ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

অযোধ্যার পর বারাণসী?

প্রতিবেশী

অযোধ্যার পর বারাণসী?

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

অযোধ্যার বাবরি মসজিদের পর এবার ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্য সম্ভবত বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদ। তাদের অভিযোগ ,মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব ‘ভগবান বিশ্বেশ্বরের মন্দির’ ভেঙে তার ওপর এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এ দাবির পক্ষের আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন আদালতে জানিয়েছেন, জ্ঞানবাপীর অজুখানায় নাকি দেখা মিলেছে শিবলিঙ্গের। যদিও তিনি চার ফুট দীর্ঘ শিবলিঙ্গের দাবি জানালেও তাঁর ছেলে আইনজীবী বিষ্ণু জৈনের দাবি এর দৈর্ঘ্য ১২ ফুট। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানটির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বারাণসীর জেলা শাসক, পুলিশ কমিশনার এবং সিআরপিএফ কমান্ড্যান্টদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

 জ্ঞানবাপী মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শিবলিঙ্গ দাবি করা বস্তুটি আদতে অজুখানার ফোয়ারার কাঠামোর অংশ। মুসলমান নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসিও ভিডিও বার্তায় বলেছেন, মুসলমানরা আরও একটি মসজিদ হারাতে রাজি নয়। বাবরি মসজিদ সুপ্রিম কোর্টের যোগসাজশে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা আর তা হতে দেব না।

হিন্দুত্ববাদীরা বলেছেন, জ্ঞানবাপী মসজিদে শিবলিঙ্গের সাক্ষ্য মিলেছে। তাই অযোধ্যার মতো ৫০০ বছর অপেক্ষা করা যাবে না। মসজিদ ভেঙে বাবা বিশ্বনাথের বিশাল মন্দির তৈরি হবেই। আড়াই দশক ধরে ওই পথেই অগ্রসর হচ্ছেন তারা। ১৯৯১ সালে মামলা দায়ের করে পুজোর অনুমতি চাওয়া হয়। ১৯৯৩ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট স্থিতাবস্থা বজায়ের নির্দেশ দেন। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে পুনরায় মামলা দায়েরের পর স্ট্রে অর্ডারের বৈধতা ছয় মাসের জন্য বলবৎ করেন। ২০১৯ সাল বারাণসী আদালতে ফের শুনানি শুরু হয়। ২০২১ সালে ফাস্ট ট্র্যাক আদালত জ্ঞানবাপীতে পুরাতাত্ত্বিক সমীক্ষার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এলাহাবাদ হাইকোর্ট পুনরায় বারাণসীর এক আদালতের নির্দেশে সমীক্ষা শুরু করেন।

আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়, যাতে বারাণসী আদালতের নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। আবেদনে ১৯৯১ সালের ধর্মস্থান আইনের উল্লেখ করে বলা হয়, ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট যে ধর্মস্থান যে অবস্থানে ছিল, তা অপরিবর্তিত থাকবে বলা হয়েছিল। ওই আইনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যে ধর্মস্থান যে ধর্মীয় চরিত্রের ছিল, তাকে পরিবর্তন করার কোনো মামলা বা আবেদন দায়ের হলে তা গ্রাহ্য হবে না। বকেয়া মামলা থাকলেও তা বাতিল করা হবে। তখন বলা হয়েছিল, শুধু বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি জমি বিতর্কের আওতায় পড়বে না। এই আইনের পরে কার্যত কোনোভাবেই জ্ঞানবাপী মসজিদে নতুন করে সমীক্ষা করা যায় না। পাশাপাশি মসজিদ কর্তৃপক্ষ আদালতের সমীক্ষার ওপর স্থগিতাদেশ দাবি করে।

আঞ্জুমান ইন্তেজামিয়া মসজিদ কমিটির আপত্তি খারিজ করে বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদে এএসআইকে সমীক্ষা চালানোর অনুমতি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়েছে– মসজিদ চত্বরে কোনো প্রকার খোঁড়াখুঁড়ি করা যাবে না; কাঠামোরও ক্ষতি করা যাবে না। আদালত বলেছেন, বিতর্কিত স্থানে যে কাঠামো বর্তমানে আছে, সেটা পূর্বেকার কোনো কাঠামোর ওপর নির্মিত কিনা, তা দেখাই এএসআইর প্রধান কাজ হবে।

সুপ্রিম কোর্টে মসজিদ কমিটির আইনজীবী বলেছেন, এই সমীক্ষা আসলে ইতিহাসের পাতায় ফিরতে চাচ্ছে। সমীক্ষার নির্দেশ অনিবার্যরূপে ১৯৯১ সালে ধর্মস্থান আইনের পরিপন্থি। ৫০০ বছর আগে কী হয়েছিল, সেটা জানার জন্য ইতিহাসে ফিরে গিয়ে সেই আইনকেই কি লঙ্ঘন করা হচ্ছে না? এই সমীক্ষা সৌভ্রাতৃত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় স্থান আইনের উদ্দেশ্যকে আঘাত করবে।

দীর্ঘদিন ধরেই হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপির এজেন্ডায় রয়েছে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির-জ্ঞানবাপী মসজিদ ও মথুরায় কৃষ্ণের জন্মস্থান মন্দির-শাহি দরগা বিতর্ক। এসব মুসলিম ধর্মীয় কাঠামোকে বাবরি মসজিদের অনুকরণে ভেঙে দখল প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন হিন্দুত্ববাদীরা। তাদের স্লোগান ছিল– ‘অযোধ্যা তো ঝাঁকি হ্যায়, কাশী-মথুরা বাকি হ্যায়।’ অযোধ্যায় নিজেদের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার পরই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এরপর কাশী-মথুরা। আদালতের রায়কে সেই লক্ষ্যেই দেখা স্বাভাবিক। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মতামতও জানতে চাওয়া হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, কেন্দ্রের বর্তমান সরকার এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ষড়যন্ত্র নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

১৯৪৭ সালের পর থেকে ধর্মীয় উপাসনালয় নিয়ে একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি হলেও হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির শাসনামলে সৃষ্ট বিতর্ক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বিজেপি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতাসীন হয়েছে।

হিন্দুত্ববাদীদের শক্তির উৎসমূলে দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়। অথচ বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য দেশটি খ্যাতি লাভ করলেও অতীতের সব ঐতিহ্য-খ্যাতি বিজেপির শাসনামলে ম্লান হয়ে গিয়েছে। ভারতের বহুত্ববাদ আজ হিন্দুত্ববাদের কবলে পড়েছে। বহু জাতি ও সম্প্রদায়ের দেশ ভারতের বৈচিত্র্যপূর্ণ সহাবস্থানে কুঠারাঘাত করে অখণ্ড ভারতকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যর্থ হলে তার পরিণাম ভারতের জনগণকেই ভোগ করতে হবে। 

মযহারুল ইসলাম বাবলা: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

আরও পড়ুন

×