মুজিববর্ষে আমরা 'বঙ্গবন্ধু'কে নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান করছি। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর জীবন ও কর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে নানা আলোচনা বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রপত্রিকা, টিভি-বেতার, সোশ্যাল মিডিয়া, সভা-সমিতি, ক্লাস-সেমিনারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সমগ্র জাতি ১৭ মার্চ সামনে রেখে এক ধরনের প্রহর গণনা শুরু করেছে। এই সর্বব্যাপী আবেগময় আলোচনা অতীতে দেখা যায়নি। আমরা গান্ধীর কথা জানি, লেনিনের কথা জানি, মাওয়ের কথা জানি। কাস্ত্রোর কথা জানি। এঁদের সবারই নিজ নিজ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক দর্শন ও স্বপ্ন ছিল। সমগ্র জাতিকে তাঁরা পরিচালনা করেছেন, নিজ নিজ দর্শন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন এবং জাতি গৌরবান্বিত হয়েছে; তাঁদের স্বপ্নও নানা মাত্রায় সফল হয়েছে। আবার ইতিহাসের যুগপরিক্রমায় সূর্য অস্তগামীও হয়েছে। আবেগময় আলোচনার স্থান দখল করেছে নিরাসক্ত সমালোচনা-পর্যালোচনা। কিন্তু তাঁদের দেশের সাধারণ মানুষ তাঁদেরকে আজও একদম ভুলে যায়নি। শুভবুদ্ধির লোকেরা তাঁদের কল্যাণমূলক অবদানটুকু আজও ভক্তিভরেই স্মরণ করে থাকেন। বঙ্গবন্ধু এই গোত্রেরই সদস্য ছিলেন। তাঁকে আমাদের স্মরণ করতে হবে আবেগভরে, আবার নিরাসক্তভাবেও।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল 'সোনার বাংলা'র স্বপ্ন এবং 'দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো'র স্বপ্ন। অসংখ্যবার তিনি এ কথা উচ্চারণ করেছেন। তাঁর এই ব্যক্তিগত আবেগ প্রশ্নাতীত সত্য। প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি এ ক্ষেত্রে অন্যদের মতো সফল হয়েছিলেন? জাতি কি সত্যই তাঁর এই স্বপ্নদর্শন দ্বারা এখনও উদ্বুদ্ধ হয়, নাকি যেটা আমরা দেখছি তার বেশ কিছুটাই ফাঁপা আবেগমাত্র? তাঁর আবেগের বিষয়কে বাদ দিয়ে আমরা কি এখন তাঁকে নিয়েই বেশি আবেগ প্রদর্শন করছি?

আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন সামরিক বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য তাঁকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, তার আগে তিনি 'দ্বিতীয় বিপ্লব'-এর ডাক দিয়ে জাতিকে একটি বৈপ্লবিক বা আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এটাই ছিল তাঁর বিচারে বাংলার জনগণকে সুখী করার ঈপ্সিত পথ। তিনি 'ঔপনিবেশিক প্রশাসন' ও 'ঔপনিবেশিক কৃষিব্যবস্থা'র আমূল পরিবর্তনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে এক দল 'বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ'-এর তলে সমবেত হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, এই একদলীয় ব্যবস্থাটি ছিল 'শোষিতের গণতন্ত্র'। যদি আমরা সততার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সমাজদর্শন বা অর্থনৈতিক এই দর্শনটি তুলে ধরতে চাই, তাহলে এখান থেকে আমাদের ভাবনাকে শুরু করতে হবে। তাহলে আমরা তাঁর আর্থ-সামাজিক দর্শনের অনেক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করব। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ-

তিনি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। সেই ১৯৫২ সালে চীন ভ্রমণের সময় থেকে। তাঁর সমাজতন্ত্র ধ্রুপদি মার্কসবাদী সমাজতন্ত্র ছিল না। তিনি শ্রমিক শ্রেণির পার্টি বা চীনের কমিউনিস্টদের একনায়কত্ব চাননি। চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সব দেশপ্রেমিক শক্তির সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো করে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করতে। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছিলেন। সমাজে অল্প লোকের হাতে ব্যাংক-বীমা-বৃহৎ ও ভারী শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শত শত বিঘা জমি ইত্যাদি কেন্দ্রীভবনের বিরোধী ছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, ১৯৬৯-এর ১১ দফা এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে এসব কথা বারবার এসেছে। তিনি ব্যক্তিমালিকানায় সম্পদের সিলিং বা সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। ১৯৭২-এর সংবিধানে তা আছে। সমবায় ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। 'দ্বিতীয় বিপ্লব'-এর বক্তৃতাগুলোতে তা আছে। তিনি শোষণবিরোধী ছিলেন। অনুপার্জিত আয়বিরোধী ছিলেন। তিনি জনকল্যাণের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র, গৃহ, কর্ম ও নিরাপত্তাকে বাজারের পণ্য নয় বরং প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।

তুলনামূলক বিচারে আমার কাছে মনে হয়, তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন ছিল সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বা কল্যাণ ধনতন্ত্রের দর্শন। তাঁর এই দর্শন বাংলাদেশের সংবিধানের আদি অসংশোধিত রূপের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই '৭২-এর সংবিধান কার্যকরী করা সম্ভব হলে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন কার্যকরী হবে। কিন্তু তা কার্যকরী করা মোটেও সহজ নয়। পুঁজিপতি শ্রেণি, বিশেষ করে লুটেরা পুঁজিপতি শ্রেণি, সব শোষক শ্রেণি, উচ্চাভিলাষী উঠতি মধ্যবিত্ত, অসৎ রাজনৈতিক নেতা, অসৎ ব্যবসায়ী ও অসৎ আমলাতন্ত্র (সিভিল ও মিলিটারি) তাঁর উল্লিখিত অর্থনৈতিক দর্শনের প্রবল বিরোধিতা করবেন। বর্তমান আওয়ামী লীগও তার বিরোধিতা করবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমৃত্যু কথা, বক্তৃতা, জীবন-সংগ্রাম, লেখনী ঘাঁটলে এসব বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। এর পরও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা বা প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে আমি বলব, শ্রমিক-কৃষক-নিম্নবিত্ত জনগণ ও সৎ (বুদ্ধিজীবী+ব্যবসায়ী+আমলা+রাজনৈতিক) নেতৃত্ব যদি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের শত্রুদের প্রতিরোধ করতে না পারেন, তাহলে বঙ্গবন্ধুর এই অর্থনৈতিক দর্শন আগে যেমন পরাজিত হয়েছিল, এখনও তেমনি পরাজিতই থাকবে। এর পরও মহৎ সংগ্রামে শহীদ হওয়ার মর্যাদা বঙ্গবন্ধুর থাকবে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন কার্যকরী করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। শত্রুরা বুঝতে পেরেছিল, 'বাধ্যতামূলক সমবায় ও তেভাগা পদ্ধতি' যদি কার্যকর হয়, যদি 'নির্বাচিত গভর্নররা' বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসন গঠন করে ফেলেন, রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য যদি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে চলে যায়, তাহলে প্রগতির ধারা টেকসই হয়ে যাবে। এই সুযোগ ও সময় প্রতিক্রিয়াশীলরা বঙ্গবন্ধুকে দিতে চাননি। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরাও তখন তাঁকে ভুল বুঝেছি। তাঁকে রক্ষা করতে জাতি এগিয়ে আসেনি।

সবচেয়ে হাসি পায় যখন দেখি তখন যারা শতমুখে বঙ্গবন্ধুর নিন্দা করতেন, তারাই মুজিববর্ষে শতমুখে তাঁর প্রশংসা করছেন। এই ভণ্ডামি দেখেই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, '১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর কে কোথায় ছিলেন, তা আমার দেখা আছে।' এই ছোট প্রবন্ধটি শেষ করার আগে দুটি উদ্ৃব্দতি পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই। একটি হচ্ছে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর উদ্ৃব্দতি। আব্দুল মান্নান (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান) দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত 'সত্য কথা তো সকলে পছন্দ করে না' (২৭ জুন ২০১৯ সংখ্যা) লেখায় লিখেছেন- '১৯৭৫ সালে সংসদে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, আওয়ামী লীগ একটি মাল্টি-ক্লাস পার্টি। আমি তার নামের আগে কৃষক শ্রমিক লাগিয়েছি বৈকি, কিন্তু দলটির চরিত্র এখনও বদলাতে পারিনি, রাতারাতি সব সম্ভবও নয়। আমার দলে নব্য-ধনীরাও আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় তাদের লুটপাটের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমি তাদের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যই বাকশাল করেছি। যদি এই ব্যবস্থা সফল করতে ব্যর্থ হই এবং আমার মৃত্যু ঘটে, তাহলে দলকে কবজা করে ওরা আরও লুটপাটে উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে। এমনকি শত্রুপক্ষের নীতি ও চরিত্র অনুসরণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের মূলমন্ত্র, এমনকি আওয়ামী লীগের চরিত্র ও নীতি পাল্টে ফেলতে পারে। যদি তা হয়, সেটাই হবে আমার দ্বিতীয় মৃত্যু। সে জন্য আগেই বলেছি, আমার দল, আমার অনুসারীদের হাতেই যদি আমার এই দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে, তাহলে দীর্ঘকালের জন্য বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে যেতে হবে। কবে ফিরব তা জানি না।'

উপরোক্ত উদ্ৃব্দতিতে বঙ্গবন্ধু ভুল বলেছেন। 'বিস্মৃতির অন্ধকারে' তাঁকে যেতে হয়নি; হবেও না। লুটেরা শাসক শ্রেণি ও প্রতিক্রিয়াশীলরা শাসক দল আওয়ামী লীগকে পাল্টে দিয়ে বা হটিয়ে দিলেও বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা চিরসবুজ আছে এবং থাকবে। আর সেই কথাটা স্বীকার করেছেন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের কট্টর শত্রু, আরেকজন রাজনৈতিক নেতা স্বয়ং মওদুদ আহমদ। মওদুদ আহমদ বলছেন- 'এটা অবিসংবাদিত সত্য যে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত সময়ে শেখ মুজিব অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে হাত দিয়ে বেশ কয়েকটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দান করেছিলেন। তিনি প্রশাসনিক কাঠামো থেকে শুরু করে ভূমিস্বত্ব পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রের কতগুলো অচল ব্যবস্থা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আগামী দিনগুলোতে যে ধরনের সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন; মৌলিক এই সমস্যাগুলো থেকে যাবে সমস্যা হিসেবেই এবং গোটা জাতির সামনে এগুলো বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হিসেবেই অবস্থান করবে। আদর্শবান যাই থাকুক না কেন, ভূমিস্বত্বের ব্যবস্থা প্রকৃত উৎপাদক কৃষকদের অনুকূলে নিয়ে না এসে এবং প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব ছিল না। যে দেশে ভূমি ও জনসংখ্যার অনুপাত ১ : ০.৩২ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশের বেশি লোক ভূমিহীন ও দরিদ্র এবং জীবনযাত্রার নিম্নতম স্তরে অবস্থান করে, সেখানে নূ্যনতম সময়ে জনগণের এই ঘোরতর সমস্যা সমাধানের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই বিবেচনা করতে হবে।' [দেখুন, মোহাম্মদ হান্নান, (২০১৩) 'শত্রুর চোখে বঙ্গবন্ধু', অনিন্দ্য প্রকাশনী, ঢাকা, পৃ. ৮৫]

সুতরাং বঙ্গবন্ধু মূলে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজটা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'র মতো 'দ্বিতীয় বিপ্লব' এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : এম এম আকাশ মুজিববর্ষ

মন্তব্য করুন