রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে প্রথমবারের মতো সর্বসম্মত যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, সেটাকে আমরা সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানাতে চাই। এটা ঠিক যে, এ ধরনের প্রস্তাবে এবার সর্বোচ্চ সংখ্যক ১০৭টি দেশ সহপৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে এবং অতীতের চারবারের মতো কোনো দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়নি। মিয়ানমার ইস্যুতে অধিকাংশ সদস্য দেশের সঙ্গে দৃশ্যত দ্বিমত প্রকাশকারী চীন ও রাশিয়াও এবার ঘোষণা দিয়ে ভোট প্রদানে বিরত থাকেনি। এ ছাড়া এবার যেভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওআইসির পক্ষ থেকে যৌথভাবে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়েছে, তাও উৎসাহব্যঞ্জক। প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতির এই ভাষ্যের সঙ্গেও আমরা একমত যে, দুটি আন্তর্জাতিক জোটের এ ধরনের ঐক্য মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এই প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে মিয়ানমার কতখানি 'চাপের মুখে' পড়ল, এ নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছরই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ ধরনের প্রস্তাব পাস হয়ে আসছে। কিন্তু সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলোর ইশারা সুদূর পরাহত। বস্তুত সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে কোনো বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এজন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মত প্রস্তাব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে চীন ও রাশিয়া বরাবরই মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। এমনকি প্রভাবশালী এই দুই সদস্যের অসম্মতির কারণে নিন্দা প্রস্তাবও গ্রহণ করা যায়নি। এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সচল হওয়া দূরে থাক; সীমান্তের ওপাশে এই জনগোষ্ঠীর যেসব সদস্য মাটি কামড়ে পড়ে ছিল, তারাও নানা সংকটের মুখে পড়ছে।

আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমার সরকার যেসব ইতিবাচক কথা বলত, দেশটিতে গণতান্ত্রিক সরকার সরিয়ে ক্ষমতায় আসা সামরিক সরকারের বরং সেই 'চক্ষুলজ্জা' কেটে গেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তুলনায় ঘনিষ্ঠভাবে দেশটির সঙ্গে কাজ করা আসিয়ানের কড়া অবস্থানেও ইয়াঙ্গুনের সামরিক জান্তা যে সামান্যই বিচলিত, তা সম্প্রতি আবার প্রমাণ হয়েছে। বস্তুত এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা আগেও মিয়ানমারের দ্বিমুখী চরিত্র সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছি। এমনকি গত বছরের গোড়ায় যখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমার দৃশ্যত পরাজিত হয়েছিল, তখনও আমরা সতর্ক থাকতে বলেছিলাম।

স্বীকার করতে হবে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল। কিন্তু প্রায় দুই বছরে পরিস্থিতির কি কোনো উন্নতি হয়েছে? আমরা মনে করি, একমাত্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রতিবেশী দেশটির সম্বিত ফিরবে না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আলোচ্য প্রস্তাবে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে সেদিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়াকে পক্ষে আনার বিকল্প নেই। বিশেষত চীনকে মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি, বেইজিংয়ের দূতিয়ালিতেই ২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হয়েছিল।

আমরা জানি, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ এখনও চীনের ওপর আস্থা হারায়নি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও নীতি ও আদর্শিক দিক থেকে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। বর্তমান রাশিয়া সোভিয়েত আমলের ভূমিকায় না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তাতে করে রোহিঙ্গা সংকটে দেশটির ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল।

সাধারণ পরিষদে দুই দেশ যে আলোচ্য প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয়নি বা আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট প্রদানে বিরত থাকেনি, সেটা ইতিবাচক তখনই হবে যখন নিরাপত্তা পরিষদেও একই অবস্থান দেখতে পাব আমরা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরা দেখতে চাইব, বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক মনোযোগ নিরাপত্তা পরিষদেই নিবদ্ধ করবে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এ ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ পরিষদের মতো নিরাপত্তা পরিষদেও 'প্রেশার গ্রুপ' হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওআইসির মতো আন্তর্জাতিক জোট ও সংগঠনগুলোকেও কাজে লাগানোর বিকল্প নেই।