মার্কিন সাময়িকী টাইম-এর সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট সিমন শুস্টার গত ১৯ এপ্রিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একটি সাক্ষাৎকার নেন। এর নির্বাচিত অংশ টাইম-এর অনলাইন সংস্করণ থেকে সমকালের জন্য ভাষান্তর করেছেন সাইফুর রহমান তপন

জাতির উদ্দেশে আপনার সাম্প্রতিক ভাষণে আপনি পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাস পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। কেন এ ঘোষণা?

রাশিয়ানরা বহু দিন ধরে সেখানে তাদের সৈন্য সমাবেশ করছিল...; এখন মনে হচ্ছে, তারা তা শেষ করেছে। যেভাবে তাদের সামরিক অভিপ্রায় আমরা বুঝি, তাতে মনে হচ্ছে, তারা তাদের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে; পরিকল্পনাও চূড়ান্ত। তাই আমার এ ঘোষণা।

আপনি কি মনে করেন, এ লড়াই-ই শেষ লড়াই হতে চলেছে?


অনেক দিক বিবেচনায় আমার উত্তর হবে ইতিবাচক। আমি এ সময়কে এভাবে চিহ্নিত করতে চাই :নানা দিক থেকে একটা কঠিন পরিস্থিতি আমরা মোকাবিলা করছি; আমাদের সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ করছে। বর্তমানে তারা উত্তর ও দক্ষিণাংশে যুদ্ধ করছে।

এ যুদ্ধ হবে একটা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ। ইউক্রেনের মাটিতে আজ পর্যন্ত সংঘটিত যে কোনো যুদ্ধের চেয়ে তীব্রতর হবে এটি। এ যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ানরা আমাদের সর্বোচ্চ পরিমাণ এলাকা দখলে নিতে পারে; আমাদের সেনাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপগুলো ঘেরাও করে ফেলতে পারে। তাদের মধ্যে এমন আকাঙ্ক্ষা আছে বলে মনে করি। তবে আমি নিশ্চিত, তারা যা-ই করুক, তাদের এ জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। তারা জানে, এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। কারণ, এমন কিছুই ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান সংলাপ প্রভাবিত করতে পারে। খেলায় ঘুঁটিগুলো কীভাবে সাজানো হবে তা-ও নির্ভর করছে এর ওপর। আমি মনে করি, এটা যেমন আমাদের মধ্যকার সংহতিকে প্রভাবিত করবে, তেমনি তাদের সেনাদের মনোবলকেও প্রভাবিত করবে। আমরা যদি এ কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারি তাহলে একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে, দেশে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আমরা তা পারব- এটাই হবে আমাদের জন্য চূড়ান্ত এক যুদ্ধ। বলতে পারেন এখান থেকেই হবে শেষের শুরু, যেখানে কূটনীতিসহ নানা পদক্ষেপ থাকবে।

আমাদের সেনা দলের বড় অংশ সেখানে আছে; সেই সঙ্গে আছে বহু ভিকটিম। এর একটা প্রভাব তো অবশ্যই আছে। হয়তো রুশ ফেডারেশনের সামরিক নেতৃত্বের কাছে এগুলো তেমন কিছুই নয়, কিন্তু আমাদের কাছে তা বিরাট কিছু। কারণ একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে কতজন লোক মারা গেল, আমার কাছে তা গুরুতর বিষয়।

অবরুদ্ধ মারিউপোলের আজভস্টাল স্টিল কারখানায় বহু বেসামরিক লোকসহ আপনার কয়েকশ সেনা আটকে আছে। আপনার কি তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে?

আমরা প্রতিদিনই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। গতকাল বা পরশু তাদের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। মাঝেমধ্যে তারা মেসেজও পাঠায়।

সরাসরি আপনার কাছে?

হ্যাঁ, সরাসরি আমার কাছে। মাঝেমধ্যে তারা প্রশ্নও করেন। কিছু আছে এমন প্রশ্ন, যার উত্তর খুব কঠিন। তবে তারা খুব শক্ত মনের মানুষ। তাদের মধ্যে অনেক ছেলে এরই মধ্যে মারা গেছে। বহু আহত মানুষকেও তাদের দেখাশোনা করতে হচ্ছে।

তাদের সঙ্গে আমার বহু বিষয় নিয়ে কথা হয়। প্রথমত, এমন পরিস্থিতিতে আপনাকে টিকে থাকতে হবে এবং তারা সত্যিই টিকে আছে। এটা শুধু আজভস্টাল বা মারিউপোলের বিষয় নয়; এটা হলো আমরা সবাই কী পরিস্থিতি কেমন করে মোকাবিলা করছি, তারই একটা প্রতীক। শত্রুর উদ্দেশ্য ছিল পিছু হটিয়ে আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া; তারা তা পারেনি।

রাশিয়ানদের কাছেও এর একটি প্রতীকী মূল্য আছে। এ জন্যই তারা এই হীন ধরনের খেলা, রক্তক্ষয়ী খেলা খেলে যাচ্ছে; যেখানে তারা বলছে- বদলা নাও তবে অন্যকে বদলা নিতে দিও না। আমার বিবেচনায় তাদের এসব কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য হলো একজন মানুষকে যতটা সম্ভব অপমানিত করা; মানুষকে না খেয়ে থাকতে বাধ্য করা। তবে আমাদের যেভাবে আহত করা হয়েছে আমরা তার বদলা নিতে চাই। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। আমি মনে করি, তা ভালোই ফল দেবে।

আজভস্টালের সেনাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে, তা কি একটু বিস্তারিত বলবেন?

আমাদের ৩৬তম ব্রিগেড (স্বতন্ত্র নৌ সেনা) সেখানে আসলেই এক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। একটা দুর্যোগের মতো এটা। খাদ্য নেই, পানি নেই, অস্ত্র নেই। তাদের সবকিছু ফুরিয়ে গেছে। আমরা পরস্পরকে সাহস জোগানোর কাজ করছি। তাদের কমান্ডার পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাকে বলেছেন, তারা না পারছেন পিছু হটতে, না পারছেন আক্রমণ করতে। কারণ তাদের বন্ধুদের ফেলে যেতে পারছেন না তারা। এটা একটা মানবিক বিষয়, এমন একটা পরিস্থিতি; যেখানে মানুষের আসলেই সাহায্য প্রয়োজন।

২৪ ফেব্রুয়ারি আগ্রাসন শুরুর দিনটির কথা কিছু বলবেন? আমরা শুনেছি, ওরা আপনার প্রাসাদে ঢোকার চেষ্টা করেছিল; রাস্তায় বন্দুকযুদ্ধও হয়েছে।

খণ্ড খণ্ড চিত্র আমি দিতে পারি। শুরুর দিনগুলো আমাদের সবার জন্যই ছিল খুব কঠিন। আমার মনে হয়, ইউক্রেনের সবাই- যে যে দায়িত্বেই থাকুন না কেন; প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। আপনি যখন একটি দায়িত্বে থাকেন, তখন সেটাই আপনার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। বাকি সবকিছু এক পাশে সরিয়ে রেখে ওই দায়িত্ব পালনই আপনার কাছে অগ্র্রাধিকার পায়। আপনাকে মনে রাখতে হয়, এটি একটি যুদ্ধ। এর উপসর্গ নিয়ে ভাবার সময় আপনার হাতে থাকে না। আপনি জানেন, আপনার ওপর ওরা নজর রাখছে। আপনি একটি প্রতীক। একজন প্রেসিডেন্টের যা করা উচিত, আপনাকে ঠিক তা-ই করতে হবে। ফলে আমাকে অবশ্যই সেই রাতের কথা স্মরণে রাখতে হবে। আমার মনে আছে বিস্ম্ফোরণের কথা, আমার সন্তানদের কথা।

কার সন্তান?

আমার সন্তান। আমি তাদের জাগালাম। বিশাল বিশাল শব্দ হচ্ছিল; বিস্ম্ফোরণের শব্দ। আমি দ্রুত অফিসে এলাম। আমাদের প্রায় সবাই জড়ো হলাম সেখানে এবং দ্রুত যা করা দরকার তা করতে শুরু করলাম।

তখন আপনার পরিবার আপনার সঙ্গে ছিল?

হ্যাঁ, আমাদের সবারই পরিবার আছে; আমরা তো মানুষ, তাই না। আবার আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্তও নিতে হয়।

প্রথম আপনি কখন প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ ছেড়ে গেলেন?

আমরা প্রথম দিনই তা করেছি। সেখানে কোনো ছবি তোলা বা খবর প্রকাশের সুযোগ ছিল না। আমার রক্ষীরা আমাকে বলল- দেখুন, আপনি বাইরে যেতে চাইলে আমরা তা অন্যদের জানিয়ে দিতে পারি না। আমরা সংবাদমাধ্যমকে তা জানাতে পারি না। আমরা বেরিয়েছিলাম চেক পয়েন্টগুলো দেখতে; সেখানে আমাদের সেনারা কীভাবে দায়িত্ব পালন করছে তা দেখতে। তবে এই বের হওয়াটা মন্দ ছিল না।

আপনার দেহরক্ষীরা নিশ্চয় মেজাজ হারিয়েছিল-

হ্যাঁ, তারা মেজাজ হারিয়েছিল। কারণ আমরা এক পর্যায়ে সামনের দিকে যেতে পারছিলাম না। ওখানে একটা সেতু ছিল; তা উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা ছাড়া রাস্তায় বড় বড় গর্তও তৈরি হয়েছিল; সামনে যাওয়াটা ছিল অসম্ভব। তবে এসব ছিল চেক পয়েন্ট ছাড়িয়ে আরও সামনের ঘটনা।

যুদ্ধটা যে একেবারে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ হবে- তা আমাদের ধারণায় ছিল না। আপনি কি ওই সময়ে নেওয়া আপনার সিদ্ধান্তের জন্য কোনো অনুশোচনা বোধ করেন?

মোটেও না। এক মুহূর্তের জন্যও না। এমনকি এটা আমার ভাবনায়ও আসে না। আমার কাছে বরং মনে হয়, আমি একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম; একেবারে সঠিক সিদ্ধান্ত।

আপনার জেনারেলদের সঙ্গে সর্বশেষ মিটিংয়ে তারা আপনাকে পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধ নিয়ে কিছু বলেছেন?

আমরা এটা বুঝতে পারছি যে, প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন- এটা পূর্ণ মাত্রার প্রক্রিয়া কিনা। পূর্বাঞ্চলে যা ঘটছে, কিছু ক্ষেত্রে তা স্রেফ উন্মত্ততা। সেখানে প্রতিদিন ভয়ংকর রকমের এক পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ হচ্ছে। সেখানে যেভাবে মুহুর্মুহু হামলা হচ্ছে; ভারী অস্ত্রশস্ত্রের হামলা এবং এর ফলে যে ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা সত্যিই ভয়াবহ। অর্থাৎ ওইসব এলাকায় ইতোমধ্যে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।