ঢাকা সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

রেমিট্যান্স কমার দুটি বড় কারণ

ডিজিটাল অর্থনীতি

রেমিট্যান্স কমার দুটি বড় কারণ

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

গত তিন বছরে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে শ্রমিকের অভিবাসন চার গুণের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে, কিন্তু সৌদি থেকে রেমিট্যান্স আয় কমেছে ১৭ শতাংশ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালে ১ লাখ ৬১ হাজার বাংলাদেশি উপসাগরীয় দেশটিতে চাকরিতে গেছেন; ২০২১ সালে গেছেন ৪ লাখ ৫৭ হাজার এবং ২০২২ সালে ৬ লাখ ১২ হাজার। শ্রমিকের এই বিপুল বৃদ্ধির সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহের কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা, প্রবাসী আয়ের বড় অংশই আসছে হুন্ডিতে। আরও ভয়ের ব্যাপার, একটা অংশ দেশেই আসছে না।

এদিকে মাত্র এক মাসেই রেমিট্যান্স দুই বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে এসেছে! আগস্টে জুলাইয়ের চেয়ে ২১ শতাংশ রেমিট্যান্স কমে যাওয়া চিন্তার বিষয়। কেননা, বিদেশগামী প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছেই। বিএমইটির তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মী বিদেশ গেলেও বার্ষিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ঢাকা বিভাগের মাত্র অর্ধেক! চট্টগ্রাম বিভাগে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক বেশি। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকসহ ইসলামী ধারার ব্যাংকের নড়বড়ে অবস্থায় অনেক গ্রাহকের হুন্ডিতে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। 

আচরণগত কারণ

একটা সময় সৌদি প্রবাসীরা সৌদি আল-রাজি ব্যাংকে দীর্ঘ লাইন দিয়ে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা পাঠাত! সিঙ্গাপুরের প্রায় সবাই ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাত। কিন্তু এমএফএসে হুন্ডি চক্র প্রবেশের পর প্রায় পুরো রেমিট্যান্স চলে গেছে হুন্ডিতে। এতে সৌদি রিয়াল সেখানেই থেকে যায়। এই অর্থ তারা ভিজিট ভিসায় যাওয়া লোকদের কাছে, ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করে। কখনও স্বর্ণ কিনে দেশে চোরাচালানে কাজে লাগায়! এ ছাড়া সৌদি আরবে অভিবাসী শ্রমিকদের আকামা খরচ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। কোম্পানির বাইরে যারা নিজস্ব ভিসায় কাজ করে, তাদের অর্ধেক আয় আকামায় চলে যায়। তা ছাড়া বাংলাদেশে ব্যাংক রেট বাড়লে অনেক সময় হুন্ডি সংগ্রহকারীরাও রেমিট্যান্স ব্যাংকে পাঠায়। তাই ব্যাংক রেট গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকের ওপর অনাস্থায় রেমিট্যান্স কমার প্রবণতাকে আচরণগত অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। সরকার বিষয়টা শুরুতে বুঝতে পারেনি বলে ব্যাংকিং জালিয়াতির বিভিন্ন ঘটনায় নীরব থেকেছে। এখন সরকারকে বাজারে ডলার বিক্রি বাড়াতে হবে। তা না হলে আরও বেশি এলসি বন্ধ করে অর্থনীতিকে শাটডাউন বা কার্যত অচল করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের রপ্তানিসহ সামগ্রিক অর্থনীতির অর্ধেকের বেশিই আমদানিনির্ভর। কিন্তু সেটা করাও তো আত্মঘাতী হবে।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে হুন্ডির সংযোগ জরুরি ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন এবং নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো মুশকিল হয়ে যাবে। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর বদলে বিভিন্ন এমএফএস বা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের এজেন্টদের দিয়ে স্থানীয়ভাবে হুন্ডির টাকা আসছে। ফলে যে বৈদেশিক মুদ্রা বৈধ চ্যানেলে দেশে আসার কথা ছিল, সেটা পরোক্ষভাবে পাচার হয়ে বিদেশেই ব্যয় হচ্ছে স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানে। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে আমদানিতেও ব্যয় হচ্ছে। কেননা, দরকারি এলসিতে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

কাঠামোগত কারণ

তবে রেমিট্যান্স কমার একাধিক কাঠামোগত সমস্যা আছে। মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী যারা আকামা ছাড়া ভিজিট কিংবা বিজনেস ভিসায় যাচ্ছে, তারা ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করতে পারে না। তাই সরকারকে ওয়ার্ক পারমিট বা আকামাসহ লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অন্য কারণ অদক্ষ শ্রমিকের নিম্ন মজুরির বিপরীতে বিদেশ গমনের উচ্চ ব্যয়। বিমানবন্দর ট্যাক্স, বিমান ভাড়া, এজেন্ট ফি কমিয়ে সরকারকে বিদেশ গমন সাশ্রয়ী করতে হবে।

হুন্ডির রেট বেশি। হুন্ডির তাৎক্ষণিক সেবার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি সরকার। প্রবাসীর এক ফোনকলেই হুন্ডির টাকা দেশে তার পরিবারের কাছে তাৎক্ষণিক পৌঁছে যায়। বিপরীতে প্রবাসীরা সুবিধামতো সময়ে প্রবাসী হুন্ডি সংগ্রহকারীদের অর্থ দেয়। বড় হুন্ডি সংগ্রহকারীরা তা ব্যবহার করছে বৈদেশিক মুদ্রার নতুন সাপ্লাই চেইনে।  

টাকা পাচার ও হুন্ডি বাণিজ্যের বড় বাধার পাশাপাশি ডলারের দরে পার্থক্য থাকায় খোলাবাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারছে না ব্যাংকগুলো। খোলাবাজারে ডলার বিক্রি করে টাকার মান ধরে রাখার কৌশলও ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। এতে রিজার্ভ ক্ষয় হচ্ছে, হুন্ডিও বাড়ছে। হুন্ডির চেয়ে কম রেট মানুষকে ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি বিমুখ করে রাখে। গত এক বছরে টাকার মান দ্রুত কমলেও অব্যাহত মূল্যস্ফীতির মুখে এখনও টাকা অতিমূল্যায়িত থেকে গেছে! একদিকে হুন্ডির রয়েছে ডোর টু ডোর ও সার্বক্ষণিক বা ৭/২৪ সেবা। অন্যদিকে ব্যাংকের হয়রানি; লাঞ্চের পরে আসেন, কাল আসেন; ব্যাংকিং আওয়ার শেষ; বড় ট্রানজেকশনের বেলায় ম্যানেজার নেই, কাল আসেন– এসবে মানুষ বিরক্ত! প্রথমবার রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো খুব হয়রানি করে। অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র চায়। এতে শুরুতেই প্রবাসীদের আস্থা উঠে যায়।

নতুন যন্ত্রণা এজেন্ট ব্যাংকিং! এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অসাধু চক্র মোবাইল ব্যাংকিং সহযোগে কোড বা ওটিপি মেসেজ চুরি করছে। জাল কাগজপত্রেও মানুষ বিভ্রান্ত এবং প্রতারিত হচ্ছে। পাশাপাশি শুরু হয়েছে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল অ্যাপভিত্তিক জুয়া, অনলাইন বেটিং, ডিজিটাল এমএলএম, ফরেক্স ব্যবসা এবং মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে অফশোর ক্রিপ্টো কারেন্সি বা অ্যাপভিত্তিক অফশোর বিটকয়েন ব্যবসা। এসব ব্যবসায় দেশে মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে টাকা জমা ও স্থানান্তর করে অ্যাপে পয়েন্ট দেখানো হয়, বিপরীতে বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন হয়। ওই মুদ্রা আসলে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসার কথা ছিল। ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও এসব বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতাশালী অনেকেই এর সঙ্গে জড়িত। অথচ চাইলেই এমএফএসের একমুখী ট্রানজেকশন ও বড় বড় অর্থ স্থানান্তর নজরদারিতে আনা যায়; ওটিপি কোড চুরির তদন্ত করা যায়।

প্রভাবশালীরা মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে হুন্ডি চক্র ও ডিজিটাল পঞ্জি স্কিম চালাচ্ছে বলে বিদেশে রেমিট্যান্সের মুদ্রার চাহিদা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের ঋণ ইচ্ছাকৃত খেলাপি করে, কম সুদে বড় বড় ঋণ নিয়ে ‘ইজি মানি’ পাচার ও প্রতারণা চলছে, যা আদতে দেশের প্রবাসী আয়প্রবাহে বাধা তৈরি করছে।

রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় আচরণগত অর্থনীতি দিয়েও বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় কমার কারণ ব্যাখ্যা করা যায়। পুলিশি হয়রানিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবাসী চাঁদা পাঠানো নজরদারিতে এলে সেসব হুন্ডিতে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ডিজিটাল সুবিধা বনাম ডিজিটাল ফাঁদবাংলাদেশ সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে– সব ডিজিটালই আসল ডিজিটাল না। ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নামে একটি গোষ্ঠী বিশাল জালিয়াতির ফাঁদ তৈরি করেছে। গ্রামের মানুষসহ নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ, যাদের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ছিল না, তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আনার সম্ভবনাময় খাতগুলো এক অর্থে হয়ে উঠেছে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস ও পাচারের নতুন এক হাতিয়ার। এসব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা না গেলে বিপদ বাড়বে। কিন্তু কে করবে নিয়ন্ত্রণ? শর্ষের ভেতরেই যে ভূত!

প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থনীতির এ সংকটেও কি আখের গোছানোর জালিয়াতি ও পাচার চলবে, নাকি সঠিক নিয়ম-নীতি প্রণয়ন এবং তা প্রয়োগের মাধ্যমে এতটুকু জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাবে?

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব: টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক
faiz.taiyeb@gmail.com

আরও পড়ুন

×