কেজরিওয়ালের জয় বিজেপির ধাঁধা

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাহুল ভার্মা

দিল্লি ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির জন্য ধাঁধাই হয়ে থাকল। যদিও দিল্লি সম্পর্কে মোটের ওপর ধারণা, এটি বিজেপির এলাকা। এটি মূলত একটি শহুরে নগর, যার অধিবাসীরা প্রকৃতপক্ষে মধ্যবিত্ত এবং কিছু উচ্চবিত্ত। এখানকার অনেক পরিবারই রয়েছে, যারা মূলগতভাবে পাকিস্তান ভাগের আগ থেকেই এখানে বসবাস করছে। দিল্লির নাগরিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা যেমন উচ্চ পর্যায়ের, তেমনি এখানকার ভোটারের প্রতি সংবাদমাধ্যমের নজরও তীক্ষষ্ট। এটা ধারণা যে, এই অধিবাসীদের অধিকাংশই বিজেপিকে ভোট দেবে। অধিকন্তু এটি সেই শহর, যেখানে বিজেপি প্রথম লাল কৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে ষাটের দশকে প্রথম পৌর সরকার গঠনের সময় বিশাল জয় পেয়েছিল। বিজেপি এখানে নির্বাচনেও জিতেছিল, ১৯৯৩ সালে দিল্লি যখন সংসদীয় আসন হিসেবে যুক্ত হয়, সেখানে দলটি সরকারের পাঁচ বছর সফলতার সঙ্গেই সম্পন্ন করে। তারপর থেকে যখন বিজেপি লোকসভার ভোটে কিংবা স্থানীয় সরকারের ভোটে খুব ভালো করে, অথচ বিধানসভা নির্বাচনে অত্যন্ত খারাপ ফল করে।

বিধানসভা নির্বাচনে ভোটাররা কেন বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করে? ১৯৯৮ সালে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি করে যখন বিজেপি দিল্লিতে গো-হারা হারে, তখন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ নির্বাচনের দুই মাস আগে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি জাতীয় রাজনীতির নেতা হয়ে ওঠেন। এরপর বিজেপি আর দিল্লিতে এমন কোনো নেতা দাঁড় করাতে পারেনি, যিনি দিল্লির গণমানুষের নগর সরকারের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন। বিজেপির অবশ্য এমন নেতা রয়েছে, যারা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ। কিন্তু তারা মৃত শীলা দীক্ষিত কিংবা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো নন, যারা একই সঙ্গে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয়। দিল্লির মতো বৈচিত্র্যময় শহরে এমন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা প্রয়োজন, যিনি একই সঙ্গে দিল্লির অভিবাসীদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবেন, তেমনি দিল্লির গ্রামের মানুষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখবেন, আবার উচ্চবিত্তের প্রত্যাশাও পূরণ করবেন।

আম আদমি পার্টি (এএপি) অবশ্যই এই অতি প্রত্যাশিত জয় উদযাপন করবে। এই নির্বাচন দলটির জন্য বাঁচা-মরার লড়াই ছিল। কারণ ২০১৫ সাল থেকে দলটি একটি নির্বাচনেও জয়লাভ করেনি। ২০১৭ সালে পাঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনে হেরেছিল, দিল্লি পৌরসভা নির্বাচনেও সুবিধা করতে পারেনি, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাতটি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে তৃতীয় হয়েছিল দলটি। আম আদমি পার্টির প্রচার কৌশলও ছিল ইতিবাচক। দলটি তার নির্বাচনী প্রচারে সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার মান বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি (মহল্লা ক্লিনিক), পানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রদান, সরকারি বাসে নারীদের বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করার মতো বিষয় উপস্থাপন করেছিল। এটা পরিস্কার যে, এ নির্বাচন ছিল নরেন্দ্র মোদি ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ব্যক্তিত্বের
লড়াই অথবা বিজেপির আদর্শিক আখ্যানকে  চ্যালেঞ্জ জানানো।

এই পরাজয়ে বিজেপি একটি বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে- তা হলো, তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছে। বিজেপি তাদের প্রচারে জাতীয় ইস্যুগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছিল এবং ভেবেছিল, এর মাধ্যমে তাদের পক্ষে ভোটারদের সমর্থন বাড়বে। কিন্তু দলটির সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যা হোক, এ নির্বাচনে দিল্লিবাসী আরও বিশ্বস্ত নেতৃত্ব, সরকারি কর্মক্ষমতা, জনসেবা সরবরাহ এবং সরকারি কর্মচারীদের থেকে বেশি বেশি সুবিধা প্রত্যাশা করেছে। এর অভাবেই মূলত আদর্শিক-নিরপেক্ষ এবং নির্দলীয় ভোটাররা তাদের লোকসভা নির্বাচনে মোদি এবং বিজেপি, বিধানসভা নির্বাচনের জন্য কেজরিওয়াল এবং আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়েছে। এটি ২০১৯-পরবর্তী ভারতের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নির্বাচনী প্রবণতা।

দিল্লির নির্বাচনের এই ফলাফলকে কি বিজেপির আদর্শিক মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা উচিত? বিরোধী দলগুলো এবং সুশীল সমাজ স্বাভাবিকভাবেই এটা চিত্রিত করতে পারে যে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (ক্যাব) বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জনগণ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে; অনেকটা শাহিনবাগ ইস্যুর মতো। এই নির্বাচনে বিজেপির ব্যর্থতা গণভোটের সঙ্গে তুলনা করা উচিত হবে না। আম আদমি পার্টি প্রচারের ক্ষেত্রে তার আদর্শিক জায়গায় বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করেনি। দলটি মোদির নেতৃত্ব গ্রহণ করেনি বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া ও শাহিনবাগের অশান্তির ঘটনায় দৃঢ় অবস্থান নেয়নি।

সাম্প্রতিক এক ভোট সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই নির্বাচনে আম আদমি পার্টিকে ভোট দেওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার বিজেপির আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন জানিয়েছেন। দক্ষতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা, ভোটারদের বিশ্বস্ত নেতৃত্ব উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে দলটি নির্বাচনে জিতেছে। তারা ভোটারদের মধ্যে আদর্শগত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নির্বাচিত হয়নি। ধর্মের ব্যাপারে দুর্বলতা, বেশি সংখ্যক মানুষের ধর্মীয় অনুশীলনকে সমর্থন জানানো ভারতীয় রাজনীতিতে সাধারণ বিষয়। তবে বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপিকে মোকাবিলার জন্য দলটির ধর্মীয় আদর্শকে বিরোধী দলগুলো হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রতিটি নির্বাচনী ধাক্কা মোদি ও অমিত শাহর ক্ষমতাকে খর্ব করবে। পাশাপাশি বিজেপির কথিত এক জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক শক্তি ও নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।

হহিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তরিত ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্স  (সিআরপি), নয়াদিল্লি