করোনা মোকাবিলার যোগাযোগ কৌশল

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. শেখ আবদুস সালাম ও মো. রুমান শিকদার

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে গোটা বিশ্ব এখন পর্যুদস্ত প্রায়। ১৯১৮-২০ সময়ে স্প্যানিশ ফ্লুর ১০০ বছর পরে বিশ্ববাসী এখন এত বড় মহামারির মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শিক্ষা-গবেষণার প্রায় সব শাখার সম্মিলিত প্রয়াস চলছে এই মহাবিপদকে মোকাবিলার জন্য। এই প্রতিকূল অবস্থা থেকে মুক্ত থাকতে জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো যোগাযোগের ভূমিকাও অনন্য। যোগাযোগীয় বিভিন্ন পদ্ধতি বা নীতি-কৌশলের পরিকল্পিত ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখানে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করোনাভাইরাসের চরিত্রগত কারণে অন্যান্য সামাজিক বা যে কোনো ধরনের সংকটের চেয়ে এখানে যোগাযোগীয় নীতি-কৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে যে ধরনের যোগাযোগে মানুষকে মুখোমুখি অবস্থানে আসতে হয় এবং হাতে হাতে কোনো সামগ্রী আদান-প্রদান করতে হয়।
এ পর্যায়ে আমরা যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করতে পারি : ১. মানুষের আচরণগত পরিবর্তন এবং ২. চিকিৎসা, খাদ্যসামগ্রীসহ সংশ্নিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা।
মানুষের আচরণগত পরিবর্তন : মানুষের আচরণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যোগাযোগীয় হস্তক্ষেপ। করোনা মোকাবিলার জন্য কিছু আচরণগত পরিবর্তনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন- একে অপরের থেকে অন্তত তিন ফুট বা দুই হাত শারীরিক দূরত্বে থাকা। মানুষের আচরণ পরিবর্তন মূলত খুবই দুরূহ একটি বিষয়। দৃঢ় বিশ্বাস বা দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করেই মানুষের আচরণ তৈরি হয়, যা একসময় তার অবচেতন কার্যকলাপের অংশেও পরিণত হয়ে যায়। মানুষ হঠাৎ এ আচরণ বদল করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আচরণ পরিবর্তন যোগাযোগের কতগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
আচরণ পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হচ্ছে জ্ঞান প্রদান ও সচেতনতা সৃষ্টি। প্রাথমিকভাবে মানুষের মধ্যে পর্যাপ্ত তথ্য বা জ্ঞান সরবরাহ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা যেসব চ্যানেল বা অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করতে পারি : ১. টেলিভিশনে ব্যাখ্যামূলক, পিকটোরিয়াল ও ডেমোনেস্ট্রেটিভ প্রতিবেদন এবং সংশ্নিষ্ট গবেষকদের পরামর্শ সম্প্রচার; ২. ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে গুণগত এবং বিশ্বাসযোগ্য আধেয় প্রচার; ৩. মাইকের মাধ্যমে পূর্ব ধারণকৃত সচেতনতামূলক বার্তা বা গানের অডিও প্রচার; ৪. মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার এবং ৫. পৌরসভা বা ইউনিয়নের ওয়ার্ড প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রচার। তবে সামগ্রিকভাবে মাল্টিমিডিয়া অ্যাপ্রোচ অর্থাৎ সব ধরনের মিডিয়া ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। যোগাযোগের গবেষণায় দেখা গেছে, যে কোনো বিষয়ে মানুষের কেবল জ্ঞান অর্জিত হলেই সে নতুন আচরণ গ্রহণ করে না। বরং এ ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় বিষয়। তাই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য প্রথম ধাপে জ্ঞান ও সচেতনতা তৈরির জন্য যেসব চ্যানেল বা অ্যাপ্রোচের কথা বলা হয়েছে, তা বারবার ব্যবহার করতে হবে। যোগাযোগীয় ধারণা অনুযায়ী যখন একটি বিষয় বারবার প্রচার করা হয় বা বলা হয়, তখন মানুষ ওই বিষয়কে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় বা মনোযোগী হয়। যেমন- টেলিভিশনে একই বিজ্ঞাপন বারবার দেখানো হয়।
সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে নতুন আচরণ গ্রহণ। যথাযথভাবে প্রথম দুটি ধাপ অতিক্রম করার পরেই মানুষ নতুন আচরণ প্রতিপালন করে থাকে। অর্থাৎ এ পর্যায়ে তারা নতুন আচরণকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করে এবং ক্রমাগতভাবে তা চর্চা করতে থাকে।
তবে এভারেট এম রজার্সের 'ডিফিউশন অব ইনোভেশন' ধারণা অনুযায়ী সমাজে সাধারণত সব ইনোভেশন গ্রহণের ক্ষেত্রে 'ল্যাগার্ড' বা 'পিছিয়ে পড়া' একটি দল থাকে, যারা কোনো নতুন ধারণা বা আচরণকে কখনোই গ্রহণ করতে চায় না। সে বিবেচনায় এখানেও একটি দল থাকতে পারে যারা নতুন আচরণ প্রতিপালন করতে আগ্রহী থাকবে না। তবে অন্যান্য প্রেক্ষাপটে তারা কেবল নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও করোনা পরিস্থিতিতে তারা অন্যদের জন্যও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তাই তাদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাব্যবস্থা, খাদ্যসামগ্রীসহ সংশ্নিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা :সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ দেশব্যাপী এত বড় জরুরি ব্যবস্থাপনার সম্মুখীন হয়নি। তাই সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে আমাদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতির মোকাবিলার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো ও সিভিল সোসাইটির বিভিন্ন উদ্যোগকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়ে ভাবা যেতে পারে।
আমাদের যে খাদ্যসামগ্রী বা ত্রাণ সরবরাহের ব্যবস্থাপনা সে ক্ষেত্রেও আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সবাই ভিড় না জমিয়ে নির্দিষ্ট কোনো খোলা মাঠে দূরত্ব অবলম্বন করে তা বিতরণ করা যেতে পারে বা স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে বাড়ি বাড়ি তা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সেক্টর অনুযায়ী বর্তমানে আমরা কিছু 'র‌্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট' সম্পন্ন করতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই দায়িত্ব পালন করতে পারে। এর ফলে বর্তমান জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ও কার্যকর হবে। এ ছাড়া এমন মহামারি মুহূর্তে সর্বদাই বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে পড়ে, এ ক্ষেত্রে আমাদের নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমগুলো বর্তমান সময়ের মতো সচেতন থাকলে তা সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব। সব মিলিয়ে বলা যায়, সুষ্ঠু সমন্বয় ও যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হলে আমরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মতো করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও অনেক সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হবো।
  লেখকদ্বয় যথাক্রমে স্বাস্থ্য যোগাযোগবিদ ও অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : করোনা