পাপিয়ার পাপ
খুব আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছেন পাপিয়া। বিছানায় ছড়ানো টাকাগুলোর দিকে তাকালেন একপলক। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আরো অনেক কিছু। আড়চোখে ওগুলো দেখে সোজা হলেন একটু, 'এবার আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন।'
'আপনার বাসায় এতো কিছু পাওয়া গেছে, কোথায় পেলেন এসব?' সামনে বসা তিনজনের মাঝেরজন জিজ্ঞেস করলেন।
'একটা শর্তে প্রশ্নটার উত্তর দেব আমি।'
'কীসের শর্ত!' বাম পাশেরজন সোজা করলেন মেরুদণ্ড।
'আমি যে উত্তরটা দেব-তা সবাই জানবে। এবং-।' সামনের তিনজনের দিকে বিশেষ ভঙ্গিমায় তাকালেন পাপিয়া, 'ছাপা হতে হবে তা পত্রিকায়, প্রচারিত হতে হবে টিভিতে।'
'এটা অসম্ভব।' কিছুটা শব্দ করে বললেন ডানপাশের জন।
'তাহলে আমারও উত্তর দেওয়া অসম্ভব।'
'আপনি জানেন-কী হতে পারে আপনার?'
'জানি।' বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখায় পাপিয়াকে, 'পাপিয়ারা পাপ করে, কিন্তু তারা একা করে না। কারোর প্রশ্রয়ে করে। তাদেরকে দিয়ে করানো হয়। সবরকম সুবিধা নিয়ে আড়ালে থাকেন যারা বরাবরের মতো, তাদের ছবি তুলে পেপারে ছাপান, টিভিতে দেখান, আশা রাখি দেশে আর কোনো পাপিয়া সৃষ্টি হবে না কখনো।'
মাত্র এক হাজার কোটি টাকা
বিটিআরসিকে এক হাজার কোটি টাকা দিয়েছে গ্রামীণফোন। চৌদ্দ বছরের নিরীক্ষায় রাজস্বের ভাগাভাগি, কর ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে বিটিআরসি ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা দাবি করে গ্রামীণফোনের কাছে।
গত কয় বছর ধরে মাঝে মাঝেই এতসব টাকার কথা শোনা যায়। পরিমাণ এতো বড় যে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বুকে ধাক্কা লাগে হঠাৎ। দু-এক সেকেন্ড স্থিরও হয়ে যায় জায়গাটা।
কিন্তু বড় মানুষদের কাছে ওসব কোনো টাকাই না। তাই তো হলমার্কের চার হাজার কোটি টাকার কথা শুনে আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, 'ওটা কোনো টাকাই না।' শেয়ারবাজারের লক্ষ কোটি টাকা, ক্যাসিনো কারবারের হাজার কোটি, দেশের বাইরে পাচার হওয়া কোটি কোটি টাকার কথা শুনে কেমন যেন মনে হয়-এতো টাকা আসলে কত টাকা?
তাই একটা প্রস্তাব ছিল-এই এক হাজার কোটি টাকা মাত্র একদিনের জন্য প্রদর্শন করা হোক। যথাযথ দূরত্ব, কঠোর নিরাপত্তা, বুলেট প্রুফ কাচে ঘেরা থাকবে টাকাগুলো। একুশ হাজারবার জন্মিয়েও মাত্র এক কোটি টাকা একসঙ্গে দেখার সামর্থ্য নেই যাদের, সেই আমরা সারি করে রাখা টাকাগুলো দেখব। ছুঁতে তো পারব না, এক ঝলক দেখেই বাসায় ফিরে গিয়ে বলব, 'আহ, নিজের চোখে আজ এক হাজার কোটি টাকা দেখলাম! সার্থক জনম আমার।'
কত অজানারে
'আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সদস্যকে যদি এক এক করে জাতীয় সংগীত গাইতে বলা হয় বা স্পিকার নির্দেশ দেন, তাহলে ৯০ শতাংশ সংসদ সদস্য জাতীয় সংগীত গাইতে পারবেন না।' ঢাকা-৯ আসনের সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন এসব কথা।
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, নিজের স্বার্থ আর ক্ষমতার ছোঁয়ায় ফুলেফেঁপে বড় হওয়া মানুষগুলো অনেক কিছুই পারবে না। এটা তো আমরা জানি। তারপরও আমরা তাদের ভোট দেই। যদিও ইদানীং ভোট লাগে না আমাদের কারোরই।
অনেক কিছুই পারেন না কিংবা পারবেন না তারা। সবচেয়ে বড় যেটা পারবে না, সেটা হলো-বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না, দেশকে সামান্যতম ভালোবাসি আমরা।
লজ্জা
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার পৌরসভার মেয়র সুন্দর আলী সুন্দর একটা কথা বলেছেন, 'জনগণের কাছে কর চাইতে লজ্জা লাগে। না পারি জনগণকে পানি দিতে, না পারি বর্জ্য পরিস্কার করতে। রাস্তা নির্মাণ ও মেরামত করতে পারি না।'
লজ্জা লাগে আমাদেরও-কী নির্লজ্জ একেকটা মুখ! চোখের মাথা খেয়ে বারবার বলেন, 'আমাকে নির্বাচিত করলে...।
কেবল নিশপিশ করে হাতটা, লজ্জায় কিছু করতে পারি না আমরাও।
লেখক ও সাংবাদিক

বিষয় : বাউণ্ডুলে

মন্তব্য করুন