প্রতিবেশী

ভারত-মার্কিন সম্পর্কের নিবিড় অভিসার

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২০     আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অয়নাংশ মৈত্র

ট্রাম্প হলেন সপ্তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ভারত সফরে এলেন। অভিশংসনে (ইম্পিচমেন্ট) বেকসুর খালাস পাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ সফর ছিল স্বাভাবিকভাবেই রঙিন। আহমেদাবাদ থেকে তাদের গন্তব্য ছিল আগ্রা। আগ্রার তাজমহল দেখে অভিভূত হয়ে নয়াদিল্লি। কড়া নিরাপত্তার বলয়ে ছিল এই তিন নগরী। তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন, বুশ ও ওবামার স্মৃতিধন্য দিল্লির আইটিসি মৌর্য হোটেলের চাণক্য সুইটে রাত্রিনিবাস করেন ট্রাম্প। সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, বেসরকারি সংস্থার প্রধানসহ বিভিন্ন নেতার সঙ্গে মোলাকাত করেন রাষ্ট্রপতি ভবন ও হায়দরাবাদ হাউসে।

মোদি ও ট্রাম্প- দক্ষিণপন্থি দুই নেতার নেতৃত্বের মিলও অনেক। সফরের প্রথম দিনেই ছয়বার আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন এই যুগল। শুল্ক্ক, বৌদ্ধিক সম্পদ, ফাইভজি, ডেটা নিরাপত্তা এবং কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে আলোচনা হয় দুই সরকারপ্রধানের। মোদিকে 'টাফ নেগোশিয়েটর' বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। আমেরিকান কোম্পানিগুলো ভারতে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়, তা নিয়েও মোদির সঙ্গে কথা বলেন রিপাবলিকান নেতা। শিগগিরই বাণিজ্যিক চুক্তি সই করতে চলেছে দুটি দেশ। তাদের যৌথ বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আগের থেকে আরও মজবুত এবং তা বর্তমান দুই নেতার কারণেই। ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী কর্মসূচির উল্লেখ করেন তিনি।

ট্রাম্প সরকারে আসার তিন বছরের মধ্যেই ভারতে মার্কিন রপ্তানি ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। শক্তি খাতে রপ্তানি বেড়েছে ৫০০ শতাংশ। আমেরিকার অশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান আমদানিকারকদের মধ্যে ভারত রয়েছে প্রথম সারিতে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের ব্যবসার সবচেয়ে বড় অংশীদার। পণ্য ও পরিষেবা মিলিয়ে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১৬০ বিলিয়ন ডলারের। দুটি দেশের মধ্যে প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যিক ঘাটতি থাকলেও, বাণিজ্যিক সম্পর্কে ভারসাম্য এসেছে বলে ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। আপেল, ওয়ালনাট, চিকিৎসার সরঞ্জাম, সর্বোপরি হারলে ডেভিডসন নিয়ে অধিক কর চাপানোয় ভারতের প্রতি অসন্তুষ্ট হয় ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, আমেরিকার প্রবল চাপে ইরান ও ভেনিজুয়েলার সঙ্গে ব্যবসা কমাতে বাধ্য হয় ভারত। বিনামূল্যে বীমা, সহজ পরিবহন, নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনসহ নানাবিধ সুবিধা মিলত ইরান থেকে খনিজ তেল ও জ্বালানি ক্রয়ে। ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব যখন চরমে, ভারতের ওপর চাপ দেয় মার্কিন প্রশাসন। এমনকি যথেষ্ট প্রভাব পড়ে ভারতের বাজারে, বেড়ে যায় স্বর্ণের দাম। মেরুদণ্ড ঋজু রাখে নয়াদিল্লি। তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিবিড়তায় ভারসাম্য আনে ভারতের কূটনীতি মহল সাউথ ব্লক। প্রেসিডেন্টের দিল্লি সফরকালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অধিক আমদানির জন্য ইন্ডিয়ান অয়েল একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে মার্কিন সংস্থা এক্সন মবিলের সঙ্গে।

ব্যবসা, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক বিষয় ব্যতিরেকে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের নিবিড়তা ভারতের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা, সৈনাপত্য ও কৌশলগত কারণে। ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় প্রেসিডেন্টের এ সফর দু'দেশের সম্পর্কে এক অন্য মাত্রা আনে। এই চুক্তি ভারতকে ২৪টি সিহক রোমিও আন্টি ওয়ারফেয়ার সাবমেরিন ও ছয়টি আক্রমণাত্মক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার দিয়ে শক্তিশালী করে তুলবে। মূলত চীনের আগ্রাসী মনোভাবকে প্রতিহত করতে এটি সময়োচিত পদক্ষেপ। এ ছাড়া ১.৯ বিলিয়ন ডলারের মিসাইল প্রতিরক্ষা নিয়ে কথা চলছে এ দুই কৌশলগত সহযোগীর মধ্যে। ভারতে ছয়টি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্যও আমেরিকা সহায়তা প্রদান করছে।

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ভারত ও আমেরিকার বিশেষ উদ্বেগের কারণ। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে মোকাবিলা করতে আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার ব্লুডট নেটওয়ার্ক তৎপর। এই দেশত্রয় ও ভারতের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে কোয়াড। অন্যদিকে, চীনের দক্ষিণ চীন সাগরসহ মহাসমুদ্রে সম্প্রসারণাত্মক মনোভাব বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন তোলে। আমেরিকা ভারতের এশিয়া প্যাসিফিককে ইন্দো-প্যাসিফিক নামকরণে সমর্থন করেছে। কৌশলগত অংশীদার বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টু প্লাস টু ডায়লগের পাশাপাশি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডায়লগকে গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত ও মার্কিন প্রশাসন। রাশিয়াকে ছাড়িয়ে আমেরিকা এখন ভারতের প্রধান অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের জোগানদার। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সেনাবাহিনীর মহড়া হচ্ছে ঘন ঘন।

নানা বৈসাদৃশ্য, বিভেদ ও বৈপরীত্বের প্রাবল্য সত্ত্বেও ভারত ও আমেরিকা দুটি দেশই তাদের সাদৃশ্য ও সাযুজ্য সামনে রেখেছে। দুই প্রান্তের দুই দেশকে জুড়ে রেখেছে তাদের গণতন্ত্রের বাঁধুনি। ভারত-মার্কিন অসামরিক চুক্তির পর ভারত-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এসেছে নতুন মোড়। কূটনীতির পরিভাষায়, দুটি দেশ হয়েছে 'ন্যাচারাল পার্টনার'।

ট্রাম্পের সফরের সময়েই নাগরিক সংশোধনী আইন নিয়ে দ্বেষ জ্বালাচ্ছিল দেশ। রোষানলে ঘৃতাহুতি দিচ্ছিল ধর্মীয় মৌলবাদ। আগুনে যা পুড়ছে তা হলো- ভারতের চিরায়ত সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি।

দু'দিনের ভারত সফরে ঘটনাবহুল ৩৬ ঘণ্টা কাটিয়ে চমকের প্রত্যাশীদেরকে কিঞ্চিৎ আশাহত করেই চলে গেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সই হলো না বাণিজ্যিক চুক্তিও। সাবমেরিন আর কপ্টার চুক্তি বাদে রেখে গেলেন বেশ কিছু প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতি। এ সফর মূলত সৌজন্য সফরই থেকে গেল?

ভারতীয় সাংবাদিক, কূটনীতি ও সংবাদমাধ্যম গবেষক