আমরা বরাবর দেখে এসেছি, বাংলাদেশে যখন যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাদের ছত্রছায়ায় বেশ কিছু সুবিধাভোগী মানুষ বেড়ে ওঠে। তাদের সদম্ভ পদচারণায় আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠি, যতক্ষণ না কোনো বড় ধরনের স্ক্যান্ডাল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বা হতে পারে। এসব ঘটনার নিষ্পত্তি ঘটে কেবল তখনই, যখন ক্ষমতাসীন দল সেসব ব্যক্তির প্রতি সমর্থন উঠিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, যুবলীগের নেতা সম্রাট হয়ে শামিমা নূর পাপিয়া এখন আলোচনার শীর্ষে। তিনি যুব মহিলা লীগের নরসিংদী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাপিয়াকেন্দ্রিক খবর ও মন্তব্য দেখে মনে হতে পারে যে, পাপিয়াই বুঝি একমাত্র ব্যক্তি, এ দেশে যিনি এমন ভয়ংকর অপরাধ করেছেন। পাপিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশিত খবর ও মন্তব্য জোয়ারের পাশাপাশি ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে নানা পদস্থ ব্যক্তির নাম ও যোগসাজশের খবর সামাজিক মাধ্যমে। এসব নামের সত্যাসত্য যাচাইয়ের উপায় নেই; তবে এসব নাম পাপিয়া-চর্চা পর্বকে আরেকটু রসালো করে উপস্থাপনের জন্যই কেবল ভাবার অবকাশ রয়েছে।

পাপিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশিত এসব একচেটিয়া খবরের পাশাপাশি ক্ষীণস্বরে প্রশ্ন উঠেছে, পাপিয়ার আজকের এই অবস্থান কি কেবল পাপিয়ারই নির্মাণ? দোষ কি শুধুই তার বা কেবল তাকে দোষারোপ করেই কি এই জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে? এই ক্ষীণস্বর প্রশ্নকারীদের মধ্যে আমিও একজন।

ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে থাকার কারণে যে অর্থ ও ক্ষমতার সম্পর্ক আমরা দেখি, তা একদিনে গড়ে ওঠে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় অনেকেই জড়িত থাকেন। পাপিয়া একটি রাজনৈতিক সংগঠনের জেলা পর্যায়ের একজন নেতা হয়ে এত টাকা কোথায় পেলেন যে, হোটেল ওয়েস্টিনে তিন কোটি টাকার বিল পরিশোধ করলেন? ওয়েস্টিন ধনীদের জায়গা। পাপিয়া ওই হোটেলে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কাজ করে আসছিলেন, তা কি হোটেল কর্তৃপক্ষ জানে না? হোটেল কর্তৃপক্ষ জানে তো বটেই, এসব হোটেলে এমন সব কাণ্ড নির্বিবাদে চলার ব্যবস্থা করেও রেখেছে। সেই ব্যবস্থার ব্যবহার করে পাপিয়া অপরাধী সাব্যস্ত হলেন; কিন্তু গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যম কোথাও এই হোটেল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য শোনা গেল না।

পাপিয়া একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী। তার দল কি জানত না যে, তিনি এসব কাজ করছেন? এর আগে সম্রাটের ক্ষেত্রেও দেখেছি, যেন-বা কেউ কিচ্ছুটি জানেন না। যখন কেউ ধরা পড়েন তখন জড়িত সবাই হাত ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন হওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ সত্য তো এই যে, সম্রাট-পাপিয়ারা এই পর্যায়ে আসতে পেরেছেন তাদের পেছনের ক্ষমতা কাঠামোর পৃষ্ঠপোষকতায়। আমাদের দেশের রাজনীতি মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসি, সিভিল ব্যুরোক্র্যাসি ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে বাঁধা পড়ে গেছে। এর ফলে রাজনীতিটা আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। যেখানে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এসব তরুণ-তরুণীর মধ্যে নৈতিকতার জায়গাটি শক্তিশালী থাকার কথা, সেটাই নেই। মূল সমস্যাটি হলো, দীর্ঘকাল ধরে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরাজনীতিকরণের এক ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ফলে দেখা যায়, যারা রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী মনোনয়ন পান, তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধনকুবের বা পেশিশক্তির অধিকারী। ফলে তরুণ রাজনীতিকরাও জেনে গেছেন যে, মনোনয়ন পেতে হলে তাদের পেশিশক্তির ব্যবহার জানতে হবে এবং প্রচুর অর্থ থাকতে হবে, কোন পথে উপার্জন সেটি বড় কথা নয়।

আর এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তারা বেড়ে উঠছেন। আমি প্রশ্ন করতে চাই, আমাদের দেশের একদিকে রাজনীতিহীনতা এবং অন্যদিকে রাজনীতির মধ্যে যে অনৈতিক ধারাটিকে প্রসারিত করা হচ্ছে, সেটিকে। এ বিষয়ে প্রশ্ন না তুলে কেবল ব্যক্তি পাপিয়া, ব্যক্তি সম্রাটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব না।

কয়েক মাস আগে খোদ ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দুর্নীতির অভিযোগে দল থেকে বহিস্কার করা হলো। যদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি প্রকাশ না হতো, তাহলে তারা কিন্তু বহালতবিয়তে থাকতেন। তাদের কর্মকাণ্ড কি দল জানত না? শোভন বা রাব্বানী কি মেধাবী ছিলেন না? বুয়েটে আবরারের হত্যাকাণ্ড আমরা দেখলাম। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতরা কীভাবে খুনি হয়ে উঠল? তারা তো মেধার স্বাক্ষর রেখেই বুয়েটে ভর্তি হয়েছিল। কোন সে যন্ত্ররমন্তর ঘর, যার মধ্যে মেধাবী সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢুকলেই এমন নীতিহীন দানবে পরিণত হন এবং ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত বহাল-তবিয়তে থাকেন? এ পরিস্থিতির জন্য তাই আমি প্রথমত বিদ্যমান মূলধারার রাজনৈতিক প্রকরণকে দায়ী করি। আমি মনে করি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সঠিকভাবে চলছে না। রাজনীতি হারিয়ে গেছে বলেই লুটপাট, পেশিশক্তি, অনৈতিক ক্ষমতাবলয় প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্রের তদারকির জায়গাটি তাহলে কোথায়? আমি মনে করি না যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্রাট বা পাপিয়ার এসব বিষয় জানত না। অথচ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও রাজনীতিকরণ কিংবা সরকারীকরণের আওতায় চলে গেছে। ফলে তারাও এ ধরনের নেতাকে এসব কাজে সহায়তা করতে বাধ্যও হন। পিরোজপুরের ঘটনায় আমরা ফের এমন বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করলাম। সেখানে দুর্নীতির মামলায় সাবেক একজন সংসদ সদস্য ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। সেদিন বিকেলেই সেই বিচারককে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার জায়গায় নতুন বিচারক এসেই তাকে জামিন দিয়েছেন। একজন বিচারকের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পুলিশের সঙ্গে কী ঘটতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় রয়েছে। আশা ছিল, দলটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একটি শুদ্ধি অভিযান চলমান। কিন্তু যুবলীগ-ছাত্রলীগের একজন-দু'জনকে ধরে বা সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের যে ক্ষমতার বলয়, প্রতিপত্তি ও দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো বন্ধ করা যাবে- এমন নয়। আমরা অন্য দল ক্ষমতায় থাকতেও দেখেছি যে, তাদের ছাত্রনেতারা হলে থাকতেন ভাড়া না দিয়ে। তারা শহরের জায়গা ভাগ করে নিয়ে চাঁদা তুলতেন। রাজনৈতিক দলের সবুজ সংকেত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে চাঁদা-সন্ত্রাস চালু থাকে। এসব ব্যাপার ততক্ষণ পর্যন্ত জনপরিসরে আসে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এসব অপকর্মের তথ্য ফাঁস না হয়।

ফলে কেবল এক পাপিয়ার দিকে ঢিল ছুড়ে লাভ নেই। দেশের ছত্রে ছত্রে অনেক পাপিয়া তৈরির পৃষ্ঠপোষকতা চলছে। রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম অনেক বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছে। সামান্য পাপিয়ার কিন্তু এত দূর আসারই কথা নয়। ক্যাসিনো আবিস্কার হলে চারদিকে হায় হায় রব উঠে গেল। এটা কি সম্ভব যে, ক্যাসিনোতে কোটি কোটি টাকার জুয়ার খবর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসন জানত না? সরকারের সবুজ সংকেত না থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ নিজের চাকরি, জীবন বা পরিবারকে বিপন্ন করে তাদের ধরতে যাবে না। সম্রাট বা পাপিয়াকে ধরতেই সরকারের একেবারে শীর্ষমহলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়েছে।

যখন কাউকে ধরা হয় তখন মন্ত্রীদের কেউ কেউ সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তাকে ধরা হয়েছে। সবকিছু যদি প্রধানমন্ত্রীকেই করতে হয় তাহলে এত মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রয়োজন কী? প্রধানমন্ত্রী কি ভুল করতে পারেন না? আমরা বিভিন্ন দেশে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির দুর্নীতির বিচার দেখেছি। বাংলাদেশেও এর নজির রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যদি ওই পর্যায়ের কেউ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হন, তাহলে তাকে ধরবে কে? তার বিচার করবে কে? প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্রাট বা পাপিয়ার মতো অপরাধীদের ধরা সম্ভব না হয়, তবে কি ধরে নেব যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই? পিরোজপুরের বিচারক বদলির ঘটনা বিচারকদের জন্যও একটি বার্তা। বিচার ব্যবস্থার এই হাল করা হলে মানুষ কোথায় আস্থা রাখবে!

উন্নয়ন স্লোগানে ভাসছে দেশ। অবকাঠামো, সড়ক, সেতু বা রেলস্টেশন উন্নয়নের বাহ্যিক কাঠামো মাত্র। মানুষের নৈতিকতার উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা ও স্বাধীনতা ছাড়া বাহ্যিক কাঠামোগত উন্নয়ন ক্যাসিনো ব্যবসা কিংবা ওয়েস্টিনে অনৈতিক ব্যবসাকে রমরমা রাখবে এবং ধরা পড়লে সম্রাট বা পাপিয়াকে জেলে পাঠাবে বড়জোর। আমাদের রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে রাজনীতিটাই করতে হবে। পাপিয়ার মতো যারা আছেন এবং তাদের যারা প্রশ্রয়দাতা, তাদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। পাপিয়া দোষী অথচ পাপিয়ার সেবা গ্রহণকারীদের নামও জানা যাবে না কখনও, এই পদ্ধতি চরম পুরুষ ও পুঁজিতান্ত্রিক। চরম পুরুষ ও পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রাজনীতির মধ্যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় বহাল রেখে আর যাই-ই হোক, সমাজ আর রাষ্ট্রদেহে যে ক্ষত, যে পাপ জমা হয়েছে, সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা নেই। তাই বলি, কেবল পাপিয়ার দিকে নয়, ঢিলগুলো পাপের দিকেও ছোড়া চাই।

অধ্যাপক; চেয়ারপারসন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়