ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

তানজিম সাকিব ক্ষমা চাইলেন কার কাছে?

সমাজ

তানজিম সাকিব ক্ষমা চাইলেন কার কাছে?

উম্মে রায়হানা

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

আমাদের এখনকার সময়টা বেশ অদ্ভুত! যে কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে, ভার্চুয়াল দুনিয়ায় শুরু হয়ে যায় মব ট্রায়াল বা ভার্চুয়াল গণপিটুনি। সম্প্রতি ক্রিকেটার তানজিম সাকিবের বিরুদ্ধে মব ট্রায়াল হচ্ছে বলে ক্ষেপে যাচ্ছেন তাঁর ভক্ত-সমর্থকরা। খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের এই তরুণ সদস্য নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবির কাছে। সমর্থকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার মব ট্রায়ালই তাঁকে বাধ্য করেছে এই ক্ষমা প্রার্থনায়। সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে আমরা যা বুঝি, কেউ কারও বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ করলে বা ভুলক্রমে কারও অনুভূতিকে আহত করলে ক্ষমা প্রার্থনার অধিকার ও সুযোগ তাঁর থাকা উচিত। কিন্তু তানজিম সাকিবের ভুলটা কী, আর তিনি ক্ষমা চাইলেন কার কাছে?

সম্ভাবনাময় এই তরুণ বছরখানেক আগে নিজের ফেসবুক পেজে নারীর অর্থ উপার্জন ও বিদ্যাশিক্ষার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘স্ত্রী চাকরি করলে স্বামীর হক আদায় হয় না, স্ত্রী চাকরি করলে সন্তানের হক আদায় হয় না, স্ত্রী চাকরি করলে তার কমনীয়তা নষ্ট হয়, স্ত্রী চাকরি করলে পরিবার ধ্বংস হয়, স্ত্রী চাকরি করলে পর্দা নষ্ট হয়, স্ত্রী চাকরি করলে সমাজ নষ্ট হয়।’ ওই পোস্টে আরও লেখা ছিল, ‘আসলে স্ত্রী স্বামীর মর্যাদা বোঝেনি, স্ত্রী নিজের মর্যাদাও বোঝেনি। ঘর একটি জগৎ। অসংখ্য কাজ রয়েছে। আজ ছেলেদের বেকারত্বের বড় কারণ হচ্ছে, মেয়েরা এগিয়ে আসছে, ছেলেরা কোনো চাকরি পাচ্ছে না। একটি ছেলেকে চাকরি দিলে পুরো পরিবারের উপকার হয়।’

একই পোস্টের শেষে বলা হয়েছে, ‘অতএব মা-বোনেরা নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে স্বামীর আনুগত্য ও বাসায় অবস্থান করে রানির হালাতে অবস্থান করুন। অতএব মা-বোনেরা দুনিয়া কামাতে যেয়ে আখেরাত না হারিয়ে ঘরে অবস্থান করে স্বামী-সন্তানের খেদমত করে দুনিয়া ও আখেরাত দুটিই কামাই করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।’

এই বক্তব্যে যদি কারও অনুভূতিতে আঘাত লাগে তাহলে তিনি সে জন্য লজ্জিত ও দুঃখিত। এই লেখা তৈরি হওয়া পর্যন্ত তাঁর ফেসবুক পেজে এই ক্ষমা প্রার্থনাবিষয়ক কোনো পোস্ট দেখা যায়নি। কিন্তু তাঁর ক্ষমা প্রার্থনার ভাষা নিয়েও ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে ট্রল। আদতে তিনি যে ক্ষমা চেয়েছেন তার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই, যা আছে তা হচ্ছে বিসিবির দাবি। বিসিবির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাকিব বলেছেন, যেহেতু তাঁর মা-ও একজন নারী, তিনি নারীবিদ্বেষী হবেন কী করে?

এখানে কয়েকটি বিষয় না বললেই নয়। প্রথমত, এই ক্ষমা প্রার্থনা তিনি যাদের প্রতি বিদ্বেষ প্রচার করেছেন, তাদের কাছে নয়; বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে, যেখানে তাঁর রুটি-রুজি জড়িত। দ্বিতীয়ত, তাঁর ক্ষমা চাওয়ার ভাষা থেকেই বোঝা যায়, বিদ্বেষ বলতে ঠিক কী বোঝায়, সেটি সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট বোঝাপড়া নেই। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যে বিদ্বেষের বিষবাষ্প রয়েছে, তা তিনি ধরতেই পারছেন না। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সময়ে তাঁর নানা পোস্ট ও ভিডিও ক্লিপ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট– তিনি ‘ইসলাম’কে মনেপ্রাণে, মগজে-মননে, জীবনযাপনে ধারণ করতে চান। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, ইসলাম সম্পর্কেও তাঁর জানাশোনার পরিধি খুব সীমিত।

এই ২০ বছর বয়সী তরুণ ক্রিকেট তারকাকে কিছু বিষয়ে আলোকিত করা জরুরি বলে মনে করি। নিজের প্রতিষ্ঠান বিসিবির চাপে এই ক্ষমা প্রার্থনার মধ্য দিয়ে গেলেও সত্যিকার অর্থে তাঁর মধ্যে অনুশোচনা তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। ‘চাপে পড়ে’ বলছি এই জন্য যে, সাকিবের পোস্টটি পুরোনো। এতদিন ধরে তাঁর সামাজিক মাধ্যমের বক্তব্যে বিসিবি নজরদারি করেনি। সম্প্রতি ভাইরাল হয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠায় এই ক্ষমার প্রহসন প্রয়োজন পড়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। প্রকৃতপক্ষে অনুতপ্ত হলে তিনি নিজেই তা তাঁর ফেসবুক পেজে লিখতে পারতেন। বিসিবির কোড অব কনডাক্ট ভাঙার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিজের জীবিকা ও খ্যাতির পথ সুগম রাখা আর যার/যাদের কর্ম ও জীবিকার পথকে তাচ্ছিল্য করে, নিষিদ্ধ দাবি করে, অবৈধ বলে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন, তাদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া তো এক নয়।

ক্রিকেট খেলায় যে পরিমাণ বৈধ-অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়; যেসব বাজি, জুয়া, দুর্নীতি, পণ্যের বিজ্ঞাপন ইত্যাদি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে, তাতে এই খেলার মাধ্যমে আয়-উন্নতি করা, জীবনযাপন কতখানি হালাল বলে মনে করেন সাকিব? উচ্চবিত্ত, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা, মুক্তিকামী নারীর কথা না-হয় বাদ দিলাম। সাকিব কি মনে করেন, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত বা অবিবাহিত যেসব নারী পেটের দায়ে জনপরিসরে এসে গার্মেন্টস কর্মী, চায়ের দোকানদার, শোরুমের সেলস গার্ল, রাজমিস্ত্রির জোগালি, গৃহকর্মী ইত্যাদি পেশায় অর্থ উপার্জন করছেন, তাদের চেয়ে বেশি হালাল তাঁর নিজের এই পুঁজিপতিদের মুনাফার টাকায় পরিচালিত ও নিয়োজিত এই অভিজাত খেলা? আরও একটি বিষয়, সাকিব দাবি করেন, তাঁর আত্মপ্রত্যয়ের উৎস হচ্ছে ইসলাম। মুসলমান হয়ে থাকলে তাঁর তো জানার কথা ইসলাম নারীকে কী কী মর্যাদা দিয়েছে! ১৬শ বছর আগে পৃথিবীটা এখনকার মতো ছিল না। সেই সময়ে আরবের মতো দেশে নারী নিজস্ব সম্পত্তির মালিকানা, ভোগ-দখল ও বণ্টনের অধিকার পেয়েছিলেন ইসলামের মাধ্যমে। কন্যাসন্তানের জন্য পিতার সম্পত্তিতে ভাইয়ের অর্ধেক অধিকার সামান্য নয়। এমনকি এই যুগেও নয়।

মুশকিল হচ্ছে, আমরা প্রায়ই ধর্মের এই মূল কথাগুলো ভুলে যাই। আধ্যাত্মিকতা বাদ দিয়ে ধর্মকে ধারণ করা যায়? ধর্মের মূল কথা সৃষ্টিকর্তাকে অনুসন্ধান। ধর্মকে ব্যবহার করে পরস্পরকে বিচার করা, দোষী করা, খারিজ করা নয়। সাকিবের প্রজন্মের অনেককে আমরা তা শেখাতে পারিনি। এই ব্যর্থতা কারও একার নয়, সবার।

উম্মে রায়হানা: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×