গত সোমবার ব্রিটেনের রানীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতিতে সারাবিশ্বের মানুষ দেখেছে, কত মর্যাদায় রানীকে শেষ বিদায় জানানো হয়। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর আরেকটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রথমে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করলেও পরে না করে দিয়েছেন। কেন তিনি না করেছেন, তা স্পষ্ট জানা না গেলেও এমন হতে পারে- তিনি জাপানের ৫৭ শতাংশ লোকের মতামতকে সম্মান করেছেন, যাঁরা রাষ্ট্রের খরচে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে রাজি নন। জাপানের সুশীল সমাজ এর বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়। তারা বলে, রাষ্ট্রের খরচ তথা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এটা করা যাবে না। আবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এ সিদ্ধান্তে সরকার ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে অনেক।

গত ৮ জুলাই শিনজো আবে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। বাংলাদেশ এক দিন শোক পালন করে। কিন্তু আবে যেদিন মারা যান, সেদিন জাপানের সরকারি টিভি চ্যানেল তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রচার করলেও বেসরকারি চ্যানেলের নিয়মিত অনুষ্ঠানের কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। এ দেশের টিভিতে হাসি-তামাশার অনুষ্ঠানই বেশি হয়, যা আগের মতো চলতে থাকে। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, দোকানপাট- কোথাও কারও মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পাইনি।

শিনজো আবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শুধু বিরোধিতা নয়, জাপানে লোকজন ও সুশীল সমাজ সন্দেহভাজন হত্যাকারী তেছুয়া ইয়াগামির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে নানা রকম পদক্ষেপ নেয়। তাঁকে উৎফুল্ল রাখতে শত শত লোক থানা ও ডিটেনশন সেন্টারের কাছে ভিড় জমায়। সাজা মওকুফ করার জন্য সরকারের কাছে কয়েক হাজার লোক আবেদন জানায়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর নামে মিলিয়ন ইয়েন (জাপানি মুদ্রা) অনুদান পাঠায়। তাঁকে উপহার হিসেবে টাকা-পয়সা, কাপড়, খাবার, কমিক বই পাঠাতে থাকে। তেছুয়া ইয়ামাগামিকে পাঠানো উপহারের পরিমাণ এত বেশি যে ডিটেনশন সেন্টারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় লোকজন তাঁর আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ওগুলো পাঠিয়েছে।

তেছুয়া ইয়ামাগামির মা কোরীয় এক ধর্মীয় সংগঠন- দ্য ফ্যামিলি ফেডারেশন অব ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড ইউনিফিকেশনে বড় অঙ্কের টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। যে কারণে তাঁদের পরিবার আর্থিক অনটনে পড়ে। আবে এই ধর্মীয় সংগঠনের শুভেচ্ছাদূত ছিলেন। ধর্মীয় এই সংগঠন কোরিয়ার হলেও, বিশেষ করে জাপানের নারীদের মধ্যে এর প্রভাব এত বেশি যে ১৯৮৮ সালে কোরিয়াতে এক দিনেই ২ হাজার ৫০০ বিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। ব্যাপক আয়োজনের সে বিয়েতে ছেলেরা অধিকাংশ কোরীয় হলেও নানা বয়সী মেয়ের প্রায় সবাই জাপানি ছিল।

আবের হত্যাকাণ্ডে তেছুয়ার ভূমিকা ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেলেও তাঁকে বলতে হচ্ছে সন্দেহভাজন খুনি। অথচ একবার জাপানে একজন নেপালিকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করার পর সে বারবার অভিযোগ অস্বীকার করলেও জাপানের পুলিশ ও আদালত তা শোনেনি। পরে ওই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং দীর্ঘ ১৫ বছর পর সে জেলখানা থেকে ছাড়া পায়। আরেকবার শ্রীলঙ্কার এক মেয়ে জাপানের ডিটেনশন সেন্টারে অসুস্থ হয়ে ২০২১ সালের মার্চ মাসে মারা যায়। মেয়েটা মৃত্যুর আগে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে ওষুধের জন্য অনেক অনুনয়-বিনয় করেছিল।

মো. মোতাহের হোসেন: জাপানপ্রবাসী
hm.motahar@yahoo.com