প্রতিবেশী

ভারতে মৌলবাদী উত্থানে বাংলাদেশের বিপদ

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

গৌতম রায়

গুজরাট গণহত্যার সময়কালে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শিবিরের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা। আর এখন তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে। দিলিল্গ গণহত্যার ভেতর দিয়ে তারা একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টিকে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দ্বারা চিরস্থায়ী করতে চায়, তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তিকে সব রকমভাবে উৎসাহ দিয়ে ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে প্রতিষ্ঠিত সত্যের ওপর দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করে চলেছে।
এভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশকে সর্বাংশে ধ্বংস করে, আন্তর্জাতিক স্তরে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির পক্ষে একটা বড় রকমের সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় ভারতের হিন্দুবাদীরা। নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি রাষ্ট্রশক্তিকে বগলদাবা করে ভারতবর্ষের বুকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তাতে গোটা ভারতের সংখ্যালঘু ধর্মনিরপেক্ষ বিবেক আতঙ্কিত।
দিলিল্গ গণহত্যা চলাকালীনই পূর্বাঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ভুবনেশ্বরে একটি বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোর নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলাপ-আলোচনার কথা ছিল। তিস্তার মতো আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রেখেছেন। এভাবে একদিকে তিনি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভয়ংকর প্রতারণা করছেন; অন্যদিকে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিকে বাংলাদেশের প্রশাসনের অপদার্থতার গালগল্প ফেঁদে ভারতবিদ্বেষ তথা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুবিদ্বেষকে চাগিয়ে দিচ্ছেন। ফলে ভারতবর্ষের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর রাজনৈতিক হিন্দুদের অত্যাচারের মাত্রাটিকে আরও বল্কগ্দাহীন করে তোলার জন্য একটি ধারাবাহিক কর্মসূচি পালিত হয়ে চলছে।
ভুবনেশ্বরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির দ্বারা দিলিল্গতে ভয়াবহ মুসলিমবিরোধী গণহত্যা সম্পর্কে নীরব থেকেছেন। তেমনি নীরব থেকেছেন তিস্তার পানি বণ্টন সম্পর্কেও। বস্তুত গঙ্গার পানি বণ্টন সম্পর্কে জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি রেখে একটি রাজনৈতিক মানসিকতা ভারতবর্ষজুড়েই ছিল।
এই মানসিকতার প্রতি অত্যন্ত উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষ ও প্রশাসন। সেই পরিস্থিতি বাংলাদেশে আজও বজায় আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিজেপির মতো ধর্মান্ধ রাজনৈতিক হিন্দু ও মুসলিমবিদ্বেষী রাজনৈতিক দল এবং তাদের ছদ্মবেশী সহযোগী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার রাজনৈতিক সঙ্গীদের বদান্যতায় সেই পরিবেশটি আর ভারতবর্ষে এখন বিদ্যমান নেই।
ভারতবর্ষের রাজনীতিতে এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, নয়ের দশকের শেষদিকে গঙ্গার পানি বণ্টন সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ভূমিকাকে সর্বাত্মকভাবে সমর্থন জানিয়ে, তার পেছনে একটি জনমত তৈরির উদ্দেশ্যে বামপন্থি দলগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশকে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিস্তার পানি বণ্টন সম্পর্কে ইচ্ছাকৃত অচলাবস্থা তৈরি করে একটি আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি করছেন। এই বিষয়টি সম্পর্কে মানুষের দরবারে পৌঁছে এটিকে একটি বৃহত্তর সামাজিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে, কেবল ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্কের বিষয়ই নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরে, কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ এমনকি নিছক একটি বিবৃতি পর্যন্ত বামপন্থি দলগুলো দিচ্ছে না।
অ-বিজেপি রাজনৈতিক দলগুলোও কিছু বলছে না। মমতার প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা এবং ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রশ্নে বামপন্থিরা যতখানি আন্তরিক, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য মমতার যে গোপন ষড়যন্ত্র, তা নিয়ে সরব হতে ভারতবর্ষে বামপন্থিদের প্রকাশ্যে সরব হওয়া নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ততা সত্যিই হতাশাজনক।
অতীতে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সরকার যখন প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ইসলামীয় জলসার নাম করে দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী থেকে বহু কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক প্রচার চালাত। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের, বিশেষ করে তাদের নতুন প্রজন্মের মানুষের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, পাকিস্তানপন্থি চিন্তাভাবনার উদ্রেক ঘটানোর চেষ্টা তারা করত।
সংশ্লিষ্ট বিষয়টি বর্তমান নিবন্ধকার পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে জানানোর পর তৎকালীন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী লোকজন যাতে পশ্চিমবঙ্গের বুকে বসে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালাতে না পারে, এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান প্রশাসকরা নিজেদের দলের সংসদের সঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মৌলবাদী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যক্ষ সংযোগ থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বাংলাদেশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারতবর্ষের সরকারকে জানানো সত্ত্বেও ভারত সরকার সেসব অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল ও তাদের দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, নূ্যনতম সতর্কবাণী উচ্চারণ করে না।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশকে যখনই বঞ্চিত করা হয়েছে, অতীতে অন্নদাশঙ্কর রায়, তাঁর জীবিতাবস্থায় কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। আজ দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানির প্রশ্নে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিনষ্ট করার প্রশ্নে, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তির সঙ্গে মৈত্রী তৈরির প্রশ্নে, বাংলাদেশকে গলাটিপে মারার যে প্রচেষ্টা ভারতবর্ষে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের একটি কায়েমি শক্তির ভেতরে ক্রমশ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে, সে সম্পর্কে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ প্রায় নিশ্চুপ।
বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রশ্নে, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে, গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রশ্নে এই নীরবতা কিন্তু ভারতবর্ষের রাজনৈতিক, হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী শিবিরকে শাসে জলে হয়ে উঠবার সব রকমের সুযোগ করে দিচ্ছে।
ভারতীয় গবেষক

বিষয় : প্রতিবেশী