'চিরবিদায়' দিন মর্যাদার সঙ্গে

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ গোলাম নবী

জন্মের পর মানুষের জীবনে যে সত্যটা আসবে, সেটা হলো মৃত্যু। মারা যাওয়াটা এতটাই অবধারিত যে, এ থেকে কারোই রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই। একমাত্র মৃত্যুই ধনী, গরিব, রাজা, বাদশাহ, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সমরনায়ক, লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসে। যিনি মারা যান, তার কিছুই করার থাকে না মৃত্যুর পরের বিদায় নিয়ে; কিন্তু যারা বেঁচে থাকেন তাদের দিক থেকে করার আছে- মৃত ব্যক্তির ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতি মেনে সম্মানের সঙ্গে বিদায় জানানোটা বেঁচে থাকা মানুষেরই কাজ।
আগেও মহামারি হয়েছে। সেসব মহামারিতে মানুষ মারা গেছেন। তখন সমাজ ও গোত্রপ্রধানরা ধর্মের সঙ্গে মিলিয়ে মৃতের দাফন-সৎকারের সিদ্ধান্ত দিতেন। এখনকার মহামারিতে মানুষ মারা গেলে কীভাবে মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদভাবে তার দাফন, সৎকার কিংবা কবরস্থ করা হবে, সে নিয়ে ধর্ম ও বিজ্ঞানের আলোকে নির্দেশনা তৈরি করা হয় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। করোনা নামের এক ভাইরাসের আক্রমণে কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছেন। তাদের দাফন, সৎকার কিংবা কবরস্থ করা নিয়ে গাইডলাইন থাকলেও উপযুক্ত প্রচার না হওয়ার কারণে অনেক সময় মানুষ বিভ্রান্তমূলক তথ্য দিয়ে থাকে কিংবা গুজব ছড়ায়।
বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২৩ মার্চ করোনা (কভিড-১৯) রোগে মৃত ব্যক্তির মৃতদেহ নিরাপদভাবে দাফন, সৎকার ও ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা প্রকাশ করেছে। গাইডলাইনে করোনা রোগে মৃত ব্যক্তির মৃতদেহ সৎকার বা দাফন প্রক্রিয়াকে পরিবার এবং জনসাধারণের জন্য খুবই সংবেদনশীল উলেল্গখ করে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সব ধরনের জটিলতা ও মতপার্থক্য এড়ানোর জন্য মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াটি জানানোর জন্য বলা হয়েছে। এতে সুস্পষ্টভাবে ধর্মীয় আচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে মুসলমান ব্যক্তির মৃতদেহকে তায়াম্মুম বা পানি ছাড়া অজু করানোর জন্য দাফন কাজ ব্যবস্থাপনার যে দল সেখান থেকে একজন মুসলমান অথবা পরিবারের কেউ একজন সম্পূর্ণ সুরক্ষাসামগ্রী পরিধান করে এই কাজটি করবেন বলে উলেল্গখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, দাফনের জন্য মৃতদেহকে ব্যাগে কাপড়বিহীনভাবে দাফন করা যাবে না। তাকে সেলাইবিহীন সাদা সুতির কাপড় কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। নয় পৃষ্ঠার এই গাইডলাইনে দাফনের পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ধাপে ধাপে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে।
সাধারণ নীতিমালার আওতায় মৃতদেহ স্পর্শ নূ্যনতম রাখা এবং মৃতদেহ ময়নাতদন্ত না করার জন্য বলা হয়েছে। দাফন কাজে চার সদস্যবিশিষ্ট ব্যবস্থাপনা দল গঠন এবং তাদেরকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পোশাক পরিধানপূর্বক মৃতদেহ দাফনে প্রস্তুত ও বহন করার জন্য বলা হয়েছে। এ ছাড়াও একজন কারিগরি পরিদর্শক পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করবেন; কিন্তু তার সম্পূর্ণ সুরক্ষার পোশাক পরার দরকার নেই। একজন ধর্মীয় প্রতিনিধিও থাকবেন, যাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা পোশাক পরার দরকার নেই। নারী রোগীর ক্ষেত্রে দলে অবশ্যই একজন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
গাইডলাইনে জীবাণুনাশক ব্যবহার, মৃতদেহের ব্যবস্থা প্রক্রিয়াকরণ, মৃতদেহ পরিবহন করা, পরিবহনের কাজে ব্যবহূত যানবাহন জীবাণুমুক্ত করা এবং দাফনকালীন প্রক্রিয়ার নানা দিক সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, দাফন-সৎকার প্রক্রিয়া যার যার ধর্মের নির্দেশনা অনুযায়ী পালন করা উচিত। দাফন করা দেহ কিংবা ভস্মকৃত দেহাবশেষ বা ছাই হতে করোনা ভাইরাস ছড়ায় না।
এই গাইডলাইন তৈরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রোগীর মরদেহ ব্যবস্থাপনার কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে। আমরা আশা করতে পারি, সব ধরনের বিতর্ক এড়িয়ে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া লোকদের মর্যাদার সঙ্গে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় জানাতে পারব।
  লেখক ও উন্নয়নকর্ম

বিষয় : 'চিরবিদায়