উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যে খুবই কঠিন, এই সত্য এড়ানো যাবে না। শুধু বিদেশ থেকে আমদানি করে দেশের খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা মেটানো বা মূল্যহ্রাস কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কৃষি, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। এ দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষিকে উপেক্ষা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। কৃষির উন্নয়নে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা অনেক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রসরতার তাগিদে আমাদের প্রাথমিক কর্তব্য হবে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন; গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আধুনিক প্রযুক্তি কৃষির মানোন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তিবিদ্যা বিকাশের সুফল কাজে লাগিয়ে দেশের শিক্ষিত অনেক বেকারই আজ স্বাবলম্বী। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে বেকারত্ব দূর করতে চাকরির মোহ ত্যাগ করে তারা নানাভাবে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি কার্যকরী ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতিকূল অবস্থাতেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় গ্রামীণ মানুষের, বিশেষ করে কৃষকের সাড়া জাগানো ভূমিকা রয়েছে। গ্রামীণ শিক্ষিত যুবকরা অনেকাংশে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রতি ঝুঁকছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্য গড়ে তোলায় সহায়তা করছে। কৃষিক্ষেত্রে তাদের অবাধ যোগদান দেশকে ভবিষ্যতে উন্নত দেশের মর্যাদা দিতে পারে, এই প্রত্যাশা অমূলক নয়। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার ২ থেকে ৫ শতাংশ মানুষ কৃষিজীবী। অন্যদিকে আমাদের দেশের ৭০ শতাংশ মানুষই কৃষিজীবী। কৃষির উন্নতিতেই গ্রামীণ স্বনির্ভরতা আর গ্রামীণ স্বনির্ভরতাতেই জাতীয় অর্থনীতির আরও বিকাশ সম্ভব। বিভিন্ন পরিকল্পনায় সরকার কৃষির উন্নয়নে যতটুকু গুরুত্ব দিয়ে চলেছে, এর যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষি সভ্যতার গোড়াপত্তনেও নারীর অবদান সর্বজনস্বীকৃত। বাংলাদেশি নারীকে অনেকেই 'ঘরের লক্ষ্মী' বলে থাকেন। বাস্তবে নারী দূরদর্শী ও অধ্যবসায়ী। কৃষি সভ্যতার এ দেশে গ্রামীণ নারীরা পুরুষের কর্মক্ষেত্রে নিত্যসঙ্গী। পশুপালন থেকে শুরু করে চাষাবাদ, উৎপাদিত নানারকম পণ্যের বাজারজাতকরণসহ সর্বত্র নারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগদান গ্রামীণ জনজীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা দৃশ্যমান। এ রকম দৃষ্টান্তও দেওয়া যাবে যে, গ্রামীণ জনপদে কৃষানিরা শুধু কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, কৃষি সংশ্নিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্যেও ভূমিকা রাখছেন। গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের সিংহভাগই নারীকেন্দ্রিক। তবে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্রশিল্পে যোগদান আনুপাতিক হারে সর্বাধিক হলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত স্তরের নারীরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে পারলে কৃষি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
আগামী দিনে বাংলাদেশে অবশ্যই অর্জিত হতে পারে কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও তা গ্রামীণ জনপদের মানুষের আরও স্বতঃস্ম্ফূর্ত যোগদানের মাধ্যমে। শহুরে ব্যবসা-সংশ্নিষ্ট নারীরা গ্রামীণ সামগ্রীর বিপণন কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন। খাদ্যপণ্য উৎপাদনে আমাদের অগ্রগতি অসামান্য। এমন অনেক নিত্যপণ্য আছে, যেগুলোর উৎপাদন আরও বাড়াতে পারলে বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। গত বছরের প্রায় মধ্যভাগ থেকে এখন পর্যন্ত নিত্যপণ্য পেঁয়াজ নিয়ে যেসব তুঘলকি কাণ্ড ঘটে গেল, এর আলোচনা নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। অথচ চাহিদার বিপরীতে আমাদের পেঁয়াজ উৎপাদনে ঘাটতি মাত্র ৭-৮ লাখ টন। এই ঘাটতি পোষানো সম্ভব উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে। পেঁয়াজের মতো এমন আরও পণ্য আছে, সেগুলোর আমদানিনির্ভরতা আমরা কমিয়ে আনতে পারি উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে। এ জন্য যেমন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে কৃষককে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দিতে হবে, তেমনি সংশ্নিষ্ট সব উপকরণও করতে হবে সহজলভ্য। এই বিষয়গুলো নীতিনির্ধারকরা আমলে রেখে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ণয় করতে সক্ষম হলে কৃষকের ভূমিকা হবে আরও সাড়া জাগানো।
পরিবেশকর্মী; বৃক্ষরোপণে জাতীয় পদকপ্রাপ্ত

বিষয় : অন্যদৃষ্টি

মন্তব্য করুন