স্বাধীনতা দিবস

একটি পতাকার লাগি

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

কাওসার চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধা সালাম শিকদার। খুলনার গল্লামারী খালপাড়ে তার নিবাস। দেখতে-শুনতে অসম্ভব শক্তিশালী একজন মানুষ। প্রশস্ত বুক, শক্ত দুটি বাহু। বয়স ষাটের কাছাকাছি। ১৯৯৭ সালে আমরা গিয়েছিলাম একটি প্রামাণ্যচিত্রের চিত্র ধারণ করতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে খুলনার গল্লামারী খালপাড়ে যে স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়েছে- তার বেদিতে বসে কথা হচ্ছিল সালাম শিকদারের সঙ্গে। একটা-দুইটা প্রশ্ন করতেই সালাম শিকদার এক লহমায় চলে গেলেন সেই একাত্তরে। নিজেই বলতে শুরু করলেন একাত্তরের কথা।

বয়স তখন আর কতই-বা অইবো, তিরিশের কাছাকাছি। বউয়ের কাছে দুইটা বাচ্চা রাইখা চইলা গেলাম যুদ্ধে। দিনের পর দিন খাইয়া না খাইয়া যুদ্ধ করছি, খারাপ লাগে নাই কোনদিন। কমান্ডার যেখানে থাকতে কইছে, থাকছি। গোয়ালঘরে রাত কাটাইছি কতদিন! গরুর গোবর খের (খড়) পেঁচাইয়া মাথার নিচে বালিশ বানাইছি। খেরের বালিশ মাথায় পাশে শুইয়া রইছে কমান্ডার টুকু ভাই, কাইয়ুম ভাই আরও কয়েকজন। হারা রাইত খালি 'চাইট মারি' (এপাশ-ওপাশ করি)। কিসের নিদ্রা, কিসের ঘুম? টুকু ভাই জিগায়- কী হইছে তর? আমি কই- কিছু না। টুকু ভাই হাত বাড়ায়া আমার কপালে হাত দিয়া দেখে, জ্বরটর আইল নাকি? নিশ্চিন্তি হইয়া উল্টা দিকে ফিরা শোয় কমান্ডারে।

আমার চিন্তা কিন্তু অন্য জায়গায়! একটা ছোট শব্দ হুনছি একটু আগে। সিথানের কাছে হাত বাড়ায়া দেখি ইস্টেনটা (স্টেনগান) আছে কিনা। গোয়ালের বাইরে লড়াচড়ার আওয়াজ পাইয়া উইঠা যাই। ইস্টেনটা হাতে লইয়া বাইরে যাই, একাই। গিয়া দেখি, না, খালি একটা গরু। এ বাড়ির মালিক আমাগো লাইগা গোয়াল খালি কইরা যে গরুডারে উঠানে বাইন্দা রাখছিল, হেইডা জানি কেমনে ছুইটা আইসা গাদা থেইক্যা খের খাইতেছিল। ফিইরা যাই গোয়ালে। টুকুভাই জিগায়- কই গেছিলি, 'শূয়র'(রাজাকার) আইছে নাকি? আমি কই না, একটা গরু। টুকুভাই কয়- শুইয়া পড়। টুকু ভাই অন্যরকম মানুষ। লিডার না? এমনে কী আর লিডার অওন যায়? কমান্ডার অওন সোজা কথা না। কিছু লাগে নেতা অইতে।

সালাম শিকদার একটু দম নিয়ে আবার শুরু করেন ... কত অপারেশন যে করছি হিসাব নাই। দাকোপ, বটিয়াঘাটা, গল্লামারী, রামপাল, শিরোমণি- বাকি রাখি নাই কিছু। যেহানে গেছি, আমি গুলি খরচ করতাম কম, কারণ গুলি তো শর্ট! খরচ কইরা ফালাইলে আবার পাইতে পাইতে অনেক দিন লাগে। বেশিরভাগ সমে (সময়ে) বেনেট (বেয়নেট) আর গলাচিপা দিয়া কাম সারতাম। একটু হেসে নিজের হাত দু'খানা দেখিয়ে বলেন- হাতে তো ম্যালা শক্তি আছিলো, বুঝেন না?

এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা।

এলো ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বিজয় এলো। মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করে দেখে- ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে খুলনা শহর। এখানে-ওখানে পড়ে আছে অসংখ্য লাশ। গল্লামারী খালের স্রোত আটকে আছে লাশের চাপে। কোনোটির হাত-পা আছে, কোনোটির নেই। অধিকাংশ নারীর শরীরের বিভিন্ন অংশ খাবলে নিয়েছে নরপশুরা। ফরেস্ট ঘাট, সার্কিট হাউস- সব জায়গাতেই একই অবস্থা!

সেই গল্লামারী খালপাড়ের পাশেই ছোট্ট একটি মাঠ। ওই মাঠেই সেদিন (১৬ ডিসেম্বর '৭১) আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীনতার পতাকা। পতাকার দড়ি কে প্রথমে টানবে, এ প্রশ্ন আসতেই কামরুজ্জামান টুকু বললেন- সালাম শিকদারই তুলবে আজ প্রথম পতাকা। সালাম তো কেঁদেকেটে অস্থির- 'আপনেরা থাকতে আমি কেন?' অবশেষে সম্মিলিতভাবেই তোলা হলো সেদিনের প্রথম পতাকা। কিন্তু এর পরেই সর্বসম্মতভাবে একটি সিদ্ধান্ত হলো- খুলনার সব শহীদের স্মৃতির উদ্দেশে গল্লামারী খালপাড়ে স্থাপিত হবে একটি স্মৃতিসৌধ, সামনে থাকবে একটি পতাকাস্তম্ভ। আর সালাম শিকদারই হবেন এই কমপ্লেক্সের তত্ত্বাবধায়ক। প্রতিদিন সকালে সালাম শিকদার পতাকা তুলবেন আর সন্ধ্যায় পতাকা নামাবেন। এখানেই আমার মূল কাহিনি।

এই সালাম শিকদার ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে আমার সঙ্গে কথা হওয়ার দিন পর্যন্ত (১৯৯৭) একদিনের জন্যও খুলনা ছেড়ে বাইরে যাননি, শুধু পতাকা তোলা এবং পতাকা নামানো থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে। যদি অল্প কিছুক্ষণের জন্য গিয়েও থাকেন কাছাকাছি কোথাও, চলে এসেছেন বিকেলের আগেই। ঝড়-তুফান, বৃষ্টি-বাদল কিছুই তাকে বিরত রাখতে পারেনি এই পতাকা উত্তোলন থেকে।

সালাম শিকদার বলে চলেন- আমি না থাকলে এই পতাকার যত্ন করবে কেডায়? পতাকায় একটু ময়লা লাগলে নিজের হাতে পতাকা ধুই। অন্যের হাতে দিলে হে যদি পতাকা আছড়ায়! হাবিজাবি কাপড়ের লগে যদি পতাকা রাখে! এই পতাকার মর্ম তো হগলে বুঝব না ভাই। আমরা যুদ্ধ করছি বনজঙ্গলে, আমরা বুঝি এটার দাম কত! সালাম শিকদারের গাল বেয়ে জলের স্রোত নেমেছে ততক্ষণে। চোখের জলে ভিজে গেছে তার চিতানো বুক। আমার ক্যামেরা সহকারীদের মাঝে কে যেন একজন ডুকরে কেঁদে উঠল এ সময়। আমার ক্যামেরার 'ভিউ-ফাইন্ডার' ঝাপসা হয়ে গেছে অনেক আগেই। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছে ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে থাকি। তাকে বলি- হ্যাঁ, আমি শুনছি, আপনি বলুন। ক্যামেরা চলতে থাকে, পাল্লা দিয়ে চলে সালাম শিকদারের কথা।

কেঁদে কেঁদে বলেন সালাম শিকদার- দেখেন, আমার ছেলেরা আমারে কয়- বাবা, তুমি 'পতাকা পতাকা' কইরা কী পাইলা? আমাগো ভবিষ্যৎ কী? আমি কই- একাত্তরে তোগো যখন ফালাইয়া থুইয়া যুদ্ধে চইলা গেছিলাম, সেখান থেইকা আমি না ফিরলে তোরা কী করতি? আলল্গাহ তোগোরে দেখবো বাজান, তোরা নিজেরা কিছু কইরা খা। আমারে টানিস না। আমারে তোরা মাফ কইরা দে! আমি এই পতাকার লাইগাই জন্মাইছি, এই পতাকা নিয়াই মরুম।

২০০৪ সালে পেশাগত কাজে আবারও একবার গিয়েছিলাম খুলনায়। ওখানে অবস্থানের দ্বিতীয় দিনেই পুরো ইউনিট নিয়ে গিয়েছিলাম মহান এই মানুষটিকে খুঁজতে। গিয়ে দেখি গল্লামারী শহীদ স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের সেই পুরোনো অবয়ব আর নেই। প্রধান সড়কে বেশ কিছু দোকানপাট কমপেল্গক্সটির মূল বিস্তৃতিকে সংকুচিত করে ফেলেছে।

সেদিন, প্রধান সড়কের ওপরেই একটি মুদি দোকানের সামনে ছোট্ট একটি বেঞ্চিতে বসেছিলেন সালাম শিকদার। খালি গা, কাঁধে একটি পুরোনো জল গামছা। হাতে একটি মাথা বাঁকানো লাঠি। লাঠির বাঁকা অংশে থুতনি রেখে তাকিয়েছিলেন দূরে কোথাও, নিষ্পলক। আমি গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করি। মৌনতা ভেঙে আমার দিকে তাকিয়ে আধো আধো ভাষায় কী যেন বলতে চাইলেন। জানা গেল স্ট্রোক করেছিলেন কিছুদিন আগে। এখন আর স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না। শরীরের এক দিকটা অবশ। খুঁড়িয়ে চলেন। চিনতে কষ্ট হয় কাছের মানুষদের। বহু চেষ্টা করেও আমার সঙ্গে তার স্মৃতির (১৯৯৭ সালের) কিছুই স্মরণ করাতে পারিনি। ওই অবস্থাতেই কয়েকটা শট নিয়ে ফিরে এসেছিলাম ভেজা চোখ নিয়ে।

পরে জেনেছি, মহান এই যোদ্ধা সালাম শিকদার না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন বেশ ক'বছর আগেই। তার আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।

আজ আমাদের সন্তানেরা যখন লাল সবুজ পতাকা গায়ে জড়িয়ে কিংবা মাথার ওপরে বাতাসে উড়িয়ে উলল্গাস করে, এই পতাকাটাকে যখন আপন করে নেয়, তখন বুকটা ফুলে ওঠে। প্রচণ্ডভাবে মনে পড়ে সালাম শিকদারের কথা। এই দেশ আর মাটির কাছে তখন ওই প্রার্থনাটাই করি- 'তোমার পতাকা যারে দাও, বহিবারে দিও শক্তি।'

প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা