কাকতালীয় বটে! পরে সময় হিসাব করে দেখলাম- জাতীয় পার্টির 'প্রধান পৃষ্ঠপোষক' রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত সর্বসাম্প্রতিক চিঠিটি বুধবার যখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ হচ্ছিল, তখন আমরা জাতীয় পার্টি নিয়েই কথা বলছিলাম। ভদ্রলোক যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের অধ্যাপক। বিভিন্ন দেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণাকর্মে খ্যাতি অর্জন করেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছেন। জাতীয় পার্টিতে এর প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। বলছিলাম কীভাবে দেবর ও ভাবির মধ্যে ক্ষমতার সংকট কিংবা ভারসাম্যের সংগ্রাম চলছে।

কথা প্রসঙ্গে অধ্যাপক বলছিলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনপ্রিয় নেতার 'বায়োলজিক্যাল লিগ্যাসি' না থাকা রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের কথা বললেন। বললেন আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্কের কথা। আমি যোগ করলাম ভারতের উদাহরণ। অটলবিহারি বাজপেয়ির উত্তরাধিকারী না থাকা হয়তো বিজেপির জন্য ইতিবাচক হয়েছে। আবার ইন্দিরা বা রাজীবের উত্তরাধিকার কংগ্রেসের জন্য যে সম্পদের বদলে বোঝা হয়েছে, সেই আলোচনা বিরল নয়। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশে আমরা মিশ্র উদাহরণ দেখি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফিনিক্স পাখির মতো প্রায় ভস্ম থেকে ফিরিয়ে এনেছেন আওয়ামী লীগকে। শুধু তাই নয়, দলকে 'রেকর্ডসংখ্যক' চার-চারবার ক্ষমতায় নিয়ে গেছেন। যে কোনো বিবেচনায় আওয়ামী লীগই সাংগঠনিকভাবে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী দল।

জাতীয় পার্টিতে অবশ্য এইচএম এরশাদের উত্তরাধিকার নিয়েই যত বিভ্রান্তি। জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি নিজেই এ ব্যাপারে নানা সময়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন। ২০১৬ সালে দলে 'নতুন পদ' সৃষ্টি করে ভাই জিএম কাদেরকে 'কো-চেয়ারম্যান' বানিয়েছিলেন। স্ত্রী বেঁকে বসলে চার মাস পর আরেকটি নতুন পদ সৃষ্টি করে রওশনকে বানিয়েছিলেন 'সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান'। আর গত বছরের প্রথমার্ধে এই দুই 'উত্তরাধিকার' নিয়ে এরশাদ যেন রীতিমত গলফ খেলেছেন।

জানুয়ারিতে দলের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরে গিয়ে এরশাদ ঘোষণা করেছিলেন, তার অবর্তমানে জিএম কাদেরই দলকে নেতৃত্ব দেবেন। একাদশ জাতীয় সংসদে তাকে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবেও মনোনয়ন দেওয়া হয়। সেই ঘোষণা ও পদক্ষেপ টিকেছিল দুই মাসের মতো। কিন্তু মার্চ মাসে সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে এসে দলে 'বিভেদ' তৈরি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে 'ব্যর্থতার' অভিযোগ তুলে জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেন। পরদিন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতার পদ থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। উপনেতা করা হয় 'অভিমানী' রওশনকে। কিন্তু এর সপ্তাহ দুয়েক না যেতেই এপ্রিলের গোড়ায় ফের কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান পদে ফিরিয়ে আনেন। দু'দিন পর এক 'সাংগঠনিক নির্দেশে' তাকে ঘোষণা করা হয় দলের 'ভবিষ্যৎ চেয়ারম্যান'। সর্বশেষ মে মাসের প্রথম সপ্তাহের এক মধ্যরাতে বাসভবনে সাংবাদিকদের ডেকে এক অর্ধপঠিত লিখিত নির্দেশে কাদেরকে 'ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান' করেন নবতিপর এই সেনাশাসক টার্নড রাজনীতিক। গত বছর জুলাই মাসে এরশাদের মৃত্যু হয়।

এরশাদের প্রয়াণের পরও উত্তরাধিকার নিয়ে দেবর কাদের ও ভাবি রওশনের টানাপোড়েন বন্ধ হয়নি। সেপ্টেম্বরে দলটি আরেক দফা ভাঙনের মুখোমুখি হয়েছিল। নিজেদের পাল্টাপাল্টি চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন দু'জন। দু'জনই অবশ্য মহাসচিব হিসেবে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁকে রেখে দিয়েছিলেন। যেন এক ফুল দুই মালী। এরশাদের প্রয়াণে শূন্য বিরোধীদলীয় নেতার পদে নিজের নাম প্রস্তাব করে স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছিল দুই পক্ষ। এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনেও পাল্টাপাল্টি মনোনয়ন দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল নির্বাচন কমিশনে। শেষ পর্যন্ত দুই নেতার অনুসারীরা সমঝোতা বৈঠকে বসেন। সেখানেই ক্ষমতা ভাগাভাগি হয়। সংসদে রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা, জিএম কাদের উপনেতা। অপরদিকে দলে জিএম কাদের চেয়ারম্যান, রওশন এরশাদ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান। আর রংপুর-৩ আসনে মনোনয়ন পান এরশাদ-রওশন দম্পতির মাতৃভক্ত পুত্র রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ। তাকে পরে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলেও স্থান দেওয়া হয়। যদিও দুই পক্ষেই অসন্তোষের চোরাস্রোত বয়ে চলছিল।

মাত্র সেদিন, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯, নবম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে দলটির প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী রওশন এরশাদকে 'প্রধান পৃষ্ঠপোষক' এবং এরশাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদে বহাল রাখা হয়েছিল। দলে আলঙ্কারিক পদ পেলেও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদে রয়েছেন রওশন এরশাদ। দলে ও সংসদীয় দলে ক্ষমতার ভাগাভাগি আরও স্পষ্ট করা হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, এরশাদের মৃত্যুর পর দুই বলয়ের মধ্যে যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল, এর মধ্য দিয়ে তার অবসান হতে যাচ্ছে। কিন্তু বুধবারের চিঠিটি প্রমাণ করছে, দলের প্রভাব এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী রওশন নন।

রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন তার পুত্র রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদও। তাকে দলের কো-চেয়ারম্যান করা হয়েছে। এই ১৬ জনের সবাই আগের কমিটিতে প্রেসিডিয়ামসহ বিভিন্ন পদে ছিলেন এবং বর্তমান কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। চিঠিতে রওশন বলেছেন- 'সম্মেলনে অর্পিত দায়িত্ব ও প্রদত্ত ক্ষমতাবলে' তিনি জাতীয় পার্টির ১৬ জন নেতাকে এই 'পদায়ন' করেছেন। ডিসেম্বরের কাউন্সিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ যদিও বলছেন যে, গঠনতন্ত্রমতে দলের 'প্রধান পৃষ্ঠপোষক' এমন নিয়োগ দিতে পারেন না।

জাতীয় পার্টিতে এমন গণহারে পদোন্নতি বা পদাবনতি, অন্তর্ভুক্তি বা অব্যাহতি নতুন নয়। এটাই সম্ভবত জাতীয় পার্টির রাজনীতির 'স্টাইল'। জিএম কাদেরও যেভাবে একজন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান, সাতজন কো-চেয়ারম্যান এবং আটজন অতিরিক্ত মহাসচিব নিয়োগ দিয়েছেন, তা খোদ দলেরই 'রেকর্ড' ভেঙেছে। এইচএম এরশাদও কো-চেয়ারম্যান, সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা সীমিত ছিল কেবল ভাই ও স্ত্রীর মধ্যে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রেই। জিএম কাদের স্পষ্টই বল হাঁকিয়েছেন সীমানা ছাড়িয়ে। বিশ্বের আর কোনো রাজনৈতিক দলে এত কো-চেয়ারম্যান পদ রয়েছে কি-না সন্দেহ।

এ ক্ষেত্রে দুটি প্রশ্ন সামনে। প্রথমটি সাংগঠনিক। এর মধ্য দিয়ে রওশন কী অর্জন করতে চাইছেন? তিনি স্পষ্টতই 'ক্ষমতা' দেখাতে চাচ্ছেন। কিন্তু এভাবে দলে তার ক্ষমতা কতখানি অর্জিত হবে, সন্দেহ রয়েছে। যেসব প্রভাবশালী নেতা 'রওশনপন্থি' হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদের সবাইকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান বা কো-চেয়ারম্যান বানিয়েছেন জিএম কাদের। হতে পারে, তার চিঠিতে উল্লিখিত এবং সর্বশেষ কাউন্সিলে বাদ পড়া নেতারাই নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন। হতে পারে, রওশন আরও দূরবর্তী আশঙ্কা থেকে এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন, প্রায় সব সংসদ সদস্য যেহেতু জিএম কাদেরের দিকে ভিড়েছেন, এর পর সংসদীয় দলের নেতৃত্বও চলে যেতে পারে। কিন্তু এতে করে আর যাই হোক, দলে রওশনের হূত প্রভাব ফিরে আসবে না। রওশনের সর্বশেষ ভরসাস্থল ছিল ক্ষমতাসীন দলের হাইকমান্ড। জাতীয় পার্টি 'বিট' কাভার করা সাংবাদিকদের মধ্যে কানাঘুষা শুনেছি, তিনি সেখানেও সংযোগ হারিয়েছেন। কাউন্সিলের আগে চেষ্টা করেছিলেন অতীতের মতো ক্ষমতাসীন মহলের প্রভাব খাটাতে, পারেননি।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি রাজনৈতিক। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যখন নানামুখী বেকায়দায়, তখন জাতীয় পার্টির সামনে সুযোগ ছিল বিরোধী দল হিসেবে জায়গা করে নেওয়া। আগেও লিখেছি, এইচএম এরশাদ যদি 'স্থির' থাকতে পারতেন, তাহলে সেই সুযোগ জাতীয় পার্টির সামনে আরও আগেই আসত। জিএম কাদেরকে অপেক্ষাকৃত স্থির মনে হয়। কিন্তু তিনি যেভাবে চট্টগ্রাম-৮ আসনে নিজেদের প্রার্থীকে বসিয়ে দিয়েছিলেন; যেভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ভালোভাবে খোঁজ না নিয়ে আগের দিন যোগ দেওয়া নেতাকে মেয়র প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিলেন; যেভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীকে উপযাচক হয়ে সরে দাঁড়াতে বলেছিলেন; তা অস্থিরতারই প্রমাণ। তিনি যদিও বড় ভাইয়ের 'উত্তরাধিকার' হিসেবেই রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, বড় ভাইয়ের 'স্টাইল' পরিত্যাগ করতেই হবে। আরও ভালো হয় সবাইকে নিয়েই দল পরিচালনা করতে পারলে। তাতে করে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক সম্ভাবনা পুনরুদ্ধার এখনও সম্ভব।

লেখক ও গবেষক
skrokon@gmail.com