তিনটি রাজনৈতিক দল ছাড়া সবাই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ছাড়া কেউ নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করছে না। আগামী নির্বাচনের পর আরও একটি বা দুটি দল বিলুপ্ত হতে পারে। সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন কথাই বললেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাজীব আহাম্মদ

সমকাল: সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে একনায়ক বললেন, যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী উষ্ফ্মাও প্রকাশ করেন। হঠাৎ বিরোধী দল হওয়ার বাসনা কেন? বিলম্বিত বোধোদয়, নাকি বঞ্চনায়?

জি এম কাদের: যত দিন দায়িত্বে, তত দিন জাতীয় পার্টি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। সমস্যা হলো মানুষের ধারণা, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে রয়েছে। কারণ, আমরা নির্বাচন একসঙ্গে করেছি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশল। বিএনপির সঙ্গে জোট হলে জাতীয় পার্টি বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য নেই।

সমকাল: বিএনপির মতো জাপাও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলে রাজনীতি করে। বিএনপিই তো আপনাদের ন্যাচারাল পার্টনার হওয়ার কথা।

জি এম কাদের: তা ঠিক। এ কারণেই তাদের সঙ্গে জোট হলে নেতাকর্মী হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের বাইরে বিএনপির সঙ্গে কিছু পার্থক্য রয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গেও রয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আবার অনেক মিল আছে। যেমন- দলীয়করণ, দুর্নীতি, দুঃশাসন। আদর্শগত অমিল থাকায় জাতীয় পার্টির আওয়ামী লীগে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা নেই।

সমকাল: দলের এমপি-নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন, সরকারের দালালি করা যাবে না।

জি এম কাদের: বিরোধী দলের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্যই এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সমকাল: সাড়ে আট বছরের অবস্থান আগামী দেড় বছরে বদল সম্ভব?

জি এম কাদের: আমরা অন্তর থেকে চেষ্টা করছি।

সমকাল: মাঝেমধ্যেই বলেন, রাজনীতি ও রাজনীতিকরা সাইড লাইনে চলে গেছে। তাহলে কীভাবে উদ্ধার পাবেন?

জি এ কাদের: তিনটি রাজনৈতিক দল ছাড়া সবাই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজনীতি ও রাজনীতিকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আস্তে আস্তে আরও অনেকেই সাইডলাইনে চলে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ছাড়া কেউ নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করছে না। আগামী নির্বাচনের পর আরও একটি বা দুটি দল বিলুপ্ত হতে পারে। সামনে আর কোনো রাজনৈতিক দল থাকে কিনা...।

সমকাল: তিনটি দলের মধ্যে একটি বা দুটি বিলুপ্ত হলে তো থাকে আর একটি!

জি এম কাদের: এখন দেশ চলছে ঔপনিবেশিক পদ্ধতিতে। যেখানে শাসক দেশ শাসন করছে প্রশাসনের মাধ্যমে। ঔপনিবেশিক পদ্ধতিতে শাসকরা তাদের লাঠিয়াল-ভৃত্যের মাধ্যমে দেশকে শোষণ করায়। ব্রিটিশদের কাছ থেকে এ পদ্ধতি পাকিস্তানে এসেছিল। স্বাধীনতার পর আমরা যতটা উন্নতি করেছিলাম, জনপ্রতিনিধিদের শাসনে যতটা উন্নতি হয়েছিল, ততটাই আবার পেছনে চলে গেছি।

সমকাল: সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ফেসবুক ছেড়ে নেতাকর্মীদের রাস্তায় থাকতে বলেছেন। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল বলছে, তারা আন্দোলনের নূ্যনতম অধিকার পাচ্ছে না।

জি এম কাদের: নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ব্যর্থ হলে অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি চলে আসে। কোনো কিছু ফাঁকা থাকে না। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্পেস দেওয়া না হলেও অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান হবে, যা শেষ পর্যন্ত চরমপন্থায় পৌঁছাবে।

সমকাল: ডান, নাকি বামপন্থি চরমপন্থার কথা বলছেন।

জি এম কাদের: হতাশা ছড়িয়ে পড়লে উগ্রবাদের উত্থান হয়। স্বাধীনতার পর এই হতাশায় বামপন্থার উত্থান হয়েছিল। এখন বাংলাদেশ ও বিশ্বপ্রেক্ষিতে ডানপন্থি চরমপন্থার উত্থান হতে পারে, যা জঙ্গিবাদ। এই জুজুর ভয় দেখিয়েই সরকার এত দিন ধরে চলছে। সরকারের নিপীড়ন যদি চলতে থাকে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হয়, মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ না থাকে, তাহলে একসময় সত্যিই জঙ্গিবাদের উত্থান হতে পারে। বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের উর্বরভূমি হয়ে রয়েছে। মানুষকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবেশ রয়েছে। সরকারকে তা জানিয়ে আসছি। বিএনপির সরকারকেও জানিয়েছিলাম। কানে তোলেনি।

সমকাল: সেই বিএনপিকেই তো এবারের রমজানে ১৫ বছর পর ইফতারে দাওয়াত করলেন।

জি এম কাদের: মনে করেছিলাম, ধর্মীয় পরিবেশে সবাই মিলে একসঙ্গে বসলে মুখ দেখাদেখি বন্ধের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা ভাঙবে। এতে আস্তে আস্তে সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হবে। আগে এমন উদ্যোগ নেওয়ার পরিবেশ ছিল না। এখন পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তাই দাওয়াত করেছিলাম।

সমকাল: 'পরিবেশ তৈরি মানে' কি আগামী নির্বাচনকে বোঝাচ্ছেন? আপনার দল কি তাহলে বিএনপিকে 'অলিভ ব্রাঞ্চ' দেখাচ্ছে?

জি এম কাদের: বিএনপির কাজে খুশি নই। কিন্তু সামনে তারা একই কাজ (দলীয়করণ, দুর্নীতি, দুঃশাসন) করবে- তা কিন্তু নয়। আওয়ামী লীগ ২০০০ সালে দেশকে দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিল। বিএনপি তা অব্যাহত রেখেছিল। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করেছিল বিএনপি। আওয়ামী লীগ একই কাজ করে বিশ্বে সমালোচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। করেছে?

সমকাল: বিএনপি ভুল না করার প্রতিশ্রুতি দিলে জোট হতে পারে?

জি এম কাদের: নির্বাচন এখনও অনেক দূরে। সবার চরিত্র দেখেছি। তবে কোনো দরজা বন্ধ করতে চাই না। নির্বাচন আসুক, দেখা যাবে।

সমকাল: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তো এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে জাপা পরিস্কার করে কিছুই বলছে না। জাপা কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা নিষেধাজ্ঞার জন্য মার্কিন সরকারের সমালোচনা করে র‌্যাবকে ভালো বলেছেন।

জি এম কাদের: কিছু নেতা দলের বক্তব্যের বাইরে গিয়ে কথা বলেন। নিষেধাজ্ঞা ভুল, না শুদ্ধ- তা বলব না। তবে সরকার যা বলে, তা-ও ঠিক নয়। সরকার বলছে, 'সবাই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।' এই অস্বীকারের নীতি থেকে সরকারকে বের হয়ে আসতে হবে। সরকারের দায়িত্ব ছিল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিযোগ যে সত্য নয়, তা প্রমাণ করা; ব্যাখ্যা দেওয়া। আকাশে-বাতাসে কথা বললে হবে না। সমস্যার সমাধান করতে হবে। আমেরিকা এমন দেশ নয়, কেউ তাদের র‌্যাব নিয়ে ভুল তথ্য দিল, তাতেই তারা লাফিয়ে পড়ে নিষেধাজ্ঞা দেবে।

সমকাল: আপনি তো নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রায়ই অভিযোগ তোলেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে নানা সময়ে নানা কথা বলেছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কি জাপার উতরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে?

জি এম কাদের: আমরা দেশের ভালো চাই। ভালো নির্বাচন চাই। জবাবদিহির জন্য ভালো নির্বাচন চাই। আমরা মনে করি না, খুব খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ব।

সমকাল: প্রধানমন্ত্রী সব দলকে নির্বাচনে আনার ও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নির্বাচন হবে বলে মন্তব্য করেছেন।

জি এম কাদের: ইভিএমে ভোট মানে হলো বসবাসের উপযোগী না করে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর মতো। ইভিএমে কেউ কত ভোট পেয়েছে, তা চ্যালেঞ্জ করার উপায় নেই। ইভিএমে ভোট করার যৌক্তিকতা নেই।