করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কেবল কভিড-১৯ রোগে নয়, এর ফলে সৃষ্ট নানামুখী সংকটে দেশে সংঘাত ও প্রাণহানি আরও বাড়বে, রোগের বিস্তার ও সংক্রমণ মোকাবিলার পাশাপাশি যদি সামগ্রিক সামাজিক তৎপরতা এখনই আমরা শুরু না করি। চলতি করোনার সংক্রমণ ও বিস্তার হয়তো খুব বেশি স্থায়ী হবে না; কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট সংকট হবে দীর্ঘমেয়াদি। সরকারি তথ্যমতে, লেখাটি যখন তৈরি করছি দেশে ৫ জনের মৃত্যু ঘটেছে করোনা সংক্রমণে। কিন্তু একই সঙ্গে করোনা সংকটের কারণে সৃষ্ট নানামুখী সামাজিক অস্থিরতায়ও মৃত্যু ঘটেছে অনেকের।
২.
যখন দেশে কভিড-১৯-এ কোনো মৃত্যুর সংখ্যা ছিল না, তখনই সাতক্ষীরার শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী গ্রামের রেণুকা রপ্তান করোনা আতঙ্কে মারা যান। রেণুকা রপ্তানের ছেলে রতন রপ্তান ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে দেশে ফেরার সময় ভোমরা স্থলবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তার গায়ে জ্বর ও সর্দি-কাশি দেখা যায়। তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তারপর তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। হাসপাতাল থেকে আবার শ্যামনগরে তার খোঁজখবর নিতে বলা হয়। এর ভেতর এলাকায় 'গুজব' রটে, রতনের করোনাভাইরাস হয়েছে এখন পুলিশ তাকে গুলি করে মেরে ফেলবে। এই গুজব শুনে রতনের অসুস্থ মা রেণুকা রপ্তান (৫৬) একই রাতে আতঙ্কে মারা যান।
৩.
রাজবাড়ী সদর উপজেলার ভবদিয়া গ্রামে সম্প্রতি এক প্রবীণ ব্যক্তি মারা যান। গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আবদুল খালেক আশঙ্কা করেন, করোনার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে আবদুল মান্নান বলেন, গুজবে তার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দু'পক্ষের ঝগড়া ও হাতাহাতি শুরু হয়। ২১ মার্চ করোনা নিয়ে এই বিবাদ-সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষে কৃষক লাবলু মোল্লা (৪৮) নিহত হন। আহত হয় দশজন। এ ঘটনায় পুলিশ অনেককে আটক করে।
৪.
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের হরিরামপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের জাহিদুল ইসলাম (৩৬) ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সম্প্রতি জ্বর-সর্দি নিয়ে বাড়ি গেলে এলাকার লোকজন তাকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে অপবাদ দেয়। এমনিতেও তার শরীর শুকিয়ে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। করোনা অপবাদের জ্বালা সইতে না পেরে ২৪ মার্চ রাতে আলাই নদীর তীরে গাছের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন।
৫.
করোনা সংক্রমণ ও বিস্তার ঠেকাতে সরকার যখন সঙ্গনিরোধ ও ঘরে থাকার ঘোষণা দেয়, তখন শহর থেকে মফস্বল অনেকেই এই বিধি মানতে শুরু করেছে। রাজবাড়ীর ভবানীপুর এলাকায় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে কিশোর আসিফকে (১৩) ঘরে থাকতে বলেন তার মা। করোনার কারণে বাইরে যেতে না দেওয়ায় ২৬ মার্চ ঘরের আড়ায় ঝুলে অভিমানে আত্মহত্যা করে শিশু আসিফ। সে রাজবাড়ী বাজারে ইব্রাহীম সুতাঘরে কাজ করত।
৬.
নীলফামারীর গোল্ডেন টাইমিং বিডি লিমিটেড কোম্পানি। চীনের একটি কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত এই কারখানায় পরচুলা তৈরি করেন নারীরা। ২৯ ফেব্রুয়ারি কারখানার ১নং ফ্লোরে কর্মরত এক নারী শ্রমিক তীব্র রাসায়নিকের ঝাঁজে জ্ঞান হারান। মুহূর্তে কারখানায় গুজব ও আতঙ্ক ছড়ায়, তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। পরপর আরও অনেক নারী শ্রমিক জ্ঞান হারান। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, কোনো করোনা সংক্রমণ ঘটেনি; সবাই আতঙ্কে গণহিস্টিরিয়াতে জ্ঞান হারিয়েছিলেন।
৭.
রেণুকা, লাবলু, জাহিদুল, আসিফ- এদের করোনার সংক্রমণ হয়নি, কভিড-১-এ মারা যাননি। কিন্তু এদের নিদারুণ মৃত্যু ঘটেছে করোনা সংকটের কারণেই। কেবল বাংলাদেশ নয়, ইতালিতেও একজন নার্স সংক্রমিত হওয়ার পর পরিবারের সুরক্ষায় আত্মহত্যা করেছেন। ভারতে লকডাউনের ফলে রুজি হারানো কয়েক শ্রমিক আশঙ্কায় আত্মহত্যা করেছেন। করোনা মহামারি কেবল রোগ-সংক্রমণ নয়, তৈরি করছে এক জটিল সামাজিক অস্থিরতা। এর মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া কত দূর কত ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে, তা এখনই আমাদের বিবেচনায় আনা জরুরি। বিশেষত লকডাউন হয়ে ঘরে থাকার ফলে আমাদের শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবগুলো কেমন হতে পারে? বাংলাদেশে শ্রেণি, বর্গ, জাতি ও অঞ্চলভেদে ঘরের বিন্যাস ও কাঠামো ভিন্ন ভিন্ন। সবার ঘরের মাপ ও সুবিধাগুলো এক রকম নয়, গৃহহীনদের কথা বাদই রাখলাম। তাহলে এই সঙ্গনিরোধকালে ঘরে থাকার সময় আমাদের অন্যান্য স্বাস্থ্যগত শারীরিক সুতার বিধিগুলো কেমন হতে পারে? হঠাৎ করেই দেশের অনেক দিনমজুর ও শ্রমজীবী কাজ হারিয়েছেন। দেশের এই প্রান্তজনের জীবনে তৈরি হওয়া শঙ্কা দূর করার উপায়গুলো আমাদের খুঁজতে হবে। এখানে মানসিক সুরক্ষাটাই নিশ্চিত করা জরুরি। এমনতিই আমাদের শিশুরা এক মাঠহীন নিরানন্দ শৈশব নিয়ে বড় হচ্ছে। এর ভেতর এই শৈশবেই তাদের পাড়ি দিতে হচ্ছে দুনিয়ার এক দুঃসহ ক্রান্তিকাল। শিশু, প্রবীণ ও বিশেষভাবে সক্ষম মানুষের ক্ষেত্রে এই সঙ্গনিরোধ ব্যবস্থায় আমরা কোনো ভয়হীন আনন্দঘন পরিসর তৈরি করতে পারি কি?
animistbangla@gmail.com