যেসব বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে

ভাষার মাস

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হাসান আজিজুল হক

বরফের গোলা সম্পর্কে একটা কথা আছে না? ছোট্ট একটা বরফের গোলা নিচে গড়াতে গড়াতে বড় হতে থাকে। সমতলে এলে দেখা গেল প্রকাণ্ড একটি বরফের চাঙর। একুশে ফেব্রুয়ারিও কি তাই? যত দিন যাচ্ছে, সে কি নতুন নতুন মাত্রা অর্জন করছে? আমি পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত বৎসরান্তিক একুশে ফেব্রুয়ারির দিনগুলোকে মালার মতো দেখতে পাই। পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানি আমলে একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হতো সন্ত্রস্ত আবহাওয়ার মধ্যে। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের বিরাট বিজয়ের পরপরই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে একটা অন্ধকার সময় এগিয়ে আসতে থাকে। ওই বিরাট বিজয়ের সঙ্গে এই অন্ধকার সময়ের তুলনাটা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। ছাপ্পান্ন সাল পর্যন্ত একটা সংবিধানও পাওয়া গেল না। রাষ্ট্রটাকে কী করে চালাতে হবে, শাসকরা অন্ধ ঔপনিবেশিক স্বার্থে সে সম্পর্কে মনস্থিরই করতে পারলেন না। নতুন রাষ্ট্রে জনসাধারণের হাতে যে ছিটেফোঁটা ক্ষমতাও দেওয়া হবে না, সেটা তো স্থির ছিলই। পূর্ব পাকিস্তান হবে পশ্চিম পাকিস্তানের সরাসরি উপনিবেশ বা শোষণক্ষেত্র। শিখণ্ডী হচ্ছে ধর্ম। বোঝা যাচ্ছিল গণতন্ত্র এদের সইবে না, ধাতেই নেই। ক্ষমতাটা মূলত কেন্দ্রীভূত হবে সেনাবাহিনীতে। পাকিস্তান কখনই একাত্তরের আগেই হোক আর তার পরেই হোক, রাষ্ট্রক্ষমতাকে সেনাবাহিনীর বাইরে যেতে দেয়নি। গণতন্ত্রের একটা ঢং বা ছাঁদ চাইবার অপরাধেই লোভী ভুট্টোকে তারা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। তাদের বদ্ধমূল সংস্কার- গণতন্ত্র বিষবৎ পরিত্যাজ্য। আমরা দেখতে পাই, 'তা না না না' করে গণতন্ত্র নামে দু-চার বছর পাকিস্তান চালানোর পরেই চলে এলো আইয়ুব খানের সামরিক শাসন।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে যে আগুন ও আলো পুরো সমাজকে উজ্জ্বল তপ্ত করে তুলল, তা কি আকস্মিকভাবেই ঘটেছে? মুক্তির জন্য মানুষের সর্ববিধ গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই নবলব্ধ চেতনার পেছনে একুশে ফেব্রুয়ারি কি কাজ করেনি? অবশ্যই তা নয়। আগুন তৈরি হয়েছে একটু একটু করে, সেই আগুনে সমিধ জুটিয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি। চোখে দেখা যায়নি, উচ্চকিত আন্দোলনে তা ধরা পড়েনি; কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি এক অমর উৎস হিসেবে জাতির জন্য অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও সংগ্রামী সংকল্প উৎসারণ করে গেছে।

গণঅভ্যুত্থানের পরেই মুক্তিযুদ্ধ। ততদিনে আমরা বুঝতে পেরে গেছি, মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির মধ্যেই একুশে ফেব্রুয়ারির মহান আন্দোলন মোটেই সীমিত ছিল না। ভাষার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে কেমন করে জাতি তার মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পাবে, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মোটামুটি বৈষম্যহীন একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করে নিতে পারবে, এসব কিছুই বীজাকারে ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের যৌক্তিক পরিণতি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। তারপরও একুশে ফেব্রুয়ারি মোটেই নিঃশেষিত হয়নি। তবু আজও একুশে ফেব্রুয়ারির অন্তর্নিহিত লক্ষ্যগুলো অনর্জিত রয়েছে। শুধু অনর্জিতই নয়, বেশ কিছু অর্জনও প্রায় হারিয়ে ফেলেছি।

আবার একবার পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি। আতঙ্ক, ভয় ও ক্রীতদাসত্ব অতিক্রম করে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশে যুদ্ধোত্তর মুক্ত পরিবেশে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের পর্ব শুরু হলো। আমাদের কণ্ঠ উঁচু থেকে উঁচু হতে থাকে। আমাদের গর্ব ক্রমাগত আকাশছোঁয়ার চেষ্টা করে। সত্তরের দশকের শুরুর দিকের বছরগুলোয় একুশের মহোৎসবের মহাকল্লোলধ্বনি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু কত দিন যায়? বেশি দিন তো লাগে না, স্বাধীনতার স্বাদ ফিকে হয়ে আসে। চেঁচাতে চেঁচাতে গলা ব্যথা হয়ে যায়। বারবার ভুল সুর বেজে ওঠে। মাইক্রোফোনের ভলিউম বাড়িয়ে দিতে হয়। চর্বিতচর্বণে কবিতার চরণ, উপন্যাসের নিনাদ, গল্পের স্বাদ মিইয়ে পড়ে, এলিয়ে যেতে চায়। সস্তা ভাবালুতা ঠোঙায় ঠোঙায় বিক্রি হতে থাকে। আমরা আমাদের চিরদিনের অভ্যাসমতো করণীয় ও কৃতকাজের হিসাব না নিয়ে ফাঁকা আবেগের কাছে আত্মসমর্পণ করতে থাকি। প্রাপ্তির সঙ্গে আমাদের সুললিত বাক্যবিন্যাসের কোনো সম্পর্কই থাকে না। ফেব্রুয়ারি এলেই ক্রমাগত কথামালা সাজাতে শুরু করি।

কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই, বছরে একবার করে মাস ও দিনটি আসবেই এবং যত দিন যাবে, ততই আরও উদ্দীপনার সঙ্গে, আরও বড় আকারে, আরও অনেক বেশি উৎসাহ নিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে যাব। প্রতি বছরই বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৭২ সালের স্বাধীনতার পরে বইমেলা আমরা যেভাবে শুরু করেছিলাম, এখন আকারে, আয়তনে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বইমেলা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে এক বিশাল বার্ষিক উৎসব। গ্রন্থ প্রকাশের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে তো বটেই, শুধু বইমেলাকে উপলক্ষ করেই সারা বছর ধরে প্রকাশিত মোট গ্রন্থের প্রায় নব্বই ভাগ বইমেলা উপলক্ষেই প্রকাশিত হচ্ছে। এ শুধু উৎসব নয়, মহোৎসব। আর এই মেলায় আগত মানুষের ভিড়কে এখন আর শুধু গ্রন্থপ্রেমিক বলা চলবে না। আবালবৃদ্ধ, নর-নারী শুধু বইয়ের জন্য না হোক, একবার মেলা প্রাঙ্গণের মাটির স্পর্শ নিতে আগ্রহী। তীর্থযাত্রীরা যেমন করে থাকেন। পাপ কাটানো আর পুণ্য সঞ্চয়-উপলক্ষ মুদ্রিত গ্রন্থ। হ্যাঁ, আকারে-প্রকারে, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বহুগুণে প্রসারিত এখন আমাদের বইমেলা। যে কোনো আন্তর্জাতিক বইমেলার সঙ্গে তাকে সহজেই তুলনা করা যায়। সব ঠিক। তবে তারপরেই কুশাগ্রের মতো প্রশ্নের খোঁচা- একি শুধু দেহবৃদ্ধি? মেদবৃদ্ধি? কেউ বলতে পারেন, আমাদের বড় অর্জনকে ছোট করে দেখার মনোভাব আমি কেন দেখাই? কারণ একটাই। বৃহতের জন্য, খাঁটির জন্য আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন বলেই সব বৃদ্ধি স্বাভাবিক, যান্ত্রিক না কৃত্রিম, তা যাচাই করে নিতে ইচ্ছা করে। সংখ্যাগুরুর প্রবল প্রচারে মন সায় দিতে চায় না। তখন মনে হয়, বাংলা ভাষা, যার জন্য এত রক্তপাত, এত ত্যাগ, এত সাধনা, এত মেধা ও মনীষার ব্যয়, আমরা কি এখন তার সত্যিকার ফল লাভ করছি?

বাংলা ভাষাকে আমরা কি জাতির প্রাণময় সত্তার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছি? মানের উন্নতি তো হয়ইনি, যত দিন যাচ্ছে শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা ততই পঙ্গু, অপটু এবং অকার্য বলে মনে হচ্ছে। কেন? এখনও বহু জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয় মোটামুটি মানসম্পন্নভাবে আয়ত্ত করতে গেলে বাংলা ভাষার দ্বারা তা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলার প্রচলন শিক্ষার মানটাকে অনেক নিচে নামিয়ে এনেছে। আমরা তো শিক্ষার অবনমন ঘটিয়ে বাংলার প্রচলন, বাংলাভাষার প্রসার চাইনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদের পরিমাণ এতই ক্ষীণ যে, একমাত্র ইংরেজি ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার উল্লেখ করাই সম্ভব নয়। একবার খোঁজ নেওয়া যেতে পারে, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বাংলা ভাষার জায়গাটি কোথায়? অন্যদিকে বণিক-বৃত্তির কাছে অসহায় ও কদর্য আত্মসমর্পণে ইংরেজি ভাষার যে চর্চা চলছে, তাকে আর যা-ই বলা হোক, শিক্ষার জন্য ভাষার চর্চা নিশ্চয় বলা যায় না। দেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্রই তিন মাসের মধ্যে ইংরেজি বলতে বা লিখতে শিখিয়ে দেওয়ার লোভনীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একটা জাতি, একটা রাষ্ট্র সর্বার্থে ঠিক কতটা নিঃস্ব হলে, সমাজে কতটা বৈষম্য তৈরি হলে এমন সংস্কৃতিহীন হাঘরে আদেখলা একটি ধনিকশ্রেণির জন্ম হতে পারে, তা কি কেউ আন্দাজ করতে পারেন?

মুক্তবাজারে, মুক্ত অর্থনীতিতে ষাঁড়ের মতো এসব প্রতিষ্ঠান জাবর কাটছে, অর্থ উপার্জন করছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত যেটুকু শিক্ষা মেলে তার প্রায় সবটাই এসব প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে নিতে হচ্ছে। দুধের শিশুকে, কর্নফ্লেক্স, দুধ-রুটি খাওয়া চার বছরের শিশুকে দিনের ১২ ঘণ্টার বেশিরভাগ সময়ই টিউটর বা টিউটোরিয়াল হোমে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজের চমৎকার পোশাক পরে ঘোড়ার মতো বইয়ের বস্তা পিঠে নিয়ে শিক্ষায়তনগুলোয় যাচ্ছে এবং বাসায় ফিরে এসেই তাদেরই নিজেদের স্কুলের, কলেজের শিক্ষকদের বাসায় বা তাদের টিউটোরিয়াল হোমে হাজিরা দিচ্ছে। কোনো ক্ষমা নেই, ক্ষান্তি নেই, বিশ্রাম নেই, খেলাধুলা নেই। নির্মল আনন্দের কোনো ব্যবস্থা নেই। শিশু তার শিশুত্ব, কিশোর তার কিশোরত্ব, যুবক তার তারুণ্য উপভোগ করতে পারছে না। এ এক অকূল তীরহারা পাথারে হাঁসফাঁস করতে করতে সাঁতার কেটে এগোনোর মতো। এই পুরো কৃত্রিম, অসহ এবং অমানবিক পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করেছি।

আমরা ভুলে যাই, কোনো কিছু বিচারের মূল মানদণ্ডটি কী হওয়া উচিত। আসলে আলাদা করে চর্চার মাধ্যমে কোনো ভাষার প্রচলন বাড়ানো যায় না, তাকে শুদ্ধতর করা যায় না, উন্নততর করা যায় না। ভাষার কাজ এক ধরনের প্রতিফলন মাত্র। প্রতিফলনটি সমগ্র জীবনের। জনগোষ্ঠীর কর্মজগতের, চিন্তাজগতের, ভাবজগতের, তার বিত্ত, সম্পদ বৃদ্ধি ও উৎপাদনে যেখানে যতটা অগ্রগতি ঘটে, ভাষা তারই প্রতিফলন ঘটায়। কাজেই উন্নত ভাষা এবং অনগ্রসর দেশ কখনই একই সঙ্গে থাকতে পারে না। থার্মোমিটারে পারদের ওঠানামার মতো তা তাপের ওপরে নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ঠিক যতটা এগোবে, তার কর্মযজ্ঞ যতটা প্রসারিত হবে, তার জনসংখ্যার যতটা অংশ মানসিক এবং শারীরিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠবে, তারই প্রতিফলন ঘটাবে ভাষা। ভাষাকে আলাদা করে চর্চা করে খুব একটা লাভ হবে না। তাতে একটা ঝকমকে ভাব আসতে পারে; কিন্তু তা দিয়ে সব রকম লড়াই করতে পারা যাবে না। তা করতে গেলে দেশের দিকেই, দেশের মানুষের দিকে ফিরে তাকাতে হবে এবং দেখতে হবে এক একুশ থেকে আরেক একুশ কতটা আলাদা, কীভাবে আলাদা হচ্ছে।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক