ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি প্রাণী-সারাবিশ্বকে সে টালমাটাল করে দিচ্ছে। হাজার হাজার কোটি ডলার, লাখো কোটি কামান-বন্দুক, দুনিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান, রকেটসম গতি, ইন্টারনেটের অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি কিছুই তার সামনে দাঁড়াতে পারছে না। সবাই তাকে ভয় পাচ্ছে, গুটিয়ে যাচ্ছে, সংকুচিত হচ্ছে আর সে বীরদর্পে একটার পর একটা দেশে ঢুকে যাচ্ছে, সংহার করছে একটার পর একটা প্রাণ, থামছে না কিছুতেই, আটকানো যাচ্ছে না তাকে কিছুতেই। দম ফেলার অবসরটুকুও পাচ্ছি না আমরা। এই হচ্ছে বর্তমান অবস্থা। চারদিক থমথমে, সবকিছু যেন অসহ্য অনিশ্চয়তায় আক্রান্ত। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ এখনই ঠান্ডা মাথার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন!

এর পরও আমরা নিশ্চয়ই বিশ্বাস রাখব মানুষের শক্তিতে, তার সাধনায়, তার অসংকুচিত সাহসে, ভাইরাসকে মোকাবিলার ক্ষমতায়। আজ হোক, কাল হোক প্রাণঘাতী করোনার প্রতিষেধক মানুষ আবিস্কারে সক্ষম হবে। নতুন ক্ষমতায় সুসজ্জিত হয়ে মানুষ আবার এই স্বাভাবিক পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে বিচরণ শুরু করবে। শিক্ষা নিয়ে হয়তো প্রকৃতির প্রতি আরও সচেতন, আরও সহানুভূতিশীল হবে ভবিষ্যতের মানুষরা। ততদিন টিকে থাকবে আমাদের কষ্টের কাল, সংকট দুশ্চিন্তার কাল, গৃহবন্দি থাকার কাল, মৃত্যুর প্রহর গোনার কাল; কিন্তু নিশ্চয়ই আতঙ্কিত না হয়ে সংকুচিত ও ম্রিয়মাণ না হয়ে পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখাটা আজ আরও জরুরি, আরও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে বটে। তবে সে স্বপ্ন বা আশাবাদ 'বোকার স্বর্গের' মতো বা 'পাগলের প্রলাপের' মতো বা 'নিশ্চিন্ত গর্দভের' মতো হলে চলবে না। সেখানে থাকতে হবে ইস্পাত দৃঢ় মনোবল, যার ভিত্তি হবে বিকশিত জ্ঞান এবং হার না মানা অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস, সম্মিলিত যুদ্ধের আয়োজনে সর্বোচ্চ পারস্পরিক সহযোগিতার প্রস্তুতি এবং সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে দশ হাতে নানামুখী কাজের জন্য প্রেরণা। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও পরস্পরের সহযোগিতার জন্য দরকার নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির সুবিবেচিত ব্যবহার। করোনা আমাদের পৃথিবীকে সংকটে জর্জরিত করে, নিজেদের মধ্যে বেঁচে থাকার যুদ্ধের মাধ্যমে পরস্পরকে পরস্পর থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে না দিক, সবাই মিলে বেঁচে থাকার শিক্ষাটা যেন আমরা ফিরে পাই- এই হোক আজকের দাবি। সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য বাংলাদেশে এই মুহূর্তের একাধিক করণীয় আছে-

১. করোনা মোকাবিলায় প্রথম করণীয় হচ্ছে না ঘাবড়ানো। এ কথা সত্য যে, করোনা অদৃশ্য এক জীবাণু; কিন্তু তাই বলে সর্বত্র সে নেই। সে আছে সংক্রমিত মানুষের দেহে। আর তার দেহ থেকে সে আসতে পারে আরেক দেহে একমাত্র তখনই, যখন দুটি দেহ পরস্পরের কাছাকাছি কোনো না কোনো ধরনের নিকট সংস্পর্শে আসে, না হলে নয়। তাই চোখ খোলা রেখে এবং সবচেয়ে আগে নিজের চোখকে খোলা রেখে সজাগ হতে হবে তাকেই সর্বাগ্রে; যে কিনা নিজে ভাবছেন যে, তিনি নিজে আক্রান্ত হয়েছেন। আর নিজে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু যে অনিবার্য নয়, সেটাও মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। ১০০ জন আক্রান্ত হলে ৫ থেকে ১০ জন মৃত্যুবরণ করছে বা করতে পারেন, বাকি ৯০ জন তো ভালোই হয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং যিনি আক্রান্ত হবেন বলে মনে করবেন, তাকেই আত্মবন্দিত্ব বরণ করে নিতে হবে স্বেচ্ছায়। দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে তাকে। সেই সুযোগ যাতে তার থাকে, সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে সমাজের বাকি সবাইকে। অন্যদেরও তখন তাকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসালয়ে পাঠিয়ে দিতে হবে।

২. ওপরের কাজগুলো ঠিকমতো প্রণিধানের জন্য প্রধান প্রয়োজন দুটি-ক. পর্যাপ্ত জায়গায় করোনা টেস্টের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং খ. পর্যাপ্ত জায়গায় বিচ্ছিন্ন থাকার মতো ক্লিনিক-হাসপাতালের বা করোনাঘরের ব্যবস্থা।

করোনা রোগীকে দ্রুত শনাক্তকরণ এবং দ্রুত তার বিচ্ছিন্নকরণ, দেশে অনুপ্রবেশের সব কেন্দ্র থেকেই তা শুরু হতে হবে। সব করোনা রোগীর জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ডাক্তার, পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় সস্তা ওষুধপত্র ও প্রতিকারের ব্যবস্থা। শ্বাসকষ্ট দূর করার জন্য পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা। যারা আক্রান্ত হননি তাদের জন্য পর্যাপ্ত মাস্ক, স্যানিটাইজার ও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা- এই প্রাথমিক কাজগুলো সবই হচ্ছে; একই সঙ্গে প্রতিরোধক এবং প্রতিষেধক ব্যবস্থা। এসব বিষয়ে চাইনিজরা আমাদের শেখাতে পারে। তারা যেমন প্রথমে দ্রুত আক্রান্ত সীমিত এলাকায় পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর তা দ্রুতই পরিশোধন শেষে স্বল্প সময়েই সে এলাকা থেকে লকডাউনও উঠিয়ে নিয়েছে ধাপে ধাপে। আমরাও সে রকম নির্বাচিত সীমিত এলাকায় ভবিষ্যতে কঠোর লকডাউন চালু করতে পারি। প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক ব্যবস্থার সরবরাহ দ্রুত যদি না বাড়ানো যায়, তাহলে যেটুকু আছে তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের জন্য সেসব কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুবিধাটুকু অন্তত সবার নাগালের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে।


৩. পৃথিবীতে ধুলো আছে, সে জন্য পৃথিবীকে চামড়া দিয়ে না ঢেকে পায়ে ধুলো যাতে না লাগতে পারে, সে জন্য নিজ নিজ পা ঢেকে দেওয়ার কৌশল নেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যারা করোনা বহন করছেন, তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের বিচ্ছিন্ন করুন, তাহলে বাকিরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হয়েও নিরাপদ থাকবেন। এটাই আমাদের বোঝা জরুরি। তারপর যত দ্রুত পারা যায় হাসপাতালে নিজেই নিজেকে স্থানান্তরিত করি। কিন্তু এসব না করে অজানা আতঙ্কে এখনই ভয়ে সংকুচিত হয়ে করোনা আক্রান্ত হওয়ার আগেই আরেকবার করোনাভীতিতে আক্রান্ত হওয়ার কোনো অর্থ নেই।

৪. যাদের সামর্থ্য আছে তারা বা আমরা ঘর থেকে বের হচ্ছি না। মাস্ক ছাড়া চলছি না। আমরা ভাবছি, সাবধানের মার নেই। কিন্তু এভাবে বেশিদিন কোনো দেশ চলতে পারে না। সব বন্ধ করে অতীত সঞ্চয় ভাঙিয়ে বেঁচে থাকার সাধ্য ধনীদের থাকলেও নিম্নবিত্তদের নেই। সুতরাং যারা সেভাবে থাকতে পারছেন ও থাকছেন, তারা পারলে আরও কিছুদিন সেভাবেই থাকুন (বিশেষত ষাটোর্ধ্ব মানুষরা এবং নানা রোগে আক্রান্তরা); কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণকে কাজ করেই খেতে হবে। নির্মম শোনালেও এ কথা সত্য যে, 'করোনা তাদের পেটেও' আছে, তাকে ঠান্ডা করাটাও কম জরুরি নয়। সেই লক্ষ্যে 'উৎপাদন' অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে আয়-রোজগারও অব্যাহত থাকে। যেসব উৎপাদন শ্রমঘন, যেমন- কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, শ্রমঘন রপ্তানি খাত, সেসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনশীল প্রণোদনার প্রয়োজন আছে। একই সঙ্গে সেসব জায়গায় যোগদানকারী শ্রমজীবীদের করোনা চেকআপ ও সুরক্ষার ব্যবস্থাও যতটুকু করা দরকার করতে হবে।

৫. এর পরও যারা বৃদ্ধ, যারা কর্মহীন, যারা প্রতিদিন রাস্তায় টুকটাক করে খেতেন, যারা যানবাহন চালান ও যারা কন্ট্রাক্টরের অধীনে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন, যারা দিন আনেন দিন খান, তাদের জন্য আপৎকালীন সরাসরি নিম্নমূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও গৃহের ব্যবস্থা করতে হবে, প্রতিজ্ঞা করতে হবে যাতে ক্রয়ক্ষমতার অভাবে এ দেশে দুর্ভিক্ষ না হয় এবং খাদ্যের সন্ধানে ও গৃহহীন হয়ে দরিদ্ররা চতুর্দিকে ছড়িয়ে না পড়েন। এ জন্য সরকারের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় ও শ্রমঘন অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলো বর্ধিত বরাদ্দসহ অব্যাহত রাখাটা জরুরি। তাই বিশেষ ত্রাণ তহবিল খুলতে হবে এবং সামর্থ্যবানদের সেখানে সাধ্যমতো দান করতে হবে। সরকারি যন্ত্রের ওপর সবসময় ভরসা না রেখে নানা সামাজিক স্বেচ্ছাসেবায় এগিয়ে আসতে হবে। কিছু না পারলে সরকারি ত্রাণ বণ্টন ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেটা তত্ত্বাবধান করাটাও একটা কাজ হতে পারে।

৬. প্রধানমন্ত্রী যে আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার। কোথায়, কাকে, কেন, কতটুকু দেওয়া হচ্ছে, তার একটা হিসাব নিয়মিত তথ্য সেবার মতো করে জনগণকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। যাতে নিজের পাওনা নিজেই তারা বুঝে নিতে পারেন। টাকাটা যাতে নিম্নবিত্ত জনগণের কর্মসংস্থান সহায়তা বা জরুরি খাদ্যভোগ হিসেবে প্রকৃত কাজে আসে, তা নিশ্চিত করা দরকার। সবশেষে বলব, এখনই আশু ও জরুরিভাবে স্বাস্থ্য খাতে করোনার প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক ব্যবস্থাগুলো আমদানি করে বা সাহায্য হিসেবে বাড়ানো দরকার। আমাদের বীর চিকিৎসকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী বিদেশি অভিজ্ঞ চিকিৎসকদেরও নিয়ে আসা যেতে পারে।

আমরা যথার্থই বীরের জাতি। মুক্তিযুদ্ধে যেমন আমরা বীরের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই ও জয়লাভ করেছি; করোনাযুদ্ধেও আমরা নিশ্চয় জয়লাভ করব।

অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়