ডজনেরও অধিক ছোট-বড় দল (এর মধ্যে ছোটর সংখ্যাই অধিক) কমিউনিস্ট নামের পরিবর্তে 'বাম ভুবন' তৈরি করেছে- মতাদর্শগত মিল-অমিল যেমনই হোক। যেহেতু তারা অনেক গ্রুপে বিভক্ত, তাই তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় চিহ্নিত করতে অনেক নাম খুঁজে বের করতে হয়েছে। এখন নতুন নাম পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বিভাজন প্রক্রিয়া তো চলমান।

একজন তরুণ মার্কসবাদী কর্মের তাগিদে যদি আন্তরিকতার সঙ্গেই বিভক্ত দল বা গ্রুপের কোনো সর্বোচ্চ নেতাকে বর্তমান বিভাজনের কারণ ও তাত্ত্বিক যথার্থতা সম্বন্ধে জানতে চান, তাহলে সাধারণত যে জবাব তিনি বা তারা পান, তাতে তাদের যুক্তি সায় পায় না। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্বের কারণ এখন অন্তর্হিত। মস্কোতে সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে কয়েক দশক হয়ে গেল। চীন শাসনে পার্টি কাঠামো ঠিক রেখেও পুঁজিবাদী অর্থনীতির পথ ধরেছে, বিশ্বের এক নম্বর শক্তিমানের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। লক্ষ্য প্রথম স্থানটি দখল।

দু'একটি রাষ্ট্র বাদে অন্যরাও একই পথে- বাজার অর্থনীতি তাদের গ্রাস করেছে। বাকিরা কতদিন নিজ ধারায় টিকে থাকবে, প্রথম প্রজন্মের নেতৃত্বের বিদায়ের পরিপ্রেক্ষিতে, তা বলা কঠিন। তাহলে বিভাজনটা কীসের ভিত্তিতে? নিজ নিজ রণনীতি ও রণকৌশলের ফারাক?

একটি দেশরাষ্ট্র, তার সমাজকাঠামো সুনির্দিষ্ট। তার অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতা মোটামুটি সুনির্দিষ্ট। সে ক্ষেত্রে সমাজবদল বা শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে নীতি ও কৌশলকে হাজারখানা হবে? অনুমাত্রিক প্রভেদ নিয়ে এই বিভাজন কোনো যুক্তিতে দাঁড়ায় না। যা দাঁড়ায় সে তথ্যটি বড় অপ্রিয়, না বলতে পারলেই ভালো হতো।

তবু মাঝেমধ্যে কিছু সংখ্যক তরুণের কৌতূহল ও প্রশ্নের তাগিদ মেটাতে গিয়ে বলতে হয়- বিভাজনের যুক্তিটা অসার, দলগত স্বার্থের, ক্ষমতার। এক গালিচায় কতজন পীরের জায়গা হতে পারে? কাজেই প্রয়োজন অনেক ক'টা গালিচার। ফলে অধিকাংশ দলই তৃণমূল স্তরে জনসমর্থনের ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক বামপন্থি দল বা গ্রুপ কেন জনসমর্থনের শক্তিমান ভিত তৈরি করতে পারছে না, মার্কসবাদী বিচার-বিশ্নেষণে তার জবাব মিলেছে কি?

আমাদের জানা নেই, বামপন্থিদের মধ্যকার অন্তত বিশিষ্ট কয়েকটি দল সে আত্মসমালোচনামূলক বিশ্নেষণে কতটা সময় দিয়েছে। দিয়ে থাকলে সমস্যা থেকে উত্তরণের কোনো পথ পেয়েছে কিনা এবং পেয়ে থাকলে সে পথ ধরে কর্মসূচি প্রণয়নে ও জনভিত্তি তৈরিতে কতদূর এগিয়েছে। সাদামাটা নিরীক্ষায় যা দৃশ্যমান তা হলো, একক দল হিসেবে জনসমর্থনের ভিত রচনায় কি কৃষক-সমাজে, কি শ্রমিকশ্রেণিতে, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আর সংসদীয় রাজনীতি বা নির্বাচনী ধারার রাজনীতির বিচারে সবাই জানেন, বামপন্থি কোনো সদস্যের নির্বাচনী প্রতিযোগিতার বৈতরণী একক শক্তিতে, আপন দলীয় শক্তিতে পার হওয়া প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। তাহলে তাদের রাজনীতি চর্চা দুই ধারার কোনোটিতেই তাৎপর্যপূর্ণ নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক এবং মিশ্র সামরিক শাসনামলের কথা যদি বাদ দেওয়া যায়, তাহলে বাকি সময় পর্বে তাদের ওই জনভিত্তি রচনার কাজ কতটুকু এগিয়েছে?

তিন.

এক দেশে এক পার্টি কিংবা বামঐক্য নিয়ে গত শতাব্দীতে অনেক আলোচনা হয়েছে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে। ফলাফল শূন্য। আর ২০১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপনে বাংলাদেশে যে আবেগ ও কর্মতৎপরতা দেখা গিয়েছিল শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-নারী এবং অন্যান্য ফ্রন্টে, তাতে কেউ কেউ আশান্বিত হয়েছিলেন যে, বছরের কর্মসূচিতে বহু উচ্চারিত বহুদলীয় একটি 'সমাজতান্ত্রিক মঞ্চ' তৈরি হবে ওই বিপ্লবের প্রেরণায়- চেষ্টা চলবে বাম মতাদর্শের একটি শক্তিশালী ফ্রন্ট তৈরির, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং অন্যদের দৃষ্টিতে সেভাবে বিবেচিত হবে। কিন্তু বছর শেষের বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠানের পর তেমন কোনো শুভ প্রচেষ্টা দেখা যায়নি।

কিছুদিন আগে কয়েকটি বাম সংগঠনের প্রতিবাদী মিছিলে ঢাকার রাজপথে পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটার ঘটনা কাগজে পড়ে খুব খারাপ লেগেছিল। শাসনযন্ত্র কি অন্যদের তুলনায়ও বামপন্থি শক্তির উত্থানকে ভয় পায় যে, শান্তিপূর্ণ মিছিলে এভাবে লাঠিপেটা করে আহত করতে হবে শক্তিহীন সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের? হয়তো পায়। তাই তাদের হিসাবমতো কাজই তারা করেছে। এরপরও ঐক্যের প্রশ্নের কি বোধোদয় ঘটবে না উল্লিখিত সংগঠনগুলোর?

জানি না এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কিনা, দিন-দুই আগে (১৬.১.২০২০) একটি দৈনিকে ছোট্ট একটি খবর পড়ে ২০১৭-এর ঘটনা মনে এসে গেল। এমনকি কয়েক দশক আগেকার ঐক্য প্রচেষ্টার কথাও। সংবাদ শিরোনাম :'বৃহত্তর ঐক্যের সিদ্ধান্ত ১২ বাম দলের'। খবরে বলা হয়েছে : 'বামপন্থি ১২টি দলের বৈঠকে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে ঐকমত্যে এসেছে এসব দল। এ জন্য শিগগিরই আরও একটি বৈঠক করবে দলগুলো।'

শুভ সংবাদ, সন্দেহ নেই। তাদের শুভবুদ্ধির জন্য অভিনন্দন জানাতে হয়। বৈঠকে উপস্থিত দলগুলো চেনামুখ, বাকিরা কোথায়? বৈঠকের সভাপতি বাসদপ্রধান খালেকুজ্জামান সাহেবকে ধন্যবাদ। দু'বছর আগে এ বিষয়ে তার সঙ্গে অনেক কথা হয়েছিল। ইতোমধ্যে দু'বছর সময় কেটে গেলেও বিষয়টির গুরুত্ব তাদের কাছে প্রতিভাত হয়নি। তবু ভালো, বিলম্বিত যাত্রা, কিছু না হওয়ার চেয়ে।

এতদিন, দীর্ঘদিন, দীর্ঘ বছর ধরে বামঐক্যের চেষ্টায় অনেক সময় ব্যয় করেছিলাম। এখন ভাবছি, ভিন্নকথা জীবনের শেষলগ্নে পৌঁছে। ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে নাকি নতুন সৃষ্টি সম্ভব হয়। তাই ভাবনা, উল্লিখিত বৈঠকে শক্তিহীন সব দল ভেঙে ফেলে প্রকৃত মার্কসবাদী ধারায়, দেশের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা হোক না কেন, নাম যাই হোক। দলীয় নেতাদের জায়গা হোক বিশাল এক পলিটব্যুরোতে। পালাক্রমে যৌথ নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নিয়মনীতি মেনে গঠিত হোক জনভিত্তিক একটি পার্টি- শ্রমিক-কৃষক ফ্রন্টকে যথাযথ গুরুত্ব ও প্রতিনিধিত্ব দিয়ে এবং এমনি আরও কিছু শর্তে।

বৈঠকের পরিণাম বা ফলাফল-চরিত্র দেখার অপেক্ষায় আছি।

ভাষাসংগ্রামী, কবি, রবীন্দ্র গবেষক ও প্রাবন্ধিক