'ওরে গৃহবাসী খোল্‌, দ্বার খোল্‌, লাগল যে দোল।/স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।/দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌।' কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন ফাল্কগ্দুনের রূপ মাধুরী দেখার জন্য গৃহবাসীদের দ্বার খুলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেতে বলেছিলেন; কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে হয়তো আমাদের সুরক্ষায় গৃহকোণেই থাকতে বলতেন। নব্য অভিযোজিত করোনাভাইরাস থেকে নিজের ও স্বজনের জীবন রক্ষার্থে আমরা আজ বন্ধু, স্বজন ও প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন। বেঁচে থাকার এ যেন এক অন্যরকম যুদ্ধ! যদিও বেঁচে থাকার এই যুদ্ধ চিরন্তন ও শাশ্বতকালের।

সভ্যতার একেবারে সূচনালগ্নে মানুষ আত্মরক্ষা ও ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য হিংস্র পশুদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে, কখনোবা একাকী যুদ্ধ করত, নিরাপত্তার জন্য গুহা ছিল তার ঠিকানা। এরপর এলো সুন্দরভাবে বাঁচার লড়াই। বর্তমানে আমরা শিক্ষা, বাণিজ্য, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব প্রেক্ষাপটের ঘোড়দৌড়ে পরিবারের ক্ষুদ্র চৌহদ্দি ছেড়ে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে প্রবেশ করছি। বিশ্বায়নের এই আশাবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি আজ আমরা দুর্ভাগ্যক্রমে অন্যরকম একটি নেতিবাচক প্রভাবের শিকার। যেমন- এক দেশের রোগ-বালাই এখন আরেক দেশে পৌঁছে গেছে সহসাই।

উত্তম প্রতিকার হিসেবে বাংলাদেশসহ অনেক দেশে এসেছে কিছুদিন গৃহে থাকার প্রস্তাব। মানুষ আপন, রোগ আপন নয়- এটা ভেবে নিয়ে আমাদের গৃহে অবস্থান করা সর্বাপেক্ষা সমীচীন। আর সেই সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে আগামীতে সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ মোকাবিলার জন্য। ঠিক যেমনটা গুণীজনরা নিতেন তাদের শৈশব থেকেই। ছোটবেলায় নেপোলিয়নকে তাঁর মা যখন রোজ সুন্দর দামি নরম পাউরুটি সঙ্গে দিয়ে দিতেন, তিনি নিজে সেগুলো না খেয়ে রোজ একটি গরিব ছেলেকে দিয়ে দিতেন এবং গরিব ছেলেটির শক্ত লাল আটার রুটি নিজে খেয়ে নিতেন। তাঁর মা যখন এর কারণ জানতে চাইলেন উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'মা, আমি সৈনিক হতে চাই, সেখানে আমাকে যে মোটা রুটি খেতে দেবে ওরা। আগে থেকেই আমি তা খাওয়ার অভ্যাস করছি।' বড় হয়ে নেপোলিয়ন 'নেপোলিয়ন বোনাপার্ট' নামে ইতিহাসের একজন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ও সেনাপতিরূপে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কথা বলা যাক। বাল্যকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটু অন্যরকম গুণের অধিকারী ছিলেন, প্রস্তুত ছিলেন একটি জাতিকে আগামীর পথপ্রদর্শনের জন্য। একবার তিনি নিজের বাড়ির গোলার ধান গ্রামের গরিব চাষিদের মাঝে বিলিয়ে দেন। পিতা শেখ লুৎফর রহমান এর কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'এবার চাষিদের জমির ধান সব বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে। আকালে পড়েছে কৃষক। আমাদের মতো ওদের পেটেও ক্ষুধা আছে। ওরাও আমাদের মতো বাঁচতে চায়।'

আজকের শিশু যদি আগামীর ভবিষ্যৎ হয়, তাকে পৃথিবীর সুন্দর ও অসুন্দর, যুদ্ধ ও শান্তি, রোগ ও শোক, আনন্দ ও বিষাদ, বিরহ ও বিবাদ, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য বোঝার ও মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা আমাদের কর্তব্য। গৃহবাসী মানুষের কাছে প্রযুক্তি যেন একমাত্র ভাবনার সীমারেখা না হয় বরং অন্তরের ডাক যেন আমরা শুনতে পাই। ভালোবাসা, মানবিকতা, সব সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা ও প্রার্থনা আমাদের অন্তর্লোকে প্রশান্তি আনবে। সত্যিকার অর্থে বাঁচতে শেখাবে, বাঁচাতে শেখাবে। দাঁড়াতে শেখাবে অসহায় আর পীড়িতদের পাশে। গৃহ হোক আমাদের আগামীর পথচলার সমৃদ্ধ সেই প্রস্তুতির জায়গা।

পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

বিষয় : প্রতিভা রানী কর্মকার ওরে গৃহবাসী

মন্তব্য করুন