রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বা অনুরূপ কোনো ব্যক্তিকে খোলা চিঠির মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করার রেওয়াজ দেশে দেশে গড়ে উঠেছে। সাধারণত পত্রপত্রিকায় এসব চিঠি যাদের উদ্দেশে লেখা হয়, তারা কখনও পড়েন কিনা, তা অনেক সময় জানা যায় না। বছরখানেক আগ পর্যন্ত সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলাম বলে অনেকের ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমি যখন ইচ্ছা দেখা করতে বা কথা বলতে পারি, যা মোটেও ঠিক নয়। এটি ঠিক, প্রধানমন্ত্রী আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করেন এবং আমার জীবনে দুটি বড় সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ হয়েছে একমাত্র তার কারণে। আমি যখন বলি, এই দুটি পদে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য আমি কোনো এক ব্যক্তির কাছেও ধরনা দিইনি; তখন অনেকে তা বিশ্বাস করতে চায় না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার যে ঋণ, তা কখনও শোধ করার নয়। গত মে মাসে আমার সর্বশেষ দায়িত্ব ছাড়ার পর কখনও তার সঙ্গে আর সরাসরি দেখা বা কথা বলার সুযোগ হয়নি। তিনি হয়তো এটি উপলব্ধি করতে পারেন না, তাকে বর্তমানে এক দল কাছের মানুষ অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। চাইলেই আমার মতো কেউ দেখা করতে পারেন না। এটি শুধু আমার কথা নয়; তার অনেক গুণমুগ্ধ, সুহৃদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কথা। তাদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাদের তিনি অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন।
যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও এই দলটির সময়কার সরকারের কর্মকাণ্ড আমার পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ হয়েছে; সরকারের সঙ্গে কিছু সময়ের জন্য কাজ করারও সুযোগ পেয়েছি; তার ফলে অন্তত এতটুকু বুঝতে পারি- সরকারের কোন কাজটি করা উচিত হয়েছে আর কোন কাজটি করার প্রয়োজন ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে সেই ১৯৬৭-৬৮ সালের আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকে। এর পর ঊনসত্তরের গণআন্দোলন. সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, তারপর বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল। সেই শাসনকাল যে কত কঠিন ছিল, তা বর্তমান প্রজন্মকে বোঝানো যাবে না। একটি উদাহরণ দিই। ১৯৭৩ সালের ৬ আগস্ট প্রভাষক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে চারশ' টাকা বেতনে আমার প্রথম চাকরিতে প্রবেশ। ওই সময় বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, এই অল্প বেতনে একজনের পক্ষে সংসার চালানো সম্ভব নয়। চালু হলো দুই সপ্তাহ অন্তর সবার জন্য রেশনব্যবস্থা। ৫০ বছর পর যখন চিন্তা করি তখন মনে হয়- বঙ্গবন্ধু তখন শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সৃষ্টিকর্তা প্রেরিত একজন শাসক, যিনি মানুষের সুখ-দুঃখ বা প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারতেন। তার একটি সুবিধা ছিল, তিনি সরকার পরিচালনার জন্য এমন একটি টিম পেয়েছিলেন। শেখ হাসিনার দুর্ভাগ্য, তিনি জাতীয় চার নেতার মতো একটা নির্লোভ ও নিঃস্বার্থ টিম পাননি।
১৯৯৬ সাল থেকে যখনই শেখ হাসিনা সরকার গঠন করেছেন, তখনই তার ভাগ্যে নানা ধরনের কঠিন চ্যালেঞ্জ এসে উপস্থিত হয়েছে। তার যারা কল্যাণ চান, তাদের প্রায় সবারই বিশ্বাস, তিনি সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য দলের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ থেকে যে ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করেছিলেন, তা তিনি পাননি। হোক না সেটা বিডিআর বিদ্রোহ বা হলি আর্টিসানের মতো জঙ্গিবাদী আক্রমণ আর ক্ষয়ক্ষতি। যখন ২০১৩-১৪ সালে খালেদা জিয়া গুলশানে নিজের দপ্তরকে বাঙ্কার বানিয়ে পেট্রোল বোমার সন্ত্রাস সৃষ্টির হুকুম দিচ্ছিলেন, তখন ক'জন ছিলেন শেখ হাসিনার পাশে?
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তৃণমূল পর্যায়ের সব খবর জানা সম্ভব নয়, যদিও তিনি চেষ্টা করেন তৃণমূল পর্যায়ে কী ঘটছে সে সম্পর্কে অবহিত থাকতে। তার চারপাশে যারা আছেন তারা হয়তো তাকে তেমন খবর দেন, যা তিনি শুনলে প্রীত হবেন। এটি সব প্রশাসকের ক্ষেত্রে সত্য। সে কারণে বুদ্ধিমান প্রশাসকরা কিছু নিজস্ব বিশ্বস্ত মানুষকে নিয়ে একটা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল তৈরি করে রাখেন সত্য খবরটি জানার জন্য।
শেখ হাসিনাকে নিঃস্বার্থভাবে যারা ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন; তিনি আরও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকুন, তাদের বেশিরভাগই মনে করেন- এই মুহূর্তে যদিও তার একটি বড় মন্ত্রিসভা আছে; সরকার পরিচালনার জন্য আছে একটি আমলাতন্ত্র; কিন্তু জনগণের কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়। সবাই মুখিয়ে থাকেন, কোনো একটা বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কী বলেন, তা শোনার জন্য। করোনাভাইরাসজনিত একটি ভয়াবহ দুর্যোগ বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বকে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। শ্রমিক ও দিনমজুরদের জন্য তিনি সাহায্য-সহায়তার আশ্বাস দিলেন। মানুষ তাতে বেশ খুশি। তবে প্রায় সবাই দাবি করছেন, এই সাহায্য যেন কোনো অবস্থাতেই স্থানীয় কাউন্সিলর, মেম্বার বা দলের লোকজনকে দিয়ে বিতরণ করা না হয়। তা যেন সেনাবাহিনী দিয়ে বিতরণ করা হয়।
দেশ চালানোর জন্য একটি আমলাগোষ্ঠীর প্রয়োজন হয়। এই আমলাগোষ্ঠীকে বর্তমান সরকার যত ধরনের সুবিধা দিয়েছে; বাংলাদেশের অন্য কোনো পেশার মানুষের ভাগ্যে তা কখনও জোটেনি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই আমলাগোষ্ঠীর কতজন বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ? এদের কতজনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার আর দুর্নীতির অভিযোগ আছে? প্রায়ই শোনা যায়, কোনো একজনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যাপারে অভিযোগ উঠলে তাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া অথবা প্রত্যাহার করা হয়। পুলিশ হলে তাকে ক্লোজ করা হয়। এসবের কোনোটাই তো শাস্তি নয়। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার পূর্বের কর্মক্ষেত্রের দু'জন সিনিয়র অফিসার ও অন্য একটি মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিব গিয়েছিলেন খুলনার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রকল্পের অগ্রগতি তদারকি করতে। তারা সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছে বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করলেন। প্রতিষ্ঠানপ্রধান আমাকে ফোনে জানালে তাকে পরামর্শ দিই, তিনি যেন কোনো অর্থই না দেন এবং পুরো বিষয়টা লিখিতভাবে আমাকে অবহিত করেন। তিনি তাই করেছিলেন। আমার দপ্তরের দু'জন অফিসারের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। মন্ত্রণালয়ের অফিসারটির বিষয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়। সেই অফিসারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। এটুকুই তার শাস্তি। আর আমার দপ্তরের সেই দুই অফিসারকে তদন্তপূর্বক চাকরিচ্যুত করা হয়। এমন খবর অসংখ্য আছে। সবকিছু প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছায় না।
এই মুহূর্তে সরকার ও দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয়হীনতা আর কিছু কিছু মন্ত্রীর দায়িত্বজ্ঞানহীন বচন, যা সাধারণ মানুষকে চরম বিরক্ত করে। একটি মন্ত্রণালয় চারজন যুগ্ম সচিব ও ১১ জন উপসচিবকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করল, যাদের কাজ নাকি গণমাধ্যমের কর্মকাণ্ড নজরদারি করা, যাতে তারা গুজব না ছড়ায়। এই কমিটির এমন কী অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা আছে, যাতে তারা কোনটা গুজব আর কোনটা নয়, তা বুঝতে পারবে? একদিনের মাথায় সেই কমিটি বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে এই আমলাতন্ত্রের যেসব ভালো কর্মকর্তা, সরকারের প্রতি যাদের নিরঙ্কুশ সমর্থন আছে, তাদের অনেকেই কোণঠাসা। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, সরকার যদি কোনো বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে; সবার আগে সরকারের সঙ্গে একটি বড় সংখ্যক আমলা সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এটি দেখা গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর।
সব শেষে বলি, শেখ হাসিনার যারা মঙ্গল কামনা করেন; যারা মনে করেন, শেখ হাসিনার অবর্তমানে দেশটি আবার পেছনের দিকে হাঁটা শুরু করবে; তাদের দৃঢ় বিশ্বাস- এই মুহূর্তে সত্যিকার অর্থে শেখ হাসিনা একজন নিঃসঙ্গ শেরপা। কাছের মানুষরা তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছাড়া আর কিছু করছে না। তাদের নানা অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড সরকারকে প্রতিনিয়ত বিব্রত করছে। দেশের এই ভয়াবহ ক্রান্তিকালে সর্বক্ষণ বঙ্গবন্ধুকন্যার মঙ্গল কামনা করি। এই লেখাটি কোনো খোলা চিঠি নয়। সাধারণ মানুষের মনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা জনস্বার্থে লিখতে হলো।
২৯ মার্চ ২০২০
বিশ্নেষক ও গবেষক