দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও আমাদের সতর্কতা

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ঘটে যাওয়া সহিংস কর্মকাণ্ড যেভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, সেটি ভয়ংকর। ভারতে গত কয়েক দশকে ঘটে যাওয়া ছোটখাটো বিভিন্ন সংঘাতের চেয়ে এ ঘটনা কয়েক গুণ ভয়ানক ও উদ্বেগজনক। এখন পর্যন্ত পুলিশসহ ৩৪ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। আহতের সংখ্যাও দুইশ' ছাড়িয়ে গেছে বলে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। আমরা দেখেছি, দিল্লির বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক বেশি। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলেছেন, তারা এই দাঙ্গার মধ্যে ২০০২ সালে ঘটে যাওয়া গুজরাটের দাঙ্গার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিগত শাসনামলে সাম্প্রদায়িক রূপ আমরা দেখলেও এতটা প্রকট আকার ধারণ করেনি। এবার নির্বাচিত হয়ে নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপির সাম্প্রদায়িক রূপ অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গোহত্যার মিথ্যা অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে হতদরিদ্র মুসলমানদের ওপর হিংস্র আক্রমণ চালানো হয়েছে, যার ধারণ করা ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। বারবার এ রকম নৃশংস ঘটনা ঘটলেও এসব হত্যাকাণ্ডের ফলে কারও শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ভারতের ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। ৭০০ বছরের মুসলিম শাসনামলকে অত্যাচারী দখলদারি শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। মুসলিম শাসনামলের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন করে সেগুলোকে বৈদিক যুগের নামে নামকরণ করা হচ্ছে। যেমন এলাহাবাদ শহর নাম বদল করে 'প্রয়াগ নগর' করা হয়েছে। বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় উগ্রবাদী হিন্দুদের ব্যাপক সমর্থন লাভ করলেও সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে তা ভীষণভাবে হতাশ করেছে।
বস্তুত ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারাভিযানের শুরু থেকে বিজেপির মুখপাত্র অমিত শাহসহ অনেক নেতাই ভারতজুড়ে সম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছিলেন। যদিও ভারতের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনগণ বিশেষত তরুণ সমাজ শুরু থেকেই এ ধরনের প্রচারাভিযানের বিরোধিতা করে আসছিল। কিন্তু নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার বাহন হিসেবে বিজেপি সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদকেই ব্যবহার করেছে। নির্বাচনে জয়লাভের পর আমরা দেখেছি, প্রথমে শুরু হয় আসাম দিয়ে। সেখানে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধনের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল মূলত আসামের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বসবাসরত গরিব মুসলমান কৃষকদের টার্গেট করে, যারা শত শত বছর ধরে আসামে বসবাস করে আসছে। কিন্তু তা হিতে বিপরীত হলো। আসামে এনআরসি প্রতিবেদন বের হওয়ার পর দেখা গেল, প্রায় ২০ লাখ নাগরিক যারা বৈধতা পায়নি তাদের মধ্যে ১২ লাখই বাঙালি হিন্দু, যারা ভারত বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে গিয়েছিল। বাকিদের মধ্যে কয়েক লাখ ছিল উপজাতি বা আদিবাসী, যারা যুগ যুগ ধরে আসামে বসবাস করে আসছিল; এমনকি অনেক বাঙালি হিন্দু যারা স্বাধীনতাপূর্বকাল থেকেই আসামে বসবাস করে আসছিল। তাদেরও অনেকে এনআরসিতে নাগরিকত্ব হারাল। এর ফলে অমিত শাহ ঘোষণা করলেন, আবার এনআরসি হবে এবং ভারতজুড়েই এ নাগরিকত্ব নিবন্ধন হবে। তিনি বলেছিলেন, কোটি কোটি মুসলমান ভারতে প্রবেশ করেছে। এমনকি এও বলেছেন, সেসব বাঙালি ভারতের অর্থনীতিকে 'কীট'-এর মতো ধ্বংস করছে।
এর পর বিজেপি থেকে নতুন এক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলো, যা ভারতীয় সংসদে সিটিজেন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বা নাগরিকত্ব সংশোধন বিল নামে উত্থাপন করা হলো। কংগ্রেসসহ বিরোধী দল এর বিরোধিতা করে আসছিল। ভারতের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, সাংসদ, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব ভারতজুড়ে এর প্রতিবাদ করেন। এই বিলে বলা হয়েছিল, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে যেসব হিন্দু ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত ভারতে গেছে, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। দেশজুড়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এর প্রতিবাদ জানানো হয়। তাদের বক্তব্য, এই অবস্থানটি ভারতের গণতান্ত্রিক আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশ সরকারও এর প্রতিবাদ জানিয়েছে এই বলে যে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে। ফলে অত্যাচারিত হয়ে দলে দলে দেশত্যাগের কথা মিথ্যা প্রচারণা বৈ কিছু নয়। একই সঙ্গে কোটি কোটি বাংলাদেশির অত্যাচারিত হয়ে ভারতে প্রবেশের কথা বলা সত্যের অপলাপ; সেই সঙ্গে দুই বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে চিড় ধরানোর জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির অপচেষ্টা।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পাটনায়কসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের সরকারপ্রধান এই বিলটির বিরোধিতা করেছেন। তা সত্ত্বেও কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরে বিজেপি বিলটি ভারতীয় সংসদে পাস করিয়ে একে 'অ্যাক্টে' (সিটিজেন অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) পরিণত করে। শুরু থেকেই দিল্লিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিত তরুণ সমাজ এ আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। দিল্লির জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয়, যেটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি ও সমাদৃত, সেখানকার শিক্ষার্থীরা সরব ছিল সবচেয়ে বেশি। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিল্লিয়া। যদিও এ আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার ধারক-বাহকদের; যাদের প্রতিবাদের ভাষাও ছিল অত্যন্ত শালীন ও শান্তিপূর্ণ। অথচ বিজেপি ও তার অঙ্গ সংগঠন এ আন্দোলনকে প্রথম থেকেই সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।
দিল্লির গত কয়েক দিনের সহিংসতা মূলত সেখানকার শান্তিপূর্ণ নাগরিকের ওপর বিজেপির অঙ্গ সংগঠন বাজরা দল ও আরএসএসের গুণ্ডাবাহিনীর আক্রমণের ফল। বিভিন্ন এলাকায়, যেখানে হিন্দু ও মুসলমান দীর্ঘদিন ধরে একই মহল্লায় সুন্দরভাবে ্বসবাস করে আসছিল; সেখানে মসজিদ, মন্দির ও গুরুদুয়ারা পাশাপাশি অবস্থান করছিল। এ ঘটনা সেখানে মুসলমানদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেছে বেছে টার্গেট করে আগুন লাগানো হয়। এ ঘটনায় দিল্লির হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষ শান্তিপ্রিয় জনগণ হতভম্ব। একই সঙ্গে দাঙ্গা দমনে পুলিশের নিষ্ফ্ক্রিয়তা দেশ-বিদেশে সবার নজরে পড়েছে।
বস্তুত সম্প্রতি দিল্লির নির্বাচনে আম আদমি পার্টির নিরঙ্কুশ বিজয় কেন্দ্রীয় সরকার ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে রাজধানীতে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচিত সরকারের বদলে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রচলনের এ এক অপচেষ্টা বলে অনেকের ধারণা। তবে ভারতের আপামর জনগণ এসব সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের লালিত গণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনবে।
একই সঙ্গে আমাদের সাবধান থাকতে হবে, ভারতের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এখানকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার অপচেষ্টা যাতে না করে। অতীতে আমরা লক্ষ্য করেছি, সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যে কোনো অজুহাতে দুর্বল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের মূল লক্ষ্যই হলো সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি, ঘরবাড়ি হস্তগত করা। ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ করে তারা ত্রাসের রাজত্ব কয়েম করতে চায়। এর উদাহরণ আমরা কক্সবাজারের রামু ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেখেছি।
আমি আশা করব, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশের সর্বত্র কঠোর নজর রাখবে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টকারী ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে পিছপা হবে না। সেই সঙ্গে মিডিয়াসহ সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সামাজিক সচেতনতামূলক কাজ করে যাবে। এই মুজিববর্ষে আশা করি, বঙ্গবন্ধুর ধ্যান-ধারণার বিপরীতে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হবে না।
  নিরাপত্তা বিশ্নেষক; অসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর; ট্রেজারার, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

বিষয় : প্রতিবেশী