বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহতা নিয়ে খুব বেশি ভূমিকার প্রয়োজন নেই। এই মহামারি শুরু হয়েছিল চীনে। কিন্তু এর কেন্দ্র ইউরোপে স্থানান্তরিত হয়ে এখন আমেরিকায় অবস্থান করছে। দক্ষিণ এশিয়াতে মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত খুব বেশি না হলেও ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। আমেরিকার পরে করোনাভাইরাসের কেন্দ্রটি দক্ষিণ এশিয়ায় স্থানান্তরিত হতে পারে- এটি বিশ্বাস রাখাই এখন সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। বহুরূপী করোনাভাইরাসের দৈব গতিবিধি প্রবণতা বলছে, এটি আপাতত তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করছে না। ভাইরাসটি ধনী-গরিবের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করছে না। ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস ও প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকেও ছেড়ে কথা বলেনি।
পৃথিবী ১৯৩০ ও ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার মতো অনেক সংকট বিভিন্ন সময় মোকাবিলা করেছে। মানুষের শারীরিক ও মানসিক উভয় স্বাস্থ্যই এ ধরনের আর্থিক সংকটে প্রভাবিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ১৯৩০ সালের অর্থনৈতিক বিশ্বমন্দা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিউ ডিল নামে এক স্টিমুলাস প্যাকেজ প্রস্তাব করেছিলেন। স্টিমুলাস প্যাকেজের অংশ হিসেবে সুইডেন, আইসল্যান্ড ও ডেনমার্ক ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় আরও বেশি করে বিনিয়োগ করেছিল। এবারের সংকটটি সম্পূর্ণ আলাদা। উল্লিখিত পূর্বের সংকট দুটি মূলত আর্থিক সংকট হিসেবে শুরু হয়ে অন্যান্য খাতে বিস্তৃত হয়েছিল। সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা সংকটে পড়লেও সেই সংকট কখনোই করোনা মহামারির মতো এত ভয়ংকরভাবে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি। অবস্থা এমন হয়েছে, ব্রিটেন ও ইউরোপকে ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অনুসরণীয় নিয়ম ব্যাসেল-৩ এর অন্যতম স্তম্ভ 'মিনিমাম ক্যাপিটাল রিকোয়ারমেন্ট' আপাতত তুলে দিতে হচ্ছে। কোনোরকম সংশয় না দেখিয়ে কমবেশি সব দেশ নিউ ডিলের মতো স্টিমুলাস প্যাকেজের দিকে হাঁটতে হচ্ছে।

এটি করোনা, না চীনা ভাইরাস- এ নিয়ে ভাবার সময় যে এখন নেই; তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই তার বন্ধু ট্রাম্পকে জি২০ সম্মেলন উপলক্ষে জানিয়ে দিয়েছেন। পূর্বে অর্থনীতি চাহিদা সংকটে পড়লেও এবারের মতো একসঙ্গে চাহিদা ও জোগানের উভয় সংকটে পড়েনি। সংকটটি জনস্বাস্থ্যের, কিন্তু এখন পর্যন্ত ডাক্তার-নার্সদের চেয়ে সরকারের রাজনৈতিক অর্থনীতির সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ছে বেশি। নীতিনির্ধারকরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন কীভাবে অর্থনীতি চাঙ্গা রেখেই করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা যায়, এ নিয়ে চিন্তা করে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রেখাটি যতই নিচু করা হবে, অর্থনীতি ততই লকডাউন হবে। তাই নতুন নতুন রাজস্ব বা আর্থিক নীতি প্রণয়ন অতটা সহজ হচ্ছে না। এ ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়া অনেকটাই সফল। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, দক্ষিণ কোরিয়াতে সরকার নবযৌবনে সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে চালু রেখেছে। সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা রক্ষা করে বিনামূল্যে সব নাগরিকের করোনা পরীক্ষা, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা করেছে। খুব বেশি খরচের প্রয়োজন পড়েনি; ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনআস্থা।

এ ধরনের সংকট নিরসনে রাজস্ব নীতি বলেন আর আর্থিক নীতিই বলেন, তা সরকারকেই নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাতে থাকলে, নীতি বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব তেমন সক্ষমতা থাকে না। যেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ডাক্তার-নার্সদের কাজ করার কথা, সেখানে স্বাস্থ্যসেবাও বাংলাদেশের মতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। আর মুক্তবাজার অর্থনীতির অদৃশ্য শক্তি স্বমহিমায় নিরুদ্দেশ! কেউ দাবি করতে পারে- ইতালিতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা আছে; কাজ করছে না কেন? আমি বলি, ইতালিতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কাজ করছে। যদি ধরেও নিই, কাজ করছে না; তখন খুঁজতে হবে কেন এমনটা হচ্ছে! তাহলে কি ইতালির সরকার চালিত বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটি দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নবযৌবনে নেই? ইউরোপের ঐতিহ্য মাত্র! তা ছাড়া আমরা ভালো করেই জানি, পুরো ইউরোপকে সাধারণীকরণ করা যায় না। যেমন, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ, যেখানে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা চালু আছে সেখানে। নরওয়ে সরকার এখন পর্যন্ত (৩১ মার্চ) করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজারের মধ্যে আর মৃতের সংখ্যা মাত্র ৩২ জনে রাখতে পেরেছে। সুইডেন ও ডেনমার্কেও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ১৪৬ ও ৭৭ জন মাত্র। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও কিউবাতেও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ৮৪, ১৮ ও ৩ জন, সেই সংখ্যাটা যখন যুক্তরাষ্ট্রে ৩ হাজারের কাছাকাছি।

এ ধরনের সংকটের সময় জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা ডাক্তার কিংবা নার্সচালিত না হয়ে বরং রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও অর্থমন্ত্রী দ্বারা হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি এর সর্বোত্তম উদাহরণ। যদিও আমাদের দেশে অর্থনীতিবিদদের গুরুত্ব নেই। পাশের দেশ ভারত অবশ্য অনেকটাই সুস্পষ্টভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করেছে। কেরালা, দিল্লি, অল্প্রব্দপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকারও নিজেদের মতো শ্রমজীবী, কর্মহীন ও ছোট ব্যবসার অনুকূলে সুরক্ষা ব্যবস্থা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রথমে যে প্যাকেজটি ঘোষণা করেছিলেন, তা অনেকটাই ছিল বড় ব্যবসায়ী ও করপোরেশনের অনুকূলে; শতভাগ আয় হারানো সেল্‌ফ এমপ্লয়েড মানুষ উপেক্ষিত ছিল। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের বিরোধিতার কারণে ট্রাম্পের ট্রিলিয়ন ডলারের প্যাকেজটি এখন অনেকটাই মানবিক হওয়ার পথে। করোনাভাইরাসটি পুঁজিবাদের এমন জায়গায় আঘাত হেনেছে যে, ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দাকালের মতো বড় বড় করপোরেশন ও ব্যাংক বেইল আউট করার খুব বেশি সুযোগ নেই। ট্রাম্প তো মানতেই চাচ্ছেন না, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তিনি বলছেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যদি অর্থনীতি বন্ধ থাকবে তাহলে আর্থিক সংকটে আরও বেশি মানুষ মারা যাবে। কথা ঠিক, যদি ধনী-গরিবের বৈষম্যটা ধরে রাখতে চাই। করোনা মহামারি পৃথিবীজুড়ে যেভাবে ঘনীভূত হচ্ছে তাতে ১ শতাংশ ধনী মানুষ যাদেরকে শোষণ করে বা ঠকিয়ে ৯৯ শতাংশ সম্পদের মালিক হয়েছে, তাদের জন্য ছাড় দিতে হবে এবং আয় ও সম্পদ বৈষম্য হ্রাসের বিষয়টি মেনে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মচারী ও ক্রেতাদের আশ্বস্ত করতে হবে, এ সংকট কাটিয়ে ওঠার যথেষ্ট সামর্থ্য প্রতিষ্ঠানের আছে এবং তাদেরকে বাড়িতে থেকে কাজ চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার সুযোগ করে দিতে হবে। দেশে দেশে যে স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা হচ্ছে, সেখানেও যেন এই ১ শতাংশ তথাকথিত অমানবিক প্রবৃদ্ধি রক্ষার অজুহাতে ৯৯ শতাংশের সুবিধা নিয়ে না যায়। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয় জড়িত বলে যে অজুহাত দেওয়া হয়, সেটি পরে দেখা যাবে। মানুষের বাঁচা-মরার লড়াইয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য আর কিছু থাকতে পারে না। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির চাহিদা ও জোগান উভয় দিক ভেঙে পড়েছে। করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বিষয়টি শুধু একাডেমিক অধ্যয়নের জন্য রেখে দিলে হবে না, এবার কাজে লাগাতে হবে। বৈষম্যের হ্রাস মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো পুঁজিবাদী অজুহাতই মানব সভ্যতাকে এইবার বাঁচাতে পারবে না বলে মনে হচ্ছে।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ; শিক্ষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
rasel_stat71@yahoo.com