বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একদিকে মানুষের রক্ত ঝরেছে, অন্যদিকে আলোড়ন চলেছে বিশ্বজুড়ে। সেই জটিল ও কঠিন সময়ের আঁচ দিতে সমকাল ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছে মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা নথি এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে প্রকাশিত বই নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন। আজ প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৭১-এর ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চের মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মনোভাব ও পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের বাছাই অংশ। অনুবাদ ও গ্রন্থনা: ফারুক ওয়াসিফ

‘আজ সকাল ৯টায় আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঢাকাস্থ বাসভবনে দেখা করতে গেলাম। শেখ আমাকে আমার গাড়ি থেকে নিয়ে তাঁর বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলেন।’ ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের বুকে গণহত্যা শুরু হলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে নিজ সরকারের কঠোর সমালোচনা করে যিনি ইতিহাসে নাম লেখাবেন, সেই সময়ের ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম পিয়ার্স রজার্স বরাবর পাঠানো গোপন বার্তা এই কথা বলেই শুরু করেন।

এর আগের চিঠিগুলোতে কনসাল জেনারেল ব্লাড ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, ‘পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সংকটের এক নাজুক বাঁকে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে’ তাঁর দেখা হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সেই দেখা যখন হলো তখন তিনি ভাবছেন, মুজিব যাতে তাঁকে ইয়াহিয়ার প্রতি পক্ষপাতী মনে না করেন। আবার এও ভাবছেন, যদি মুজিব তাঁর মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য স্বাধীনতা ঘোষণার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির অনুরোধ করে বসেন, তাহলে তিনি কী জবাব দেবেন। ব্লাড লিখেছেন, স্বাভাবিকভাবেই মুজিব আমাকে দেখে খুব খুশি হলেন এবং ব্যাপক সৌজন্য দেখালেন। একই সঙ্গে এই আলোচনার ফল কী হয়, তা নিয়ে তাঁকে কিছুটা বিচলিত ও শঙ্কিতও মনে হলো। প্রাথমিক কিছু সামাজিক কথাবার্তার মধ্যে মুজিব বললেন, ‘পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটজনক বাঁকে আমাদের এই বৈঠক হচ্ছে।’ এরপর দ্রুত মূল কথায় চলে এলেন তিনি। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন?’

‘আগ্রহী পর্যবেক্ষক হিসেবে আমি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার রাজনৈতিক অচলাবস্থায় উদ্বিগ্ন’, এটা বলে আমি তাঁকে বললাম, ‘আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে এ ব্যাপারে আপনিই বরং আমার চেয়ে পরিস্থিতির বিকাশ সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন।’

২৮ ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো ব্লাডের এই বার্তার বাকি অংশটা পাওয়া যায়নি। তবে ২ মার্চ, ১৯৭১ তারিখে ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাস থেকে পাঠানো ‘পূর্ব পাকিস্তানের বিক্ষোভ স্থগিত; সমঝোতার ক্ষীণ সুযোগ’ শিরোনামে আরেকটি বার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটি শুরু হচ্ছে এই বলে যে, “সাধারণ ধর্মঘটে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা আজ অচল এবং এটা আগামীকাল থেকে সারা প্রদেশে ছড়িয়ে যাবে। কারণ বাঙালিরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত সভা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত করার বিরুদ্ধে। ইয়াহিয়া এতদূর পর্যন্ত গিয়েছেন যে, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নরমপন্থি গভর্নরকে অপসারণ করে তাঁর জায়গায় সেনাবাহিনীর একজন জেনারেলকে বসিয়েছেন, সামরিক আইন আরও জোরদারভাবে বলবৎ করেছেন, এর মধ্যে সংবাদমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞাও ছিল। নতুন গভর্নর সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কারফিউ জারি করেছেন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে।”

ঢাকায় যখন এসব চলছে, তখন ১ মার্চ ওয়াশিংটন ডিসিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দুই সদস্য হ্যারল্ড স্যান্ডার্স ও স্যামুয়েল হসকিনসন দেশটির প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বরাবর এক তথ্যস্মারকে জানান, পাকিস্তানের ঘটনাবলি আজ এক গুরুতর মোড় নিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য পূর্ব পাকিস্তান সম্ভাব্য আগাম পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছে। ইয়াহিয়ার বয়ানে পরিস্থিতি ‘মারাত্মকতম রাজনৈতিক সংকটে পতিত’।

এই দিন ঢাকায় ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে কোনো বার্তা লন্ডন বা ইসলামাবাদে পাঠানো হয়ে থাকলেও তা প্রকাশিত হয়নি বলে ১ মার্চে ব্রিটিশ কূটনীতিকদের তৎপরতা সম্পর্কে জানা যায় না।

তবে ২ মার্চ মার্কিন তারবার্তায় জাতীয় পরিষদের সভা স্থগিত করায় ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্তে বাঙালিদের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে বলা হচ্ছে:

পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। আগের দিনের এক সংবাদ সম্মেলনে ইয়াহিয়ার দেওয়া স্থগিতাদেশকে তিনি এই বলে বাতিল করে দেন যে, এটা পূর্ব পাকিস্তানকে ‘ঔপনিবেশিক দশায় আটকে রাখার দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্র’ চালিয়ে যাওয়ারই অংশ। তিনি আরও বলেন, বাঙালিরা ‘জানে কেমন করে রক্ত ঝরাতে হয়’ এবং (তাদের) ‘কোরবানি দেওয়া যাবে না’; কিন্তু একই সঙ্গে তিনি তাঁর জনগণকে অহিংস ও অসহযোগের গণতান্ত্রিক উপায় অনুসরণ করার আহ্বান জানান। মুজিব তাঁর দলের ঘোষিত ছয় দফা দাবিনামার প্রতি তাঁর আনুগত্যের কথা আবারও জানিয়ে কোনো ধরনের আপসের সম্ভাবনার কথা নাকচ করে দেন। পরের রোববারে ঢাকায় নির্ধারিত এক মহাসমাবেশে ‘ভবিষ্যৎ বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা’ ঘোষণা করার কথা।

মুজিব কোন পথে যাবেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া করবে তা এখনো অনিশ্চিত, কিন্তু বিকল্পগুলোও সংকুচিত হয়ে আসছে। মুজিব এবং তাঁর জনসভাকে দমন করার ফল নিশ্চিতভাবেই সহিংসতা উসকে দেবে। মুজিব যদি ভাষণ দেন এবং অতি সতর্ক অবস্থান নেন, তাহলে তাঁর নেতৃত্ব হুমকির মুখে পড়বে এবং তাঁকে একপাশে সরিয়েও দেওয়া হতে পারে। কিন্তু তিনি যদি তাঁর প্রদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেই ফেলেন, তাহলে তিনি নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারবেন এবং তাঁর জনগণের সহানুভূতি পাবেন; কিন্তু তা ইয়াহিয়া ও তার সামরিক প্রশাসনকে বলপ্রয়োগমূলক প্রতিরোধের দিকে প্ররোচিত করতে পারে। অন্য বিকল্প হলো, এই মুহূর্তের জন্য বিচ্ছিন্নতা এড়ানো, গান্ধীবাদী গণঅসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করা। এটাও নিশ্চিতভাবে সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের দিক থেকে দমনমূলক পাল্টা পদক্ষেপের মুখে পড়বে। তবে এতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান তাদের পরের পদক্ষেপের জন্য সময় আদায় করে নিতে পারবে। জাতীয় পরিষদের সভা স্থগিত করার পেছনে ইয়াহিয়ার ঘোষিত যুক্তি ছিল এই যে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের জন্য ইয়াহিয়া এবং/ অথবা ভুট্টোর সঙ্গে (মুজিবের) নতুন করে আলোচনা শুরুর জন্য আরও কিছু সময় পাওয়া। মনে হচ্ছে, সেই সুযোগের বাস্তব সম্ভাবনা উবে যাচ্ছে।

এ পর্যায়ে তারবার্তার একেবারে শেষে ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের কনসাল জেনারেল ব্লাডের কথা উল্লেখ করে বলা হয়: ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের চলমান থাকার সুযোগ শূন্যের কাছাকাছি। দেশটির দুটি অংশের মধ্যে সমঝোতার সুযোগও পরিষ্কারভাবে অপচয় হয়ে গেছে। 

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মহাফেজখানার ওয়েবসাইট এবং ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ডিক্লাসিফাইড ডকুমেন্টস ১৯৫৩-১৯৭৩, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অ্যান্ড স্ট্রাগল ফর ইনডিপেনডেন্স, হাক্কানি পাবলিশার্স, ঢাকা, মার্চ ২০১৩ সংস্করণ।