বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিজেপির বিদ্বেষ

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মইনুল ইসলাম

ভারতের কট্টর দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ দলের জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে বক্তব্য প্রদানের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অহেতুক বাংলাদেশকে হেয় করার উদ্দেশ্যে চরম অপমানজনক বাক্যবাণ নিক্ষেপ করে চলেছেন। অথচ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিকবার ঘোষণা করেছেন, তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন সর্বোচ্চ বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ২০১৮ সালে ভারতীয় তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত সুষমা স্বরাজ বলেছিলেন, 'সাবচে পহেলে বাংলাদেশ'। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই বাংলাদেশ ভারতের কাছে অসহায় অবস্থানে নেই যে, ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী শাসক দলের নেতাদের বেলাগাম আক্রমণ, অপমানজনক বাক্যবাণ ও তাচ্ছিল্য এবং বিজেপির নানাবিধ মুসলিম-বিদ্বেষী কর্মকাণ্ডকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিতে হবে!

বাংলাদেশ-বিদ্বেষী বক্তব্য প্রদানের চ্যাম্পিয়ন হলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যিনি কিছুদিন আগেও বিজেপির সভাপতি ছিলেন। নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এই অমিত শাহকে মোদির 'পয়েন্টসম্যান' মনে করা হয়, মানে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন থাকায় যেসব বক্তব্য বা মন্তব্য মোদির জন্য স্পর্শকাতর হতে পারে, সেগুলো অমিত শাহের মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হয় বলে ওয়াকিবহাল মহলের দৃঢ় বিশ্বাস। অতএব, অমিত শাহের হননকারী বক্তব্যগুলো নরেন্দ্র মোদির অজ্ঞাতসারে বা অগোচরে প্রদত্ত হচ্ছে মনে করার কোনো কারণ নেই। ভারতে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনশিপ (এনআরসি) আইন পাসের পরিপ্রেক্ষিতে আসামে এনআরসি প্রণয়নের পর অমিত শাহ বললেন, এনআরসিতে স্থান না পাওয়া সবাইকে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে আসামের অর্থমন্ত্রী আরেক বিজেপি নেতা আরও এককাঠি সরেস। তিনি আস্টম্ফালন দিলেন, এনআরসিতে নাম না থাকলে সবাইকে 'লাথি মেরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে'। অথচ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরবর্তীকালে নরেন্দ্র মোদি আশ্বস্ত করলেন, এনআরসি প্রণয়নের ফলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না, এটা সম্পূর্ণভাবেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। একদিকে নরেন্দ্র মোদির এই আশ্বাস, অন্যদিকে তার দলের অন্য নেতাদের বাংলাদেশ-বিদ্বেষী বাক্যবাণ গত দুই বছরে বেড়েই চলেছে।

এর আগে ২০১৫ সালে অমিত শাহের পূর্বসূরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ পরিদর্শনে এসে অহেতুক মন্তব্য করলেন, 'এই বেড়া দিয়ে বাংলাদেশিদের গরুর মাংস খাওয়া ভুলিয়ে দেব।' তার মানে, ভারত থেকে চোরাচালানে গরু পাচার হতে না দিলে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম এত বেড়ে যাবে যে, বেশিরভাগ বাংলাদেশির ওই মাংস কিনে খাওয়ার সামর্থ্য থাকবে না। এ কথা বলে রাজনাথ সিং বাংলাদেশের একটা উপকারই করেছেন। কারণ তিনি এই বাক্যবাণ বর্ষণের চার বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ২০১৯ সালে গরু উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। অবশ্য, ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও গরু চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। এখন নদীর উজান থেকে চোরাচালানের গরু স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের চোরাচালানিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কয়েকদিন আগে এ রকম ভেসে আসা গরুর বেশ কয়েকটি বিএসএফের গুলিতে মরে যাওয়ায় নদীর পানিতে মরদেহ ভাসার ছবি দেখে ব্যথিত হলাম।

২০১৯ সালে পাস হলো ভারতের সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ)। ওই আইনে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে মুসলিম ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্ট-ধর্মাবলম্বী অভিবাসী-শরণার্থী সবাইকে ভারতের নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্বের দৃষ্টিতে চরম বৈষম্যমূলক আইন হিসেবে 'অগ্রহণযোগ্য' এই আইনটি সারা ভারতে এবং বিশ্বে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারতে গত কয়েক মাস বড় বড় নগরীর রাজপথ প্রকম্পিত হচ্ছে সিএএ পাসের বিরুদ্ধে লাখ লাখ প্রতিবাদকারীর মিছিলে-স্লোগানে, ইতোমধ্যেই নিহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টে যেভাবে মুসলিমদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশকারী অন্য সব ধর্মের অনুসারীদের ভারতীয় নাগরিক হওয়ার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা যে চরম বৈষম্যমূলক ও অগ্রহণযোগ্য সাম্প্রদায়িকতা, সেটা খোদ জাতিসংঘকেও ঘোষণা করতে হয়েছে।

বিজেপি বুঝতে পেরেছে, হিন্দুত্ববাদী চরম দক্ষিণপন্থি রাজনীতির আফিম এখন ভারতীয়দের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে প্রবলভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। অতএব, আগামী কয়েকটি নির্বাচনেও তাদের বিজয়ের সম্ভাবনা এই আফিমের মৌতাতে বাড়বে বৈ কমবে না। সাধারণ স্বল্পশিক্ষিত ভারতীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান মোদিপ্রীতির জোয়ার অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বাড়তেই থাকবে। মোদির এই কট্টর হিন্দুত্ব ও সাম্প্রদায়িকতা যে তার দল বিজেপির নেতাকর্মীদের প্রাণের সঙ্গে মিশে আছে, সেটা আরও খোলসা হলো গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডির চরম বাংলাদেশ-বিদ্বেষী আরেকটি মন্তব্যে, 'ভারত নাগরিকত্ব দিলে বাংলাদেশ খালি হয়ে যাবে।' এসব বিষয় মানুষের মনের মধ্যে পুষে রাখা ধর্মান্ধতা ও গোমরাহির বিষ ঝাড়ার ঘটনা হলেও আমি মনে করি, নীরবে এই 'হেইট ক্যাম্পেইন' হজম করা বাংলাদেশ সরকারের সমীচীন হচ্ছে না। কারণ, বাংলাদেশ যে এখন আর 'তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি' নেই, এই খবরটা বিজেপির নেতাদের বুঝিয়ে দেওয়া সময়ের দাবি। জাতির আত্মসম্মানবোধকে আঘাতকারী এসব মন্তব্য অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের দিক থেকে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই ভারতের করুণার ওপর নির্ভরশীল নয়। আমাদের অর্থনীতি এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সামর্থ্য অর্জন করেছে। আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টে এখন আর উল্লেখযোগ্য ঘাটতি হচ্ছে না। যেটুকু বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে, সেটুকু আমরা প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স এবং 'সাপ্লায়ারস ক্রেডিট' থেকে অনায়াসে মেটাতে পারছি। ভারত বাংলাদেশকে যে বৈদেশিক ঋণ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে, ওগুলো সবই এমন সব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, যে প্রকল্পগুলো প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশের চেয়েও ভারতের প্রয়োজনই বেশি মেটাবে। 'ক্রস-বর্ডার কানেক্টিভিটি' বৃদ্ধির আবশ্যকতা বাংলাদেশের জন্য যতখানি প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন ভারতের সেভেন সিস্টার্সের জন্য।

ভারত বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম সূত্র হলেও ওই সূত্র বিঘ্নিত বা বন্ধ হলে বিকল্প সূত্র পেতে বাংলাদেশের খুব বেশি অসুবিধা হবে না। একটা কথা ভারতকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্ক দুই দেশের জন্য 'উইন উইন প্রপোজিশন' না হলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায় না। যেহেতু বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য প্রবাহ ভারতকেই অনেক বেশি সুবিধা এনে দিচ্ছে। এটাকে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দয়াদাক্ষিণ্য মনে করার কারণ নেই। আর তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা যে গত তিন দশক ধরে ভারত বাংলাদেশকে দিচ্ছে না, তাতে বাংলাদেশের কৃষকরা অন্যায়ভাবে ভারত কর্তৃক চরম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটা এখন আর তাদের জীবন-মরণ সমস্যা নয়। অদূর ভবিষ্যতে ভারত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করবে না- এটাকে মেনে নিতে হবে বাংলাদেশের নীতি-প্রণেতাদের।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিএনআই এখনও ভারতের চেয়ে কম হলেও কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৫ শতাংশে পৌঁছে গেলেও ভারতে তা ৫ শতাংশের আশপাশেই ছিল। আগামী পাঁচ বছর যদি আমরা ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখতে পারি, তাহলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মাথাপিছু জিএনআইর বিচারেও ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। অতএব, বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ ভারতে যাওয়ার জন্য গাঁটরি-বোঁচকা বেঁধে দিন গুনছে বলে বিজেপির কোনো কোনো নেতা যেসব কথা বলছেন, এমন বাক্যবাণ বন্ধের জন্য নরেন্দ্র মোদির কাছে দাবি জানানো প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে সৎপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব নিশ্চয়ই চাই আমরা। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না। বিদ্বেষ পুষে বন্ধুত্বের স্থায়িত্ব আশা করা যায় না। বন্ধুত্ব হয় দুই সমমর্যাদাসম্পন্ন প্রতিবেশীর মধ্যে, পরস্পরের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার ভিত্তিতে।

অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়