চলতি বছর বিবিসির জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী ১০০ নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন ময়মনসিংহের সানজিদা ইসলাম। কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সানজিদার এ সাফল্য আমাদের জন্য নিশ্চয় গৌরবের। তাঁর এ স্বীকৃতি বাল্যবিয়ে বন্ধে হয়তো অনেককেই প্রেরণা জোগাবে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালে ২০১৪ সালে সানজিদা তাঁর ছয় সহপাঠীকে নিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলে সাড়া ফেলেছিলেন। এই সাত শিক্ষার্থী ২০১৪ সালেই ঘাসফড়িং নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এর পর থেকে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন তাঁরা। তবে এখন সবাই আলাদাভাবে কাজ করেন। তাঁরা এখন আলাদাভাবে কাজ করলেও প্রত্যেকেই তাঁদের জায়গা থেকে সক্রিয়। এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছেন সানজিদারা। বাল্যবিয়ে ঠেকানো ছাড়া যৌতুক প্রথা বন্ধেও কাজ করেন সানজিদা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে স্নাতক শেষ করার আগেই কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেন সানজিদা। তাঁর এ স্বীকৃতি বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন গতিশীল করবে। বাল্যবিয়ের শিকার হতে যাওয়া কিশোরীদের কাছে সানজিদা হয়ে উঠবেন রোল মডেল। বাংলাদেশের নারীরা সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বিবিসির জরিপে এ দেশের আরেক নারীর সাফল্য নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা। তরুণদের ঘিরে আমাদের স্বপ্ন আরও বেড়ে গেল। সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য এবং সানজিদাসহ সাত কিশোরীর বয়স কাছাকাছি। তাঁদের সাফল্য সব বয়সের মানুষের সামনে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করল।
১০০ নারীর তালিকায় রয়েছেন ইউক্রেনের ফার্স্ট লেডি ওলেনা জেলেনস্কি, বলিউডের অভিনেত্রী প্রিয়াংকা চোপড়া, ইরানের পর্বতারোহী এলনাজ রেকাবির মতো ব্যক্তি। সেই তালিকায় সানজিদার স্থান পাওয়া অনেক সম্মানের। যদিও ৭০টি বাল্যবিয়ে ঠেকানোর স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে যে সম্মান দেওয়া হয়েছে, তা তাঁর প্রাপ্য ছিল।
২০১২ সালে ভারতের দিল্লিতে 'নির্ভয়া' ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বিবিসি এ তালিকা প্রকাশ করে আসছে। এবার তালিকা প্রকাশের ১০ বছর পূর্তিতে চারটি বিভাগে ১০০ নারীর নাম প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এগুলো হলো- রাজনীতি ও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলা, অধিপরামর্শ ও সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান। সানজিদা স্থান পেয়েছেন অধিপরামর্শ ও সক্রিয়তা বিভাগে। বিবিসির ওয়েবসাইটে এই নারীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে সানজিদা ইসলাম সম্পর্কে বলা হয়েছে- বাল্যবিয়ে ঠেকাতে কাজ করেন তিনি, তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকরা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বাল্যবিয়ে এখনও বড় সমস্যা। আমাদের দেশে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক মেয়ের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায়। এ বাল্যবিয়ে বন্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। দেশে এখনও বাল্যবিয়ে শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার খবর দেখা যায়। তার মানে, বাল্যবিয়ের সব খবর সংবাদমাধ্যমে আসে না। করোনা মহামারিতে বিধিনিষেধ চলাকালীন প্রায় দুই বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এ সময় বাল্যবিয়ে আরও বেশি হয়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার তাদের স্কুলপড়ূয়া মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেয়। বাল্যবিয়ে যেহেতু প্রায় নিয়মিত ঘটনা, তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনা করে এ সংকটের সমাধান হবে না।
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা সম্ভব। ঘরের খবর সবসময় সংবাদমাধ্যম বা প্রশাসনের কান পর্যন্ত পৌঁছে না। কিন্তু পাড়া-মহল্লায় সচেতন মানুষের সমন্বয়ে কমিটি করা গেলে তাঁদের চোখ এড়িয়ে সমঝোতার নামে গোপনে বাল্যবিয়ে দিতে পারবে না কোনো পরিবার। সানজিদারা নান্দাইলে যে আন্দোলনটি শুরু করেছেন, তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ূক। আমরা এমন সাহসী নারীদের স্যালুট জানাই। স্যালুট জানাই সেই সাহসী কিশোরীদের, যারা প্রশাসন বা শিক্ষককে জানিয়ে নিজের বাল্যবিয়ে বন্ধ করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
মিজান শাজাহান: সহ-সম্পাদক, সমকাল
mizanshajahan@gmail.com